লেমাকে আবুল মনসুর আরসালান খানের কাছে যেতে হবে এবং আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার জন্যে তাকে রাজী করাতে হবে। তাকে বলতে হবে, আমাদের সাথে যুদ্ধ করলে তারা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাকে একথাও বুঝতে হবে, সে যদি গযনীর সাথে মৈত্রী চুক্তি করে তাহলে গযনী তাদেরকে সামরিক নিরাপত্তা দেবে। সুলতান মাহমুদ মাসউদ বিন মাহমূদকে আরো প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিলেন এবং জানিয়ে দিলেন তার সাথে আর কে কে যাচ্ছে।
পরদিনই মাসউদ রওয়ানা হয়ে গেল। দুজন সামরিক বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা তার সঙ্গী হিসেবে ছিল, আর নিরাপত্তার জন্য তার সঙ্গী হিসেবে রওয়ানা হলো বিশজন নির্বাচিত অশ্বারোহী। তাদের এই সফর ছিল স্বাভাবিকভাবে বারো তেরো দিনের। আবুল মনসুরের সম্মানে তুহফা উপঢৌকন বহন করার জন্যে কয়েকটি উট ও বোঝাই করে তাদের কাফেলার সাথে দেয়া হলো।
আবুল মনসুরের শাসনাধীন রাজ্যের সীমানায় পৌঁছে মাসউদ শহর থেকে কিছুটা দূরে তাঁবু ফেললেন এবং আবুল মনুসরের কাছে তাদের আগমনি সংবাদ দিয়ে একজন দূত পাঠালেন,
সুলতান মাহমূদের ছেলে মাসউদ বিন মাহমূদ আপনার সাথে সাক্ষাত করতে চায় এবং কিছু জরুরী বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চায়।’
পরদিন রাজকীয় বেশ ভূষা নিয়ে আবুল মনসুর মাসউদ বিন মাহমূদকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য এলেন। আবুল মনসুর এলে উপহার-উপঢৌকনের হাতবদল হলো। এই সুযোগে মাসউদ তার বাবার পয়গাম আবুল মনসুরের হাতে তুলে দিলেন।
“আমি আপনার পিতার প্রশংসা না করে পারি না, তার গোয়েন্দা ব্যবস্থা খুবই সুন্দর। গযনীর অন্ধ লোকেরাও প্রয়োজনের সময় চক্ষুম্মান হয়ে ওঠে। কোন বধির যদি আমাদের সাথে চুক্তি করে তবে অন্ধ যেমন চক্ষুম্মান হয়ে যায় তেমনি বধির ও শুনতে শুরু করে। বধির হওয়ার কারণে আবুল মনসুরের কানে উচ্চ আওয়াজে একথা বলা হলো। মাসউদের এ কথাকে আবুল মনসুর ভালোভাবে নিতে পারেননি। তিনি ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্টি মাখা কণ্ঠে বললেন;
শাহজাদা! তোমার বাবা তোমাকে অশ্বারোহণ ও তরবারী চালানো শিখিয়েছে বটে কিন্তু সম্মানিত লোকদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেই শিক্ষা দেয়নি। আমি সেই অন্ধ ব্যক্তির কথা বলছিলাম, যে অন্ধ হিসেবে আমার রাজ দরবারে দীর্ঘ দিন কাটিয়েছে, অথচ সে তোমার বাবার একজন বিশ্বস্ত চক্ষুষ্মন গোয়েন্দা। সেই অন্ধরূপী শিল্পীই হয়তো তোমার বাবাকে খবর দিয়েছে, এখানে গযনী সালতানাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। যার ফলে তোমাকে মৈত্রী চুক্তির পয়গাম দিয়ে পাঠানো হয়েছে।”
“মুহতারাম! আমি পয়গাম নিয়ে এসেছি, কোন দরখাস্ত নিয়ে আসিনি…..।
আমি বুঝতে পারিনি আপনি যে দৃষ্টিহীনের কথা বলছেন সে আমাদের সংবাদদাতা ছিল। দেখুন, আমি আপনার সাথে সাদামাটা কথা বলতে এসেছি, আপনি যদি আপনার রাজ্যকে শান্তিপূর্ণ নিরাপদ রাখতে চান তাহলে কাদের খান ও তোগা খানের মৈত্রী ত্যাগ করুন। আপনাদের তিনজনের সম্মিলিত বাহিনীও আমাদের ছয়শত হাতির মোকাবেলা করতে পারবে না। আপনার বড় ভাই এলিক খানের পরিণতির কথা নিশ্চয়ই আপনি ভুলে যাননি।
“আমাদের কি তাদের ভয় দেখাতে এসেছেন? উম্মমাখা কণ্ঠে বললো আরসালান খানের সঙ্গে আসা এক সেনাধ্যক্ষ। আপনি কি আমাদের এতোটাই দুর্বল ভাবছেন যে, আমরা আতংকিত হয়ে আপনাদের বশ্যতা স্বীকার করে নেবো?”
