আহত হরিণটিকে ধাওয়া করছিল একদল শিকারী। কিন্তু তারা ছিল হরিণ থেকে অনেক দূরে। শিল্পী যখন তীর বিদ্ধ করে হরিণের গতি থামিয়ে দিয়ে হরিণের কাছে গিয়ে থামল ততোক্ষণে হরিণের পিছু ধাওয়াকারী শিকারী দল শিল্পী ও হরিণের কাছে পৌঁছে গেল। দৃষ্টিহীন শিল্পী হরিণের পিছু ধাওয়াকারী শিকারী দলটিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বললো
“আমি আপনাদের থেকে পালিয়ে আসা হরিণটিকে ফেলে দিয়েছি। একথা তার মুখে উচ্চারিত হলো বটে কিন্তু শিকারী দলকে দেখে মনে মনে সে ঘাবড়ে গেল। কারণ, সে শিকারী দলটিকে চিনে ফেলেছিলো।
শিকারী দলের লোকজনও দৃষ্টিহীন লোকটিকে দেখে বিস্মিত হলো। কারণ, শিকারী দলের দলপতি ছিল কাদের খান। তার পিছনের ঘোড়াতেই সওয়ার ছিল কাদেরখানের সফর সঙ্গী কন্যা আকসী। আর অন্যেরা ছিল কাদের খানের উপদেষ্টা আর নিরাপত্তারক্ষী। কাদের খান যে দিন আবুল মনসুরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পথিমধ্যে হরিণ শিকারে মেতে ওঠেছিল সেই দিনই দৃষ্টিহীন শিল্পী আবুল মনসুরের কন্যার সহযোগিতায় সুলতানকে হত্যার চক্রান্তের খবর নিয়ে রওয়ানা হয়েছিল।
কাদের খান প্রথমে হরিণের গায়ে একটি তীর বিদ্ধ করে আর দ্বিতীয় তীরটি বিদ্ধ করে তার মেয়ে আকসী। কিন্তু দুটি তীর বিদ্ধ হওয়ার পরও হরিণ ছুটে পালাতে সক্ষম হয় কিন্তু ঘটনাক্রমে আহত হরিণটি; অন্ধ বেহোলা বাদকের সামনে পড়ে যাওয়ায় সে চূড়ান্ত আঘাত হানে এবং একটি তীর বিদ্ধ করতেই হরিণটি মাটিতে লুটিয়ে পড়তে বাধ্য হয়।
শিল্পীকে দেখে কাদের খান বলে বসলেন, “আরে তুমি কি সেই দৃষ্টিহীন সঙ্গীত শিল্পী না? যে আবুল মনসুরের রাজ প্রাসাদে আমাদের মন কাড়া সঙ্গীত শুনিয়েছিলে?”
শিল্পীর তবলা তার ঘোড়ার জিনের সাথেই বাধা ছিল। আকসী তার ঘোড়া শিল্পীর ঘোড়র কাছে নিয়ে তবলার বাধা পুটলাটা খুলতে শুরু করল। পরিস্থিতির আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল শিল্পী। কারণ এততক্ষণে পুটলা খোলে তার তবলা বেহালা আকসী বের করে ফেলেছে। এখন আর এদের কাছে বিষয়টি অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, সে সেই দৃষ্টিহীন সঙ্গীত শিল্পী নয়।
আব্দু! আমার শুরু থেকেই লোকটিকে সন্দেহ হচ্ছিল সে নিশ্চয়ই গোয়েন্দা হবে। নয়তো কোন দৃষ্টিহীন লোকের পক্ষে কি হরিণকে তীর বিদ্ধ করা সম্ভব?” বললো আকসী।
কাদের খান তরবারী বের করার নির্দেশের কণ্ঠে বললেন, বাঁচতে চাও তো তোমার আসল পরিচয় বললো।
কাদের খানের নিরাপত্তারক্ষীরা সঙ্গীত শিল্পীকে চতুর্দিকে ঘেরাও করতে চাচ্ছিল ঠিক সেই সময় অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করে শিল্পী তার ঘোড়ার জিন টেনে ঘোড়াকে সজোরে তাড়া করল। ঘোড়াটি ছিল প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর ঘোড়া। ইঙ্গিত পেতেই ঘোড়া উৰ্ধশ্বাসে ছুটতে শুরু করল। তাদের সন্দেহভাজন এক শিকারীকে পালাতে দেখে কাদের খান তার নিরাপত্তা রক্ষীদের বলল ওকে পাকড়াও করো।
