এখন আমাকে তুমি কি করতে বলো?” জানতে চাইল মাসউদ বিন মাহমূদ।
আপনি আমার আব্বার আশ্বাসের অপেক্ষা না করে আজই গযনী ফিরে চলুন। আমার মনে হচ্ছে আমাদের মোলাকাত হবে রণাঙ্গনে।”
তুমি কি রণাঙ্গনে আমার সাথে সাক্ষাত করবে?”
হয়তো বা তাই।” কথা শেষ করতে না করতেই সিমনতাশের দু’চোখ গড়িয়ে পড়লো অশ্রুধারা।
“আরে তুমি কাঁদছো সিমন? তোমার মতো সাহসী মেয়ের কান্না শোভা পায় না সিমন।”
দুঃখিত? আমি একটা পাগল। চোখের অশ্রু মুছতে মুছতে ধরা গলায় বললো সিমন। কিছুক্ষণ নীবর থেকে মাসউদের দু’হাত ধরে ঝাকুনী দিয়ে সিমনতাশ বললো, বলুন? আমি কি পাগল নই? আমার গৃহশিক্ষকও হয়তো পাগল? ধোকা ও প্রতারণার রাজ্যে সত্যের পথিকরা পাগলই তো হবো। এমন এক যুবরাজের সাথে আমার বিয়ের কথা পাকাপাকি করে রাখা হয়েছে, যার একহাতে শরাবের বোতল আর এক হাত সুন্দরী তরুণীদের পেলব দেহ বল্লরীর উত্তাপের স্বাদ নিতে ব্যস্ত থাকে। সে এমন এক ব্যক্তি, জাতি ও ধর্মীয় দায়িত্ববোধ সম্পর্কে যার কোনই চিন্তা-ভাবনা নেই। একজন পুরুষ ও শাহজাদা হিসেবে তার যে একটা কর্তব্য আছে তার দিল দেমাগে এর কোন ছাপ নেই।…..
সিমনতাশের একহাতে ছিল ধনুক আর অপর হাতে ছিল খঞ্জর। সে উভয়টি মাসউদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, আমার বিয়ে এগুলোর সাথে হয়ে গেছে মাসউদ। এদুটো জিনিসই আমার ভালোবাসার নমুনা। নারী শুধু পুরুষের বিনোদন আর প্রদর্শনীর জিনিস নয়। এই ধনুক আর খঞ্জর একজন নারীরও অলংকার হতে পারে।”
“আরে! তুমি এমন সব কথা বলছো কেন সিমন? সিমনতাশের হতাশা ও দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সাহস ও আশার সঞ্চার করতে মাসউদ বললো,
যে নারীর হাতে ধনুক আর কাঁধে তীরদান থাকে তার চোখে হতাশার অশ্রু মানায় না সিমন! সেতো তার জাতি ও কওমের জন্যে অনুকরণীয়ও সৌভাগ্যের প্রতীক।…সিমন। এখানে এভাবে কি আমাদের দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে?
ওহ! আমি ভুলে গিয়েছিলাম কোথায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। আমি আবারো আপনাকে বলছি, আপনি যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে চলে যান। দ্রুত আপনার গয়নী পৌঁছা দরকার।
আপনাকে হয়তো সেই অন্ধ বেহালাবাদক গোয়েন্দা অনেক কিছুই বলেছে। সে আমার পয়গামও হয়তো গযনী সুলতানের কাছে পৌঁছিয়েছে।”
“সে কতটুকু কি করেছে, তা তুমি নিজেই তাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে পারো।”
মাসউদ একজন নিরাপত্তাকর্মীকে বললো, আবুজাফরকে ডেকে আনন।” ইঙ্গিত পাওয়া মাত্রই এক অশ্বারোহী যুবক ঘোড়া হাঁকিয়ে তাদের কাছে চলে এলো। সে ঘোড়া থেকে নেমে যখন মাসউদের কাছে এলো, তার আসার চালে মনে হচ্ছিল গোটা এলাকাটা দুলছে।
“ওকে কি চিনো জাফর? সিমনতাশের প্রতি ইঙ্গিত করে জাফরকে জিজ্ঞেস করলো মাসউদ।
“আবু জাফর সিমনতাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো, সিমনতাশও তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে নিঃশব্দে জানিয়ে দিলো তাদের মধ্যকার জানা শোনার বিষয়টি।
“তোমাকে চিনতে কিন্তু আমার বেশ কষ্ট হয়েছে। জাফরের দিকে ইঙ্গিত করে বললো সিমনতাশ। তুমি কি আমার পয়গাম সুলতানের কাছে পৌঁছিয়েছো?”
