আমি একথা বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি না শিল্পী অন্ধ নয় চক্ষুষ্মন।
এ ক্ষেত্রে আর বেশী কিছু করার নেই ভেবে কাদের খান বৃদ্ধ গৃহ শিক্ষককে বললেন, শোন গুরুজী- “তুমি যার নিমক খাচ্ছো, আড়ালে আবডালে তার গাদ্দারী করছে। তুমি যদি বলো, ওই বেহালা বাদক এখান থেকে কি খবর নিয়ে পালিয়েছে, তা হলে আমরা তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। নয়তো তোমাকে খুবই কঠিন মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে।”
কাদের খানের এই হুমকিমূলক বাক্য শুনে সিমনতাশ তার সামনে দাঁড়িয়ে বললো–
“খবরদার! আমার গুরুজী সম্পর্কে এখানে যদি আর একটি অবমাননাকর শব্দ উচ্চারিত হয় তবে আমি বলতে পারি না এখানে কি পরিস্থিতির উদ্ভব হবে। আপনারা জেনে রাখুন, আমরা কাশগড়ের কেনা গোলাম নই।”
“গুরুজী হাতে সিমনতাশকে সরিয়ে দিয়ে কাদের খানের উদ্দেশ্যে বললেন–
“সামান্য এক টুকরো এলাকার রাজত্ব তোমাকে খোদায় পরিণত করেনি কাদের খান! আমি সুলতান মাহমূদের সহযোগী নই, আমি সত্যের পূজারী। আমি সঙ্গীত শিল্পীকে শুরু থেকে অন্ধ ভেবেই আসছি, এখনো অন্ধই মনে করি। সেই সাথে তোমাদেরকেও আমি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মনে করি। ওই দৃষ্টিহীন লোকটি যদি গযনী সুলতানের গোয়েন্দা হয়ে থাকে তবে সে দৃষ্টি অন্ধ ছিল কিন্তু তার অন্তর অন্ধ ছিল না। তার হৃদয়-অন্তর ছিল আলোকিত। আমি ওর সম্পর্কে কিছুই জানি না। কি খবর নিয়ে সে এখান থেকে চলে গেছে তাও আমি জানি না, তবে এটা বলতে পারি যদি সে কোন খবর নিয়েই গিয়ে থাকে তবে সে একজন পাক্কা মুসলমান।
কাদের খান আবুল মনসুরের কানের কাছে মুখ নিয়ে উচ্চ আওয়াজে বললো, এই বুড়োটাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দিন। এই বুড়ো ভেতরে ভেতরে আমাদের শিকড় কাটছে।
কাদের খানের কথা শুনে আবুল মনসুর গুরুজীর দিকে তাকালেন। পারিবারিক শিক্ষক গুরুজীর দিকে তাকালে তার মনের আয়নায় ভেসে উঠলো, এই বয়স্ক লোকটি আমার পিতার শিক্ষক ছিলেন। আমাকে পড়িয়েছেন তিনি। আর এখন তিনি আমার মেয়ে সিমনতাশের গৃহ শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
আবুল মনসুরের দিকে তাকিয়ে তার কানে কানে সিমনতাশ বললো
আপনি কাদের খানের কথা মানবেন? না আল্লাহর হুকুম মানবেন? আপনি যদি দুনিয়াকে প্রাধান্য দেন, তাহলে আমি বলে দিতে পারি পরাজয় আপনার বিধিলিপি হয়ে গেছে। আপনি যদি গণ বিদ্রোহের আশংকাকে আমল না দেন তাহলে এই বুড়োকে কয়েদখানায় বন্দি করতে পারেন। একথা বলে সিমতাশ রাজ দরবার থেকে বেরিয়ে এলো।
এবার আবুল মনসুর স্বমূর্তি ধারণ করে কাদের খানের উদ্দেশে বললেন, কাদের খান! আমি আপনার সাথে সামরিক চুক্তি করেছি এবং যৌথ যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু আপনার সব হুকুম আমি মানতে বাধ্য নই। আমাকে এতোটা দুর্বল ভাবার কারণ নেই যে আপনার প্রতিটি নির্দেশ মানতে আমি বাধ্য।
“ওহ! বোঝা যাচ্ছে, আপনি সুলতান মাহমূদকে ভয় করেন।” বললেন কাদের খান। আপনার কি বিশ্বাস হয় না, আমি আর তোগাখান যে কোন মূল্যে আপনার সঙ্গ দেবো?
