* * *
আবুল মনসুরের সাথে মাসউদ বিন মাহমূদের কথাবার্তা শেষ হলো। আবুল মনসুর তার প্রাসাদে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই শাহী লোকজন রান্নাবান্না ও থাকা খাওয়ার রাজকীয় সাজসরঞ্জাম নিয়ে মাসউদের তাঁবুতে উপস্থিত হলো। রাজকর্মচারীরা এসে নতুন করে মেহমানের জন্যে বিশাল এক শাহী তাঁবু তৈরী করল এবং রাজকীয় বাবুর্চী উন্নত মানের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করল।
একদিন পায়চারী করতে করতে মাসউদ তাঁবু থেকে কিছুটা দূরে চলে এলে একজন রাজ কর্মচারী পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে মাসউদকে সালাম দিয়ে বিনয়ের সাথে বললো,
“সম্মানিত শাহজাদা! আপনাকে আমি একটি গোপন কথা বলতে এসেছি। আগামী কাল আপনি শাহী মহলের সংরক্ষিত বনে শিকারের জন্যে যাবেন, সেখানে শাহজাদী আবুল মনসুর আপনার সাথে সাক্ষাতের জন্যে অপেক্ষা করবেন।”
আমাকে কি বনের মধ্যে হত্যা করা হবে, না তাঁবুতে হত্যা করা হবে? একথাটা পরিষ্কার বলে দিলেই হয়।
মুহতারাম শাহজাদা! এমনটি কেন ভাবছেন? আপনার দেহরক্ষীরা তো আপনার সাথেই থাকবে। এখানে আপনাকে হত্যা করার দুঃসাহস কারো নেই।
দৃষ্টিহীনতার কৌশলী অভিনেতা গোয়েন্দা আবু জাফর সুলতানকে বলেছিলো। আবুল মনসুরের একমাত্র কন্যা সিমনতাশ তার বাবার কার্যক্রমের বিরোধী। সুলতান মাহমূদ মাসউদকে বিদায় করার আগে একথাটিও বলে দিতে ভুল করেননি। সুলতান বলেছিলেন, আবুল মনসুরের যুবতী কন্যা সিমনতাশ গযনী সালতানাতের অত্যন্ত হিতাকাক্ষী এক নারী। সে তার পিতার কর্মকাণ্ডের ঘোরতর বিরোধী। কিন্তু একজন শাহজাদী পিতার বিরুদ্ধে গিয়ে কিছুই করতে পারে না। শাসন কার্যে সেনাবাহিনীর কর্তা ব্যক্তিদের উপর শাহজাদীর কোন প্রভাব খাটে না। সুলতানের এই ধারণার কারণে মাসউদ সিমনতাশকে তেমন গুরুত্ব দেননি। আবুল মনসুরের এক কর্মচারী যখন মাসউদকে জানাল, তাদের সংরক্ষিত বনে শাহজাদী তার সাথে সাক্ষাত করতে আসবে, এটিকে তিনি কোন চক্রান্ত কিংবা সংশয়ের দৃষ্টিতে দেখেননি।
পরদিন সকালের নাশতার পর বেলা যখন অনেকটা উপরে উঠে গেলো তখন শাহজাদা মাসউদ পাঁচ ছয়জন নিরাপত্তারক্ষী সাথে নিয়ে শিকারের উদ্দেশ্যে বের হলেন। অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মী ও উপদেষ্টাদের তিনি সাথে নেননি। তার নিরাপত্তা রক্ষীদেরকে তিনি তার চতুর্দিকে এভাবে ছড়িয়ে দিলেন, যাতে কেউ তার উপর মারণাঘাত না করতে পারে। মাসউদ বিন মাহমুদ ঘোড়র উপর সওয়ার হয়ে ধনুকে তীর ভরে চতুর্দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে বনের ভেতরের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। মাসউদ যতই বনের ভেতরে প্রবেশ করলেন, বন ততই ঘন এবং সবুজ লতাগুল্ম ভরা উঁচু-নীচু টিলা ঝোঁপঝাড় দেখতে পেলেন। তিনি এভাবে অগ্রসর হতে লাগলেন যে, তার চতুর্পাশে তার দেহ রক্ষীদের ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন।
