“না, আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। বললো সিমনতাশ। এজন্যই আমি আপনাকে এখানে আসতে বলেছি। আমার বাবাও সেইসব ঈমান বিক্রেতাদের একজন যাদের বিরুদ্ধে গযনী সুলতানের জিহাদে অবতীর্ণ হওয়া ফরয হয়ে গেছে। আপনি হয়তো আমার কথায় আশ্চর্যান্বিত হচ্ছেন এই ভেবে যে, কোন মেয়ে কি বাবার বিরুদ্ধে এমন কঠোর মনোভাব পোষণ করতে পারে? কিন্তু যে আবেগের বশীভূত হয়ে আমি আমার জন্মদাতার বিরুদ্ধাচরণ করছি তা যদি আপনি এতটুকু গভীরভাবে চিন্তা করেন তাহলে ঠিকই রহস্যটা বুঝতে পারবেন। আমি আপনার কাছে এই নিবেদন করতে এসেছি, কাদের খান ও তোগা খানের সৈন্যরা আমাদের সৈন্যদের সাথে একত্রিত হয়ে একটি সামরিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার আগেই আপনারা আমাদের রাজধানী অবরোধ করে কজা করে নিন। তাতে অন্তত অহেতুক অনেকগুলো মানুষের মরণ ঠেকানো যাবে।…
আমাদের সেনাবাহিনী আপনাদের সেনাবাহিনীর তুলনায় খুবই নগণ্য ও দুর্বল। তা না করে যদি আপনাদেরকে তিনটি বাহিনীর মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয় তাহলে এর আগে গৃহযুদ্ধে যেমন উভয় পক্ষের বিপুল জনবল ক্ষয় হয়েছে এবং বহু লোকের প্রাণহানি ঘটেছে এক্ষেত্রেও তাই হবে।”
“শোন সিমন! হিন্দুস্তানে সুলতান যেভাবে আক্রমনাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, এভাবে কোন মুসলিম রাজ্যের উপর আক্রমণ করবেন না। আমাদের উদ্দেশ্য রাজ্য দখল নয়, কাফেরদের মোকাবেলায় একটি শক্তিশালী ইসলামী সামরিক শক্তি গড়ে তোলা। তোমাদরে রাজ্য দখলের ইচ্ছা থাকলে সুলতান আমাকে মৈত্রীর পয়গাম দিয়ে পাঠাতেন না।
“আমার আব্বা কখনো মৈত্রী চুক্তি করবেন না। তিনি যদিও আপনাকে মৈত্রীর কথা বলে আশ্বস্ত করেছেন, কিন্তু কাদের খানের প্ররোচনা ও নানাবিধ সুবিধা ভোগী সেনা কর্মকর্তারা আব্বাকে মৈত্রীচুক্তি করতে দেবে না। আব্বা এখন এইসব বেইমান সেনাদের মানসিকভাবে হাতে বন্দী। কারণ, আব্বা কানে শুনেন না। তাকে যা শোনানো হয় তাই তিনি শুনেন। এর বাইরে নিজ থেকে তিনি কিছুই শুনতে পান না। অনেক ব্যাপারেই ভালো মন্দ বিচার করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।
হঠাৎ সিমনতাশ নীরব হয়ে গেল। কোন পাকা শিকারী যেমন গভীর বনের ভেতরে শিকারের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকায় সিমনতাশও একদিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাসউদের একটি হাত ধরে টেনে একটি গাছের আড়ালে ঠেলে দিল। লতাগুল্ম গাছটিকে পেচিয়ে দেয়ালের মতো তৈরী করেছে।
