এদিকে লাহোরের রাজা-মহারাজারা মিত্রবাহিনী প্রস্তুতিতে রাতদিন জোরদার তৎপরতায় ব্যস্ত। তারা গজনী, বুখারা, বলখ, খোরাসান দখল করার স্বপ্নে বিভোর। এবার শুধু সরকারী সেনারা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবে না, হিন্দু প্রজা সাধারণ নারী-পুরুষ, ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল পৌত্তলিক ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে লিপ্ত। নিজেদের ঘরে রক্ষিত সোনা-গহনা, উপার্জিত পুঁজি-পাট্টা, মাল-আসবাব, রসদ উপকরণ যে যা পারল সবই সুলতান সুবক্তগীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে বিলিয়ে দিল। হিন্দু পণ্ডিত-পুরোহিতেরা নাগরিকদের মনে মুসলিম বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। পুরোহিতরা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এই ধারণা জন্মাতে সক্ষম হয়েছিল, এখনই মুসলমানদের রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে ওদের রাজ্য দখল করতে না পারলে ভবিষ্যতে ভারতে কোন হিন্দুর অস্তিত্বই থাকবে না। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু রাজা-মহারাজাদের কর্তব্য নয়, প্রত্যেক হিন্দুর ধর্মীয় দায়িত্ব।
অপরদিকে ইসলামী ভূখণ্ডে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরস্পর খুনোখুনিতে লিপ্ত মুসলিম নেতৃত্ব। ক্ষমতালিন্দু মুসলিম আমীরেরা মুসলিম রাজ্যগুলোকে টুকরো টুকরো করে পরস্পর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নিজেদের অমিয় শক্তি ক্ষয়ে লিপ্ত।
পেশোয়ার, লাহোর ও রাটাভায় সুলতানের গোয়েন্দারা জীবনবাজি রেখে রাজা-মহারাজাদের প্রতিটি পরিকল্পনা ও কার্যক্রম যথাসময়ে সুলতানকে অবহিত করছিল। তাদের ত্যাগ, বীরত্ব, সাহস ও দায়িত্ববোধের পরাকাষ্ঠা আল্লাহ ছাড়া আর কারো পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। এরা ছিল গুমনাম আত্মপরিচয় গোপনকারী ছদ্মবেশী- যারা কর্তব্য পালনের স্বার্থে নিজেদের নাম পর্যন্ত বদলে ফেলত। কিন্তু এদের অমূল্য অবদানকে ম্লান করে দিচ্ছিল হাতেগোনা কিছু সংখ্যক বেঈমান।
সুবক্তগীন রণক্লান্ত সৈনিকদের অবকাশ ও নিজেও কিছুটা বিশ্রামের জন্যে নিশাপুর থেকে বলখ চলে গেলেন। এরই মধ্যে তিনি নতুন সৈন্য ভর্তি ও সংগ্রহ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু লাগাতার যুদ্ধ আর প্রশাসনিক কাজের মধ্যে ডুবে থাকায় নিজের শরীর ও স্বাস্থ্যের দিকে দৃষ্টি দেয়ার অবকাশ তার হয়নি। ইতোমধ্যে বার্ধক্য ও রোগ তার শরীরে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। চিকিৎসকরা তাকে দীর্ঘ বিশ্রামের পরামর্শ দিলেন। চিকিৎসকরা তাকে যতো দ্রুত সম্ভব সুস্থ করে তুলতে চেষ্টা করছিলেন। অপরদিকে অসুস্থতা তার চেয়েও বেশি দ্রুত বেগে বাড়তে শুরু করল। এক পর্যায়ে তিনি গজনী চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং গজনীর উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। কিন্তু পথিমধ্যে তাকে যাত্রা বিরতি করতে হলো। তার পক্ষে আর পথচলা সম্ভব হলো না। একদিন সুলতান সুবক্তগীন শাইখ আবুল ফাতাহকে অসুখের প্রচণ্ডতায় বলছিলেন, “আমরা অসুস্থ হলে সুস্থ হওয়ার জন্যে চিকিৎসা করি, এক সময় সুস্থও হই। আবার অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হই, আবার চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হই। কিন্তু একদিন এমন আসে যখন আর সুস্থতা ফিরে আসে না। দুনিয়ার কোন চিকিৎসাই মৃত্যু থেকে মানুষকে রেহাই দিতে পারে না। কসাইরা যেমন খুব যত্ন করে খাসিকে ঘাস-পানি দেয়। খাসি কসাইয়ের আদর-যত্নে ভাবতে থাকে, সে চরিদিনই এমন আদর-যত্নেই থাকবে। কিন্তু হঠাৎ কসাই খাসির গলায় ছুরি চালিয়ে নিমিষে তার সকল আদর-যত্নের অবসান ঘটায়। মৃত্যুও কসাইয়ের মতো। যতো আরাম-আয়েশেই আমরা এখন থাকি না কেন, একদিন এই নির্মম মৃত্যু আমাদের জীবন কেড়ে নেবে, মৃত্যু থেকে কারো রেহাই নেই।” সমকালীন বুযুর্গ শাইখ আবুল ফাতাহকে একথা বলার ঠিক চল্লিশ দিন পর হঠাৎ সুলতানের অসুখ খুব বেড়ে গেল। তিনি কিছু বলার জন্য চোখের ইশারায় নির্ভরযোগ্য লোক খুঁজছিলেন, তার বাকশক্তি রহিত হয়ে আসছিল। নিরাপত্তারক্ষীর কমান্ডার তার সামনে এগিয়ে গেলে তিনি বলেন, “মাহমূদকে বলবে, তোমাকে মূর্তিসংহারী হতে হবে। তাকে কর্তব্য ও অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হবে।” একথা বলে তিনি নীরব হয়ে গেলেন। পরক্ষণেই তাঁর দেহ নিথর হয়ে গেল। মৃত্যুবরণ করলেন, সুবক্তগীন।
সময়টি ছিল ৯৯৭ সালের আগস্ট মোতাবেক ৩৮৭ হিজরী সনের শাবান। ৫৬ বছর বয়সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন সুলতান সুবক্তগীন। ছিন্নমূল যাযাবর পুত্র, দাসের হাটে বিক্রিত গোলাম ইসলামি ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি করে, মূর্তিসংহারী বিশ্বখ্যাত সন্তান জীবন্ত কীর্তি রেখে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। ইতিহাস তাকে চিরদিন সত্যের পূজারী ও মিথ্যার বিরুদ্ধে অকুতোভয় বীর যোদ্ধা হিসেবে স্মরণ করবে।
মাহমূদ পিতার মৃত্যু সংবাদ শুনে পিতার শিয়রে হাজির হলেন। মৃতদেহ নিয়ে গেলেন গজনী। সেখানে কাফন ও জানাযা শেষে তাকে কবরে সমাহিত করলেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে পিতার মৃত্যুতে তাকেই কাঁধে তুলে নিতে হলো রাজ্যপাটের গুরুদায়িত্ব।
১.২ অভিন্ন ঔরসের দুই গর্ভজাত : দুই পথ
অভিন্ন ঔরসের দুই গর্ভজাত : দুই পথ
সুলতান সুবক্তগীনের মৃত্যুর পর মাহমূদ পিতার দাফন কাফন সেরে পুনরায় নিশাপুর চলে গেলেন। পিতার অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত ছিলেন মাহমূদ। তাছাড়া তাদের মোকাবেলায় চতুর্দিকের রণপ্রস্তুতি সম্পর্কেও জ্ঞাত ছিলেন তিনি। পিতার রেখে যাওয়া মিশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পিতৃহারা শোককে তিনি শক্তিতে পরিণত করতে সৈন্যবাহিনীর প্রতি নজর দিলেন। গজনী গিয়ে রাষ্ট্রীয় কাজকর্মের রুটিন ওয়ার্ক করাটাকে তিনি গৌণ মনে করলেন। তার বিশ্বাস ছিল, প্রশাসনিক যন্ত্র ঠিকমতই কাজ করবে। কেননা তার পিতার জীবদ্দশায় প্রশাসনের কোথাও উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ঘটতে তিনি দেখেননি। তাই রাজধানীতে গিয়ে রাজকীয় আয়েশে বিভোর হওয়ার কথা তার চিন্তায় মোটও স্থান পায়নি। তার মনে হয়নি, কারো পক্ষ থেকে প্রশাসনে কোন ঝামেলা কিংবা অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। গজনী যাওয়া প্রায় ছেড়েই দিলেন মাহমুদ।