চলতে চলতে তিনি এমন একটি জায়গায় এলেন, জায়গাটি একটি সমতল ভূমি, অনতি দূরে উঁচু একটি টিলা। সমতল জায়গাটিতে মনোমুগ্ধকর লতানো ফুলগাছ বড় বড় গাছগুলোকে জড়িয়ে রেখেছে। সেখানে একটি খোলা জায়গায় মাসউদ একটি মেয়েকে দাঁড়ানো দেখতে পেলেন। মেয়েটির পাশে একটি ঘোড়া দাঁড়ানো। একটি একহারা ছোট গাছে ঘোড়াটিকে বেধে রাখা হয়েছে। মেয়েটির কাঁধে ধনুক ঝোলানো। কোমরের বন্ধনীতে তরবারী আটকানো। এমন মনোহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে সুন্দরী মেয়েটিকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। প্রকৃতির রূপ আর তরুণীর রূপলাবণ্যে যেন একাকার হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে তরুণীটি যেন এই বনের সৌন্দর্যেরই অংশ! তরুণীর মুখটি অনিন্দ্য সুন্দর বটে কিন্তু তার চাহনী ও দাঁড়ানোর ভঙ্গি অত্যন্ত গম্ভীর। স্থির দাঁড়িয়ে সে আগন্তুক যুবকের দিকে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাসউদ তরুণীকে দেখে পনেরো বিশ হাত দূরে ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন এবং চতুর্দিকটি ভালোভাবে দেখে নেয়ার চেষ্টা করলেন।
“আপনি যদি মাসউদ বিন মাহমূদ হয়ে থাকেন তাহলে নিঃসংকোচে এগিয়ে আসুন। এখানে আপনার কোন বিপদ হবে না, কোন ঝুঁকি বা আশংকা নেই। আমি সিমনতাশ। আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছি।’
মাসউদ ঘোড়ার বাগ ধরে দৃঢ় পায়ে সিমনতাশের দিকে এগিয়ে গেলেন। সিমনতাশ কাল বিলম্ব না করে তাকে নিয়ে ঘাসের উপর মুখোমুখি হয়ে বসে পড়ল।
“কোন তরুণীর আহ্বানে এখানে আসাটা আমার জন্যে শোভনীয় ছিল না। কিন্তু আমি জানি আপনি গযনী সালতানাতের একজন হিতাকাক্ষী। “আপনাকে ভুল ধারনা দেয়া হয়েছে। আসলে আমি গযনী সালতানাতকে ভক্তি করি না, আমি উভয় দুনিয়ার যিনি সুলতান তার পূজা করি। আমি সেই রসূল স.-এর অনুসারী গযনীর সুলতান যার অনুসারী। আমি এই নীতিতে বিশ্বাস করি যে, একই কালেমায় বিশ্বাসী মুসলমান আরেক মুসলমানকে হত্যা করতে পারে না।”
“এক ভাই যদি শুধু ক্ষমতা ও রাজত্বের মোহে আরেক ভাইকে খুন করতে চায়, এ ব্যাপারে তোমার কি বক্তব্য?”
“এমন খুনীর বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। এমন খুনীর বিরুদ্ধে জিহাদ করা সক্ষমের জন্যে ফরয।” বললো সিমনতাশ।
“তাই যদি মনে কর, তাহলে তোমার বাবাও তো এদের মধ্যেই পড়েন। আমি এজন্যেই তার কাছে মৈত্রী চুক্তির পয়গাম নিয়ে এসেছি। আমি এসেছি এ জন্য যাতে তার বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ হওয়া আমাদের জন্যে ফরয কর্তব্যে পরিণত না হয়। তুমি যা বিশ্বাস করো এবং যা বললে এই নীতি ও আদর্শের উপর তোমার বাবাকে কি আনতে পারো না?”