কাদের খানের নিরাপত্তা রক্ষীরা ঘোড়ার বাগ শামলিয়ে শিল্পীর পিছু ধাওয়া করতে করতে সে অনেক দূর চলে গেল। প্রাণপণ চেষ্টা করেও কাদের খানের নিরাপত্তারক্ষীরা আর শিল্পীর নাগাল পেল না।
শিল্পী আসলে ছিল একজন দক্ষ অশ্বারোহী। সে তার ঘোড়ার গতি শিথিল হতে দিলো না। ঘোড়া উৰ্ধশ্বাসে লাফিয়ে লাফিয়ে উড়ে চললো। অনেক দূর গিয়ে শিল্পী পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখলো তাকে ধাওয়াকারীরা অনেক পেছনে। ধাওয়াকারীরা এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে পিছু ধাওয়া ত্যাগ করে ফিরে যেতে শুরু করল।
* * *
দিনের শেষ প্রহরে আবুল মনসুর খবর পেলেন যে, কাদের খান সকালে তার দলবল সহ বিদায় নিয়ে ছিল সে একটি হরিণ শিকার করে আবার ফেরত এসেছেন। কাদের খানের ফেরত আসার খবর শুনে সে দৌড়ে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন। দেখা মাত্রই কাদের খান অভিযোগ করলেন, তোমার দরবারে যে অন্ধ সঙ্গীত শিল্পী ছিল সে আসলে অন্ধ ছিল না, সে পূর্ণ দৃষ্টিশক্তির অধিকারী। আজ সকালেই সে এখান থেকে পালিয়ে গেছে।
‘সে নিশ্চয়ই সুলতান মাহমূদের গোয়েন্দা হবে। সে হয়তো আমাদের গত রাতের কথাবার্তা শুনে থাকবে।
আমরা যে ঘরে কথা বলেছি এর ধারে কাছেও ছিল না। আমাদের কথা কিভাবে শুনবে। যাই হোক, কিভাবে এ খবর তার কাছে গেল সেটি জানার চেষ্টা করবো। সে গত রাতে কোথায় ছিল সেটিও খুঁজে বের করবো।
“বেশী খোঁজার দরকার নেই চাচা! আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনার মেয়ে সিমনতাশই তাকে সব বলেছে। বললো কাদের খানের মেয়ে আকসী। কারণ, তার সাথে আমি কথা বলে দেখেছি সে সুলতান মাহমুদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। তাছাড়া আপনার বুড়ো গৃহ শিক্ষকের প্রতিও আমার সন্দেহ হয়। লোকটি নিশ্চয়ই নিমকহারাম।
ঘটনার আকস্মিকতায় আবুল মনসুর বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ে গেলেন। তিনি জানেন, তার কন্যা সিমনতাশ সুলতান মাহমুদকে খুবই ভালোবাসে, সে সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে তার পিতা ও সহযোগীদের যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘোর বিরোধী! অবশ্য গৃহ শিক্ষকের ব্যাপারে তার এমন কোন ধারনা ছিল না।
কিন্তু কাদের খান ও কাদের খানের মেয়ে আসী আবুল মনসুরের উপর চাপ সৃষ্টি করল যে, সে যেন তাদের উপস্থিতিতেই তার মেয়ে ও গৃহ শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু আবুল মনসুর তার মেয়েকে প্রাণাধিক ভালোবাসতেন। তিনি মেয়ের বিরুদ্ধে কোন প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। তবুও তাদের উভয়কেই ডেকে পাঠানো হলো। সিমনতাশকে যখন জানানো হলো, তার প্রিয় সঙ্গীত শিল্পী প্রকৃতপক্ষে অন্ধ ছিল না। একথা শুনে সিমনতাশের বিস্ময়ের অবধি রইল না। সে একথা কিছুতেই বিশ্বাস করছিল না।