আবুল মনসুর যেহেতু বধির ছিলেন এজন্য তার সেনাধ্যক্ষ আর মাসউদের মধ্যে কি কথাবার্তা হচ্ছিল, তা তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন না। তিনি উভয়কেই বড় বড় চোখ করে দেখছিল আর তার সঙ্গীদের অনুরোধ করছিলেন এরা কি কথা বলছে তা তার কানে বলার জন্য ।এক পর্যায়ে উচ্চ আওয়াজে আবুল মনসুর তার সেনাপতিকে বললেন, তোমরা কি কথাবার্তা বলছে আমাকেও শোনাও।
“গযনীর প্রতিনিধি বলছে, আপনি যদি কাশগড় ও বলখের সাথে বন্ধুত্ব ত্যাগ না করেন, তাহলে তারা আমাদের উপর আক্রমণ করে সব কিছু ধ্বংস করে দেবে।
একথা শুনে আবুল মনসুর ক্ষুদ্ধ দৃষ্টিতে মাসউদের দিকে তাকালেন এবং বললেন, শাহজাদা শোন! তুমি যদি আমাদের হুমকি ধমকি দিয়ে তোমাদের সাথে মৈত্রী করতে এসে থাকে, তাহলে চলে যাও। গিয়ে সেনাবাহিনী নিয়ে এসো।
“একথা শুনে মাসউদ আবুল মনসুরের কানে মুখ লাগিয়ে উচ্চ আওয়াজে বললো, যে রাজ্যের শাসক বধির আর তার সেনাপতি মিথ্যাবাদী হয় আর সেই রাজ্যের প্রজাদের দুর্ভাগ্যের সীমা থাকে না। সম্মানিত আমীর! আপনার সেনাপতি আপনাকে মিথ্যা কথা বলছে। আমি একথা বলিনি। সেনাপতিরা যদি এভাবে আপনার শাসন কাজে হস্তক্ষেপ করতে থাকে তাহলে তো আপনার রাজ্যের অবস্থা খারাপ হতে বাধ্য। এভাবে আপনার রাজত্ব বেশিদিন টিকে থাকবে না। মাসউদ উচ্চ আওয়াজে কিছুক্ষণ কথা বলার পর আবুল মনসুরকে অনেকটা আশ্বস্ত করতে সক্ষম হলো যে, সে কোন শক্তি বা ক্ষমতা দেখাতে আসেনি, সত্যিকার অর্থেই তার সাথে মৈত্রী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের জন্যেই এসেছে।
একপর্যায়ে আবুল মনসুর মাসউদকে বললেন, ঠিক আছে, যেহেতু তুমি একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়গাম নিয়ে এসেছে, এনিয়ে আমরা একটু চিন্তা করি, আর তুমি ক’দিন মেহমান হিসেবে আমাদের এখানে থাকে। আমরা তোমাকে রাজকীয় মেহমানদারীর ব্যবস্থা করবো। তুমি ইচ্ছা করলে শিকারও করতে পারো।