“আমি সুলতান মাহমূদকে ভয় করছি না। আমার হৃদয়ে এখনো আল্লাহর ভয় কিছুটা রয়েছে। ক্ষমতার মোহ আমাকে এতোটা অন্ধ করেনি, যার হাতে আমার তিন পুরুষ শিক্ষা নিয়েছে, আমি নিজে যার কাছ থেকে জীবনের দীক্ষা পেয়েছি, এই বৃদ্ধ বয়সে শুধু সন্দেহের কারণে তাকে জেলখানায় বন্দী করবে। আপনি এখন চলে যেতে পারেন, যাওয়ার সময় আপনি বিশ্বাস রাখতে পারেন, যুদ্ধের প্রশ্নে আমি আপনাদের সাথেই রয়েছি এবং থাকবো।” এই বলে আবুল মনসুর গুরুজীকে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলে গুরুজী দৃঢ়পদে গর্বিত ভঙ্গিতে দরবার কক্ষ ত্যাগ করলেন।
সুলতান মাহমূদকে তার গোয়েন্দা কি খবর দেবে? জিজ্ঞাসু কণ্ঠে আবুল মনসুর একথা বলে নিজেই নিজের প্রশ্নের জবাবে বললেন, বড়জোর এ খবর দেবে, আমরা তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এটা তার কাছে গোপন কোন খবর নয়, সে জানে আমরা তার শত্রু। তাই সে খোরাসানের নিরাপত্তা রক্ষার পাকাঁপোক্ত ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছে। এতে আপনার ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই, আমাদের প্রস্তুতিতে বেশী সময় ব্যয় করা যাবে না ।
আবুল মনসুরে একথা ও সার্বিক অবস্থা দেখে কাল বিলম্ব না করে কাদের খান তখনই সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে গেলেন।
গুরুজী রাজদরবার থেকে বের হয়ে সোজা সিমনতাশের কাছে চলে এলেন। তিনি সিমনতাশকে জিজ্ঞেস করলেন, সত্যিই কি শিল্পী দৃষ্টিহীন নয়?
সিমনতাশ গুরুজীকে জানালো–
আমিতো তাকে দৃষ্টিহীনই মনে করতাম। সুলতান মাহমূদকে একটি পয়গাম পাঠানোর কথা সিমনতাশ স্বীকার করে বললো, শিল্পী আমাকে জানিয়ে ছিল, সে না গিয়ে অপর কোন ব্যক্তিকে পাঠাবে।”
“সামনে ঘোরতর বিপদের আশংকা দেখতে পাচ্ছি। আল্লাহর মেহেরবানী ছাড়া এ মহাবিপদ থেকে আর কেউ রক্ষা করতে পারবে না সিমনতাশ।’ বললেন গুরুজী।
“এজন্যই তো আমি খবর পাঠিয়ে দিয়েছি, যাতে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ প্রতিরোধ করা যায়। বললো সিমনতাশ। প্রয়োজনে আমি নিজেও গযনী যেতে প্রস্তুত। তাতে যদি আমার কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয় তাও আমি পরওয়া করব না।
এততদিন অভিজ্ঞ গুরু সিমনতাশকে বাস্তবতার নিরিখে ইতিহাসের আয়নার যে বাস্তবতা উপলব্ধি করার দূরদর্শীতা শিক্ষা দিয়ে ছিলেন, এখন সেই শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সিমনতাশের দৃঢ় প্রত্যয়ীও তার প্রতিটি পদক্ষেপে।