“অক্ষরে অক্ষরে হুবহু তোমার প্রতিটি কথা আমি সুলতানকে বলেছি। জবাব দিলো আবু জাফর।
“জাফর একজন বড় মাপের গোয়েন্দা। সে নিরাপত্তা বাহিনীর লোক নয়। এই সফরে তাকে আমার উপদেষ্টা হিসেবে পাঠানো হয়েছে।……সিমন, ওই আহত লোকটিকে কোথায় পাঠিয়েছো?”
“ওর ব্যাপারে আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না, আমার বাবার কাছে নিয়ে যাবো, না চিকিৎসকের কাছে পাঠাবো। ও হ্যাঁ, আমার এখন যাওয়া দরকার। ওরা হয়তো অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। জানি না জীবনে আর কোন দিন তোমার সাথে দেখা হবে কিনা। হলেও কোথায় হবে। মৈত্রী প্রস্তাবের জবাব তুমি ইতোমধ্যে পেয়ে গেছে, তাই আজই তোমার গযনীর পথে রওয়ানা হওয়া উচিত।
“সিমনতাশ মাসউদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এক লাফে অশ্বারোহণ করে এমনভাবে ঘোড়াকে তাড়া করলো যে, ঘোড়াটি হরিণের মতো উর্ধশ্বাসে লাফিয়ে লাফিয়ে উড়ে চললো। মাসউদ এক পলকে তার দিকে তাকিয়ে থাকলো। মুহূর্তের মধ্যেই সিমনতাশ বনের মধ্যে হারিয়ে গেল। যতক্ষণ পর্যন্ত তার অশ্বখুড়ের আওয়াজ কানে ভেসে এলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো মাসউদ সে দিকে তাকিয়ে রইল।
“মুহতারাম শাহজাদা! আপনি কি অনুমান করতে পারছেন এই মেয়েটি মুসলিম ঐক্যের প্রশ্নে কি পরিমাণ আবেগপ্রবণ।” বললো গোয়েন্দা ও মাসউদের উপদেষ্টা আবু জাফর। আবু জাফর আরো বললো, আমি সিমনতাশের সংশ্রবে অনেক দিন সময় থেকেছি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিয়েছি। আমি তাকে যতটা জানি আর কেউ তাকে এতটা জানে না। আমি নিশ্চিত বলে দিতে পারি, গযনী সালতানাতের কল্যাণে এই মেয়ে বিস্ময়কর কিছু ঘটিয়ে দেবে।
“অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মাসউদের মানসিক অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেল। তিনি তার নিরপত্তাকর্মীদের বললেন, চলো।
সাথীদের নিয়ে পাহাড়ী উপত্যকা থেকে সমতল ভূমিতে নেমে এলেন মাসউদ। তার সকল নিরাপত্তারক্ষী তার কাছে ফিরে আসার পর তিনি শহরের দিকে রওয়ানা হলেন। মাসউদ তীব্র বেগে শহরে দিকে ঘোড়া হাঁকালেন।
তীরবিদ্ধ লোকটিকে ঘোড়ার পিঠে রেখে এক সৈনিক শহরের প্রবেশদ্বারে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল, এসময় সিমনতাশের ঘোড়া আহত লোকটিকে বহনকারী ঘোড়াকে অতিক্রম করে সামনে চলে গেল। আহত লোকটির ক্ষতস্থান থেকে তখনো রক্ত ঝরছে।
