দারা বলল, সম্মানিত সুলতান! আমি ইসলাম-দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত, আপন ভাইদের বিরুদ্ধে আমি তরবারী চালাতে অক্ষম। আমি আমার দেহরক্ষীসহ সব অনুগত সৈন্যদের নিয়ে আপনার দরবারে হাজির হয়েছি। আমি যাদের সেনাপতি আজ তারা ক্ষমতার জন্যে লড়াই করছে। আমি সারাজীবন ইসলামের জন্যে জিহাদ করেছি। আমি আমার সারাজীবনের অর্জিত জিহাদের সওয়াব ও পুণ্য নষ্ট করতে চাই না। আমাকে আপনার বাহিনীতে জায়গা দিয়ে আল্লাহর দরবারে আনুগত্য প্রকাশের সুযোগ দিন, সুলতান!
দারা তার সাথে আসা বাহিনীকে নির্দেশ দিল, তোমরা আবার ঘুরে ক্ষমতালিম্বু আমীর ফায়েক ও তার দোসরদের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ করো। দারা শুধু নির্দেশ দিয়ে ক্ষান্ত হলো না, ত্যাজ্য বাহিনীর উপর পাল্টা আক্রমণ হানতে অনুসারীদের নিজে কমান্ড দিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেল। সুলতান সুবক্তগীন তার সকল রিজার্ভ সৈনিকদের দু’ভাগে বিভক্ত করে দুই প্রান্তবাহিনীকে সহযোগিতার জন্যে পাঠিয়ে দিলেন। মাহমূদকে দিলেন এক বাহুর কমান্ডিংয়ের দায়িত্ব। নূহকে নিজের কাছে রাখলেন। সম্মুখ যুদ্ধে অনভিজ্ঞ নূহকে শত্রুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তিনি তার কোন বিপদ দেখতে চাননি।
অপরাধী কখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। কৃত অপরাধ অপরাধীকে তাড়া করে বেড়ায়। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মতো মনোবল অপরাধীর থাকে না। আমীর ফায়েক ও বু আলী হাসান তার সৈন্যদের সুলতান সুবক্তগীন ও দারার দয়ার উপর ছেড়ে দিয়ে জীবন নিয়ে পালিয়ে গেল। তাদের সাথে কিছু সৈন্যও পালাতে সক্ষম হল। এরা এতই ভীত হয়ে পড়েছিল যে, দৌড়িয়ে সুদূর জ্বরজানে গিয়ে থামল। জ্বরজানের বাদশাহ ফখরুদ্দৌলা তাদের আশ্রয় দিল। সেনাপতি দারার ঈমান ও আবেগ ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিল। তিনি ইসলামের গাদ্দারদের জ্বরজান পর্যন্ত তাড়া করার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছিলেন, কিন্তু সুলতান সুবক্তগীন তাকে এই বলে নিবৃত্ত করলেন, তিনি এই গৃহযুদ্ধকে আর বিস্তৃত করতে আগ্রহী নন বরং তিনি তাদেরকে সমঝোতার জন্যে আহ্বান করতে চান। দারার মতো মাহমূদও গাদ্দারদেরকে তাড়া করে অগ্নিপ্রতিশোধ স্পৃহা নিবৃত্ত করতে উদ্যত ছিলেন। ছদ্মবেশী দুশমনকে নিশ্চিহ্ন না করে ক্ষান্ত হতে তার টগবগে তারুণ্য ও উদ্দীপিত ঈমান সায় দিচ্ছিল না, তবুও পিতার আদেশ অম্লান বদনে মেনে নিল।
সুলতান সকল সৈনিককে একত্রিত করে নূহকে তার সৈন্যসহ বুখারায় ফিরে যেতে বললেন। মাহমূদ তার নিয়ন্ত্রিত বাহিনী নিয়ে নিশাপুর রওয়ানা হলেন। সুলতান রওয়ানা হলেন গজনীর পথে। সেনাপতি দারাকে তিনি নিজের সঙ্গী করে নিলেন।
মাহমূদ নিশাপুর পৌঁছে নিঃশ্বাস নেয়ার আগেই তার এক সীমান্ত সেনা-দূত হন্তদন্ত হয়ে তাকে খবর দিল, ফখরুদ্দৌলার সাহায্যপুষ্ট হয়ে আমীর ফায়েক ও বু আলী হাসান যুদ্ধসাজে নিশাপুরের দিকে এগিয়ে আসছে। ফখরুদ্দৌলা পূর্ব থেকেই সুলতান সুবক্তগীনের যুদ্ধ-পরিণতির দিকে দৃষ্টি রাখছিল। যখন সে সংবাদ পেল, সুলতান অধিকাংশ সৈন্য সাথে নিয়ে গজনী গেছেন এবং মাহমূদের কাছে মাত্র কিছুসংখ্যক সৈন্য রয়ে গেছে। সে তখন মাহমুদের বাহিনীর উপর আক্রমণকে সুযোগ মনে করল। অকস্মাৎ প্রচণ্ড আক্রমণ করে বসল।