সিমনতাশ মাসউদকে বলল, দয়া করে আপনি এখান থেকে এক চুলও নড়বেন না। চতুর্দিকে কড়া নজর রাখবেন। একথা বলে লতাগুলোর মধ্যে সিমন আড়াল হয়ে গেল। মাসউদ আকস্মিক এই ঘটনায় অবাক বিস্ময়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। একটু পরে নিজের কানেই ধনুক থেকে তীর ছোঁড়ার শব্দ পেল। সে কান খাড়া করে তার উৎস বুঝতে চেষ্টা করল। ইত্যবসরে বিকট আর্তচিৎকার তার কানে ভেসে এলো। এমন সময় মাসউদ মুখে আঙ্গুল দিয়ে সিটি বাজাল। সিটির আওয়াজ শুনে তার তিনচার নিরাপত্তা রক্ষী তরবারী কোষমুক্ত করে তার কাছে চলে এলো। মাসউদ তার সামনের সবুজ সমতল ভূমিতে এক ব্যক্তিকে তীর বিদ্ধ অবস্থায় দেখতে পেল। ঠিক এ সময় সিমনতাশ মাসউদের সামনে এসে বলল, আমার সাথে আসুন।
মাসউদ তার নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে নিয়ে তীর বিদ্ধ লোকটির দিকে অগ্রসর হলো। ততোক্ষণে তীর বিদ্ধ লোকটি মাটিতে বসে পড়েছে এবং ব্যথা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ।
সিমনতাশ তার কোমর থেকে একটি খঞ্জর বের করে আহত লোকটির ঘাড়ে তাক করে বলল,
“যদি সত্য বলো, তাহলে তোমাকে ঘোড়ায় উঠিয়ে বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে তীর বের করে চিকিৎসা করাবো। আর যদি মিথ্যা বলো তাহলে এই গাছের সাথে তোমাকে ঝুলিয়ে দেয়া হবে। চিন্তা করো তুমি কোনটি করবে? দৃঢ় কণ্ঠে আহত লোকটির উদ্দেশ্যে বললো সিমনতাশ।
আহত লোকটি করুণ চাহনী দিয়ে সিমনতাশ ও মাসউদকে দেখে বললো–
“আমি সুলতান মাহমুদের ছেলেকে হত্যা করতে এসেছিলাম।”
“কে তোমাকে বলেলে সুলতান মাহমূদের ছেলেকে এই জঙ্গলের ভেতরে পাওয়া যাবে?” প্রশ্ন করল সিমনতাশ।
“আমাকে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে। আমার সাথে আরো এক লোক ছিল সে পালিয়ে গেছে।” বললো তীরবিদ্ধ লোকটি।
কার পরিকল্পনা এটি?
এটি কাশগড়ের শাসক কাদের খানের পরিকল্পনা। এ ব্যাপারে তিনি সম্মানিত আমীর আবুল মনসুরের সাথে কথাবার্তা বলে নিয়েছিলেন।
“আব্বা কি বলেছিলেন?”
“তিনি বলেছিলেন, আমি সুলতান মাহমূদের ছেলেকে ভেবেচিন্তে জবাব দেয়ার জন্যে কয়েক দিন এখানে থাকতে বলেছি। সে হয়তো কোন না কোন দিন শিকারের জন্যে বের হবে, তখন তোমরা তোমাদের কাজ সারতে পারবে। তার সঙ্গে এমন দু’জন কর্মচারী পাঠাবে, যারা তার শিকারে যাওয়ার আগেই তোমাদের খবর দিতে পারে।”
“ওকে ঘোড়ার পিঠে ফেলে নিয়ে চলো” মাসউদের এক নিরাপত্তা রক্ষীকে নির্দেশের সুরে বললো সিমনতাশ। সে মাসউদকে বললো, এই বিষয়টিই আমি আপনাকে বুঝানোর জন্যই এখানে আসতে বলেছিলাম। আমি বলতে চাই, আপনি আর এক মুহূর্তও এখানে অবস্থান করবেন না। আপনার নিরাপত্তা কর্মীদেরকে সতর্ক রাখবেন। ঘটনাক্রমে আমি টিলার নীচের সমতল ভূমিতে এই লোকটিকে উঁকি ঝুঁকি মারতে দেখে ফেলেছিলাম। তার ধনুকটিও আমার দৃষ্টিতে পড়ে গিয়েছিল। এই জায়গাটি শাহী খান্দানের শিকারের জন্যে নির্দিষ্ট। এখানে শাহী খান্দান ছাড়া আর কেউ আসতে পারে না। আমি একটি ঝোঁপের ভেতরে লুকিয়ে থেকে ওর উপর তীর চালিয়ে ছিলাম বলে কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। নয়তো অস্বাভাবিক কিছু ঘটে যেতে পারতো, যা শুধু আমার নয় গোটা রাজ্যের জন্যে স্মরণীয় কলংক হতো।”
