এখন আমাদের প্রতিপক্ষে যারা দাঁড়িয়েছে এরা পৌত্তলিকদের মতোই খোদাদ্রোহী ও আল্লাহর দুশমন। এরা আল্লাহর দুশমনদেরই সহায়তা করছে; আমাদের নিঃশেষ করে ওরা আমাদের চিরশত্রু ও ইসলামের দুশমনদের শক্তি বৃদ্ধি করতে চাচ্ছে। তোমরা ওদের মুখে নারায়ে তাকবীর’ শুনে বিভ্রান্ত হয়ে তরবারী কোষবদ্ধ করে ঘোড়ার গতি ঘুরিয়ে নেবে না। তোমরা এই প্রতারক-শত্রুদের দ্বারা বিভ্রান্ত হলে এই ভূখণ্ড থেকে ইসলাম চিরতরে বিদায় নেবে। এরা শয়তানের দোসর। এরা চাঁদ-তারা খচিত ঝাণ্ডা বহন করছে তোমাদের ধোঁকা দিতে। চেনা শত্রুদের আগে ছদ্মবেশী এই শত্রুদের নিঃশেষ করতে হবে। এরা ঘরের শত্রু বিভীষণ, ভাইয়ের বেশে হন্তারক, শত্রুপক্ষের ক্রীড়নক।
আমি ওদেরকে এই যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার জন্যে চেষ্টা কম করিনি, কিন্তু তারা আমার বিনীত প্রস্তাব ও জাতির কল্যাণের কথা মোটেও বিবেচনা করল না। আমি আমার কোন ছেলের মৃত্যু মেনে নিতে পারি, কিন্তু ধর্মের অপমান সহ্য করা অসম্ভব। ইসলামের শক্তি অজেয় রাখতে আমরা জীবন বিলিয়ে দেব, কিন্তু শত্রুদের দূরাশা পূরণ করতে দেবো না।
আল্লাহর সৈনিকগণ! ইসলামের সৈনিকেরা রাজত্বের জন্যে লড়াই করে না, ইসলামের সৈনিকরা আল্লাহর হুকুমত মজবুত এবং গোমরাহ মানুষকে আল্লাহর আনুগত্যের শামিয়ানার নীচে একত্রিত করতে জীবনপণ জিহাদে অবতীর্ণ হয়। তোমরা কি ভুলে গেছো মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো কাফেরদের কজায় চলে যাওয়ার পর সে সব মা-বোনের কথা, যাদের ইজ্জত নিয়ে বেঈমানেরা উল্লাস করেছিল? তোমরা কি চাও ওরা আমাদের কন্যাদের উপর নারকীয় বর্বরতা চালাক? অথচ তোমাদের বিপরীতে যেসব মুসলিম নামের কাপুরুষ আমীর-উমারা যুদ্ধসাজে সজ্জিত তারা নিজ কন্যাদের ইজ্জত বেঈমানদের কাছে বিকিয়ে দিয়েছে। যারা স্ত্রী-কন্যার ইজ্জত-সম্ভ্রমের মূল্য দেয় না, তাদের কাছে ইসলাম ও ধর্মের মর্যাদা আর জাতির কল্যাণের আশা করা দুরাশা নয় কি? ইসলামের পরাজয় ও মর্যাদাহানিতে ওদের কিছুই যায় আসে না।”
আবেগ, উত্তেজনায় সুলতান সুবক্তগীনের ভাষণ আরো জোরালো ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছিল। তার অগ্নিঝরা বক্তৃতা শুনে নূহ ও মাহমূদের সৈনিকরা প্রতিপক্ষের প্রতি ক্ষোভে টগবগ করছিল। যোদ্ধাদের শরীরের রক্তে যেন আগুন ধরে গিয়েছিল প্রতিপক্ষের সবকিছু তছনছ করে দিতে। কিন্তু যোদ্ধাদের এই উজ্জীবন ও উত্তেজনায় সুলতানের মধ্যে কোন আশার সঞ্চার করল না। তার মলিন চেহারার কালিমা দূর হল না। তার চেহারা তখনও দুঃখে কাতর, বিষাদে ভারাক্রান্ত। দীর্ঘ বক্তৃতার পর তিনি সৈনিকদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণের পর লড়াইয়ের কৌশল বলে দিলেন। সুবক্তগীন ও মূহ অবস্থান নিলেন