* * *
যে আলাভোলা সাদাসিধে যুবকটি আবুল মনসুরের দরবারে তবলা বেহালা নিয়ে মাথা নুইয়ে অন্ধ দৃষ্টিহীনের মতো আনা গোনা করতো আর বেহালা ও তবলার বাজনার সাথে মনোহরী কণ্ঠের গান গেয়ে সবার প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে শাসক আবুল মনসুরের কিশোরী কন্যা সিমনতাশের একান্ত বন্ধুতে পরিণত হয়েছিল, সংকটময় মুহূর্তে সেই যুবকই মারাত্মক এক সংবাদ নিয়ে খোরাসানের পাহাড় জঙ্গল উঁচু-নীচু পাহাড়ী পথে বীরের মতো তেজোদীপ্ত ভঙ্গিতে অশ্বারোহী হয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এ সময় তার মাথা উঁচু বুকটা যেন ফুলে প্রশস্ত হয়ে গেছে। কারণ, সে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর সুলতানের কাছে নিয়ে যাচ্ছে।
মাঝে মাঝে সে তার ঘোড়াটিকে বিশ্রাম দিচ্ছিল এবং পানি ঘাস খাইয়ে নিচ্ছিল।
ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে মনের আনন্দে এমন মনোহারী কন্ঠে গান গাইতে তার ঘোড়াটিও গানের সুরে মুগ্ধ হয়ে আরো দ্রুত দৌড়াতো। কারণ তার আরপাকড়াও হওয়ার আশংকা নেই। সে গযনীর সীমানায় প্রবেশ করেছে। অবশ্য গযনী তখনো বহু দূর।
গযনীর সীমানায় পৌঁছে শিল্পী প্রতিটি সেনা চৌকিতে ঘোড়া বদল করে নিচ্ছিল। কিন্তু নিজের বিশ্রামের প্রতি তার কোন খেয়াল ছিল না। কখন সে গাযনী পৌঁছাবে সেটিই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য।
দিন রাত এক নাগাড়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে সে গযনীর দিকে এগুচ্ছিল। তার খেয়াল ছিল না আজ কোন দিনের সূর্য ডুবে কোন দিনের সূর্য অস্ত গেল কিংবা সূর্য উঠে কোন দিনের সূচনা হলো। তার একমাত্র দৃষ্টি কখন গযনী পৌঁছাবে। এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে একদিন তার চোখে পড়ল গযনীর সবচেয়ে উঁচু। মিনারটি।
গযনী পৌঁছে শিল্পী যখন সেনাপ্রধানের কাছে হাজির হল তখন অনেক রাত। প্রথমেই জানাল সে কি খবর নিয়ে খোরাসান থেকে বিরতিহীন সফর করেছে।
সুলতান মাহমূদ আগেই এ নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন বাইরে থেকে কোন গোয়েন্দা যদি মধ্য রাতেও আসে সাথে সাথে আমাকে খবর দিবে।
শিল্পীরূপী এই গোয়েন্দার চেহারা দেখে এবং তার মুখে দু’চারটি কথা শুনেই সেনাপতি সুলতান মাহমূদকে খবর দিলেন। শিল্পীরূপী গোয়েন্দা আবু জাফর সুলতানকে মূল খবর বলার আগেই জানাল, সে একজন অন্ধ হিসেবে আবুল মনসুর আরসালান খানের দরবারে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। এ কারণে শুধু রাজ দরবার নয় তার ঘরের ভেতরে পর্যন্ত অবাধ যাতায়াত ছিল।
জাফর সুলতান মাহমুদকে জানালো, কাশগরের শাসক কাদের খান এবং বলখের শাসক তোগা খান এবং আবুল মনসুর আরসালান খানের সৈন্যরা যৌথভাবে খোরাসানের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে খোরাসান কজায় নেয়ার চক্রান্ত করেছে। সেই সাথে যে কোন ভাবে সুলতানকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে।