মাহমূদ সেই দূতকে দ্রুত সুলতানকে সংবাদ জানাতে পাঠিয়ে দিয়ে সৈন্যের কমান্ড নিজ হাতে নিয়ে ময়দানের দিকে অগ্রসর হলেন। ততক্ষণে প্রতিপক্ষের সৈন্যে ময়দান ছেয়ে গেছে। মাহমূদের বাহিনীকে ঘিরে ফেলে প্রতিপক্ষ। মাহমূদের দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি ও যুদ্ধের অবসাদ দূর হওয়াতো দূরে থাক যাত্রা শেষ করার সুযোগটুকুও তার হয়নি। তার সৈন্য সংখ্যা প্রতিপক্ষের তুলনায় অতি নগণ্য। মাহমূদ প্রতিপক্ষের মুখোমুখি দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। মাহমূদ পশ্চাদপসারণের চিন্তা করলেন। কিন্তু পিছনে ফেরারও তেমন সুযোগ নেই। শত্রুবাহিনীর ঘেরাও ছিল খুব মজবুত। বাহ্যত মাহমূদ ছিলেন মৃত্যু ও বন্দী হওয়ার মুখোমুখি।
মাহমূদের সংবাদবাহী দুই দূত উল্কার বেগে সুলতানের উদ্দেশে ছুটে চলে। মাহমূদের ভাগ্য সুলতানের সাহায্যের উপর অনেকাংশে নির্ভর হয়ে আছে। কিন্তু পথ ছিল যেমন দুর্গম তেমনই দীর্ঘ।
ঐতিহাসিকগণ বলেন, পরদিন আলী হাসান ও আমীর ফায়েক দেখল, তাদের পিছনের আগমন পথে ধূলি উড়ছে। তারা ভাবল, হয়ত ফখরুদ্দৌলা তাদের জন্য আরো সাপোর্ট বাহিনী পাঠিয়েছে। তারা এখন নিশাপুরের সর্বত্র ছড়িয়ে যাবে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে তাদের আকাঙ্ক্ষা দুরাশায় পরিণত হলো। তারা দেখল, সুলতান সুবক্তগীনের সৈন্য দুই দিক থেকে তাদের বাহিনীকে ঘিরে ফেলেছে। তারা ধারণাই করতে পারেনি যে, সুলতান সুবক্তগীন এতো দ্রুত মাহমূদের সাহায্যে এত দূর পৌঁছে যাবেন। সুলতান ও দারা তাদের বাহিনীকে দুই বাহুতে প্রলম্বিত করে শত্রুদের ঘিরে ফেললেন। বিদ্রোহীরা যখন দেখল, তাদের পশ্চাদপসারণের পথ রুদ্ধ, তখন তারা নিজ বাহিনীকে একত্রিত করে সুবক্তগীনের মধ্য বাহিনীতে আক্রমণ করে বসল। পশ্চাদপসারণরত মাহমূদ ঘুরে প্রচণ্ড আক্রমণে ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
যুবক মাহমূদ এমনিতেই গাদ্দারদের প্রতি রাগে ফুঁসছিলেন। কিন্তু মুখোমুখি হওয়ার মতো অবস্থা তার ছিল না। তিনি সুলতানের আগমন প্রত্যাশায় কালক্ষেপণের জন্যে শুরু থেকে বাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখার লক্ষ্যে পশ্চাদপসারণের কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। তিনি দেখলেন, প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত গতিতে সুলতান বাহিনী নিয়ে শত্রুপক্ষকে ঘিরে ফেলেছেন, তখন তার ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আগ্নেয়গিরি অগ্নৎগিরণ করতে শুরু করল। তিনি শত্রু বাহিনীর উপর ব্যাঘ্রের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শত্রুবাহিনী তার অল্প সংখ্যক সৈন্যের আক্রমণেই ধরাশায়ী হয়ে গেল। কিন্তু কুচক্রী আমীর ফায়েক ও বু আলী হাসান কোন ফাঁকে পালিয়ে গেল কেউ টের পেল না। তাদের সৈন্যরা কচুকাটা হল । সাপের উদ্যত মাথা নীচু হয়ে গেল। এক বিশাল বিজয় সুবক্তগীনের পদচুম্বন করল।