বাহিনীর মাঝখানে। প্রতিপক্ষে দারা নামের এক বিখ্যাত যোদ্ধা রয়েছে। নিজ রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়েও বহু দূর-দূরত্ব পর্যন্ত মুখে মুখে ফেরে তার বাহাদুরি ও বীরত্বের কাহিনী । সে যখন সুলতানের বাহিনীকে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে দেখল, সাথে সাথে নিজ দলের সৈনিকদের সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে দিল। দারা জানতো, সে যদি সুলতানকে আগে আক্রমণের সুযোগ দেয় তবে বিজয়ী হওয়া কঠিন। একটু সুযোগ পেলেই সুলতানের বাহিনী সব তছনছ করে দেবে। সুলতানের যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে তার সম্যক ধারণা ছিল। দারা ছিল সদা সজাগ ও সতর্ক ব্যক্তিত্ব।
এক অভিনব কৌশল করল দারা। সে মাঝের সৈনিকদের স্থিতাবস্থায় রেখে অনেক ঘুরপথে এসে সুলতানের বাহিনীর দুই প্রান্তবাহুতে আক্রমণ করে বসল। দারার এই আক্রমণ ছিল ধারণাতীত এবং প্রচণ্ড ।
সুলতানের জন্যে দারার এই চাল ছিল একেবারেই আন্দাজের বাইরে। আকস্মিক এই আক্রমণে সুলতানের বাহিনী বেঘোরে প্রাণ দিতে লাগল এবং ভড়কে গেল। দারার সেনাশক্তিও প্রচুর। তদুপরি সে নির্বাচিত ও দক্ষ বিপুল সৈন্য রেখেছিল মধ্যভাগে। সে জানতো, প্রতিপক্ষের দু’বাহু একই সাথে আক্রমণের শিকার হলে সুলতানকে দু’দিকেই সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। এতে মধ্যভাগের প্রতিরক্ষা ব্যুহ দুর্বল হয়ে পড়বে, আর এ সুযোগে সে প্রচণ্ড আক্রমণ করে বিজয় ছিনিয়ে নেবে।
সুলতানকে দারার কৌশলের ফাঁদেই পড়তে হলো। পরাজয় অনিবার্য হয়ে উঠল। তখন তিনি মধ্যভাগের রিজার্ভ সৈন্যদের প্রান্ত বাহুকে শক্তিশালী করার নির্দেশ দিলেন। ফলে তার রক্ষণভাগ দুর্বল হয়ে পড়ল। তিনি দিব্যি দেখতে পেলেন, মধ্যভাগেও আক্রমণ অত্যাসন্ন। তিনি মাহমূদ ও নূহকে বললেন, বেটা! হয়তো আজই আমার জীবনের শেষ যুদ্ধ, তোমরা সচেতন থাকো, অগ্রপশ্চাতে খেয়াল রেখো। যুদ্ধের গতি এখন শত্রুদের অনুকূলে। একটু অসতর্কতা বিরাট অঘটন ঘটাতে পারে।
সেই যুগের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ফেরেশতা লিখেছেন, সুলতানের দৃষ্টিতে যখন পরাজয়ের ক্ষণ ঘনিয়ে আসছিল তখন ধূলি উড়িয়ে প্রচণ্ড বেগে একজন অশ্বারোহী সুলতানের দিকে অগ্রসর হতে দেখা গেল। শত্রুসৈন্যদের ব্যুহ থেকে আসতে দেখলেও তার তরবারী ছিল কোষবদ্ধ, ঢালটি পিছনে বাঁধা ছিলো। আগন্তুকের অবস্থা বলে দিচ্ছিল, সে কোন প্রস্তাব নিয়ে আসছে। দূত বা বার্তাবাহক হয়তো হবে।
সে সুলতানের কাছে এলে সবাই বিস্ময়ে হতবাক। এতে কোন সাধারণ দূত বা বার্তাবাহক নয়– শত্রুপক্ষের সেনাপতি দারা নিজে হাজির। দারা সুলতানের কাছে এসে সামরিক অভিবাদন ও সালাম দিয়ে নিজের ঢাল-তরবারী সুলতানের পায়ের কাছে ফেলে দিল।