“আবুল মনসুর আরসালানখান গযনীর সাথে বংশগত শত্রুতা দূর করে ফেলতে চাচ্ছিল। কিন্তু কাদের খান ও তোগাখান তাকে এতোটাই আতংকিত করে ফেলেছে যে, সে ইচ্ছা অনিচ্ছায় ওদের চক্রান্তে শামিল হয়েছে। আবু জাফর বললো, আমার মনে হয়, আপনি যদি আবুল মনসুরকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেন, তাহলে হয়তো সে এই চক্রান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে পারে।
“আবুল মনসুরের সেনাধ্যক্ষদের ব্যাপারে কিছু বলতে পারো?” আবু জাফরকে জিজ্ঞেস করলেন সুলতান।
সেনারা তুর্কি মেয়েদের মোহে মোহগ্রস্ত। কাদের খান আবুল মনসুরের সেনাকর্মকর্তাদেরকে সুন্দরী মেয়েদের জালে আটকে রেখেছে। কাদেরখান বারবার আবুল মনসুরের কানে একথাই বলছে এখনই যদি সুলতান মাহমূদের উপর যৌথ আক্রমণ করে থামিয়ে দেয়া না হয় তাহলে আমাদের মতো ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে সে গিলে ফেলবে। কাদের খান আবুল মনসুরকে বুঝিয়েছে, সুলতান মাহমূদ হিন্দুস্তান থেকে বিজয়ী হয়ে এসেছে বটে কিন্তু তার সমর শক্তি মারাত্মক ভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। এই সুযোগে অতি সংগোপনে খোরাসান আক্রমণ করে সেখানে মজবুত কেন্দ্র বানিয়ে নিয়ে ছোট ছোট আক্রমণ অব্যাহত রাখতে হবে।
“আবুল মনসুরের সেনা বাহিনীর মধ্যে কখন থেকে পরিবর্তন এসেছে। নাকি এলিখ খানের সময় সেনা বাহিনীর অবস্থা যেমন ছিল তেমনই আছে। আবু জাফরকে জিজ্ঞেস করলেন সুলতান।
মাননীয় সুলতান! এলিখ খান আমাদের সেনাদের হাতে যে সব সৈন্যদের হত্যা করিয়েছিল, সেই সৈন্য ঘাটতি আবুল মনসুর পুরো করেছে। সম্মানীত সুলতান! এ প্রসঙ্গে আমি আবুল মনসুরের একমাত্র কন্যা সিমনতাশের উল্লেখ করা জরুরী মনে করছি। আবুল মনসুরের একমাত্র কন্যা সিমনতাশ যেমন তার বয়োজ্যষ্ঠ গৃহশিক্ষকের ভক্ত অনুরূপ তার পিতা মাতার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল। স্ত্রী কন্যা এক হয়ে আবুল মনসুরের উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছে যাতে আপনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি উদ্যোগী না হন।
সিমনতাশ খুব সুন্দরী ফুটফুটে চনমনে একটি মেয়ে। আমি তার নিজের কণ্ঠে একথা বলতে শুনেছি- আমি সুলতান মাহমুদের কাছে তাঁর বাদী হয়ে থাকাটাকেও জীবনের সৌভাগ্য বলে মনে করবো।
“মেয়েটির কি বিয়ে হয়নি?” জিজ্ঞেস করলেন সুলতান।
“জী না, এখনো বিয়ে হয়নি।” বললো আবু জাফর। সেই সাথে সিমনতাশ তার কাছে যে পয়গাম দিয়েছিলো তাও জানিয়ে দিলো। এ কথা শুনে সুলতান মাহমুদ গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।
সুলতান মাহমূদ আবু জাফরকে বিপুল পুরস্কার ও সম্মান দিয়ে বিদায় করলেন। সাথে সাথে তিনি ডেকে পাঠালেন, তার যুবক ছেলে মাসউদ আলমকে। মাসউদকে ডেকে তিনি বললেন
