“আজই! আজই তোমার লোককে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তোমার লোক কি আজ রওয়ানা হতে পারবে? জানতে চাইলে সিমনতাশ।
“তা পারবে। বললো অন্ধ শিল্পী। কিন্তু আপনাকে ঘোড়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং বলতে হবে পয়গাম কি?”
“মনোযোগ দিয়ে শোন।” বললো সিমন।
‘তোমার লোককে সুলতানের সাথে সাক্ষাত করে বলতে হবে, কাদের খান, তোগা খান ও আবুল মনসুর মিলে শীঘ্রই খোরাসানে আক্রমণ চালাবে এবং আপনাকে গোপনে হত্যা করাবে। সুলতানকে একথাও বলতে হবে, এক শাসক কন্যা তার বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে আপনার সহযোগী হিসেবে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে নেমেছে। তিনি যেন আমার প্রতি বিন্দুমাত্র সংশয় না করেন বরং বিদ্রোহী এই কন্যাকে ইসলামের এক নগণ্য সেবিকা মনে করেন।
সেই সাথে সুলতান যেন আমাকে নিজের সন্তানের মতোই মনে করেন। সুলতানকে বলতে চাই, আমি জানি এরা তিনজন সম্মিলিতভাবেও আপনাকে কাবু করতে পারবে না, সুলতান হয়তো এক আক্রমণেই এদের সবাইকে ধরাশায়ী করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু তাতেও তো প্রচুর রক্তক্ষয় হবে, জীবন হানি ঘটবে।
গযনী, খোরাসান, খাওয়ারিজম, বলখ, বুখারার সেই মায়েরা ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে যুবক সন্তানদের মৃত্যু দেখে আজো পর্যন্ত কাঁদে। সন্তান হারা মায়েরা নিজ সন্তানকে হারিয়ে যেভাবে কান্না করে, তাদের দীর্ঘশ্বাসে আজো আকাশ বাতাস কেঁপে ওঠে…..। সুলতানকে আরো বলতে হবে, আমার পিতা আবুল মনসুর কাদের খান ও তোগা খানকে ভয় করে। সুলতান নিজে থেকে মৈত্রীর পয়গাম পাঠিয়ে আমার বাবার অন্তর থেকে এই আতংক দূর করতে পারেন। আমার এই আহ্বানকে নিজ কন্যার আবেদন মনে করে অগণিত যোদ্ধাকে ভ্রাতৃঘাতি লড়াইয়ে নিহত হওয়া থেকে সুলতান বাঁচাতে পারেন।…
আমার বাবার মৃত্যুতে নিজের এতীম হয়ে যাওয়ার জন্যে আমার কোন দুঃখ নেই। আমার মায়ের বৈধব্যতেও আমি বিন্দুমাত্র পরিতাপ করবো না। আমার শত দুঃখ ও অনুতাপ শুধু সে কারণে যাদের জীবন দেয়ার কথা ছিল কুফরী শক্তির বিরুদ্ধে তারা ভ্রাতৃঘাতি লড়াইয়ে অর্থহীন ভাবে জীবন দিচ্ছে। পক্ষান্তরে তাতে কুফরী শক্তি আরো শক্তিশালী হচ্ছে।”
“তুমি কি আমার সব কথা মনে রাখতে পারবে শিল্পীঃ আমি তোমাকে যেভাবে বললাম তুমি কি সেভাবে গযনীর সুলতানকে বলতে পারবে? বললো সিমনতাশ।
“জী হ্যাঁ। আপনি যেভাবে বলেছেন, আমি ঠিক সেভাবেই বলব এবং সেইভাবেই বার্তা সুলতানের কাছে পৌঁছে যাবে। সিমনতাশকে আশ্বস্ত করতে বললো শিল্পী।
“আমি আস্থা রাখতে পারছি না। তুমি একজন জাত শিল্পী। গঙ্গীত নিয়ে তুমি সারাক্ষণ ডুবে থাকো। তুমি আমার আবেগ ও অনুভূতি অনুভব করতে পারবে কিনা তাই আমি ভাবছি। নিজের ভাবনায় ডুবে থাকা কোন লোক। জগতের অন্য কিছু বুঝে উঠতে পারে না। তোমার পক্ষে বোঝা কঠিন, ক্ষমতার মোহে কিভাবে শাসকরা সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে হানাহানিতে লিপ্ত করে। অথচ এর নেপথ্যে থাকে শুধুই শাসকদের ক্ষমতার লোভ।
‘সিমন শাহজাদী! এখন সাহিত্য করার সময় নয়। অর্থহীন সংশয় ঝেড়ে ফেলে আমাকে বলুন সুলতানের কাছে কি বার্তা পৌঁছাতে হবে। আমাকে এতোটা নির্বোধ মনে করবেন না শাহজাদী! আমি সব কিছুই বুঝি এবং সব কিছুই অন্যকে বোঝাতে পারি।’
“ঠিক আছে শিল্পী। তুমি চলে যাও। সুলতানকে গিয়ে বলো, তিনি যেন আমার আব্বার কাছে মৈত্রীর পয়গাম পাঠান এবং গযনী বাহিনী যেন তার বেচে থাকাকে নিশ্চিত করে।
***
কিছুক্ষণ পর শহর থেকে একটি ঘোড়া বের হলো। ঘোড়াটির লাগাম ধরে আছে একজন দৃষ্টিহীন লোক। লোকটির এক হাতে ঘোড়ার লাগাম অন্য হাতে একটি লাঠি। তার কাঁধে ধনুক ঝুলানো থলের মধ্যে তীরের ফলা। তার ঘোড়াটি পূর্ণ যুদ্ধ সাজে সজ্জিত। লোকটিকে খুব কম লোকেই চেনে। যারা তাকে চিনে ঘোড়ার লাগাম ধরে যুদ্ধ সাজে কাঁধে তীর ধনুক নিয়ে তাকে হাঁটতে দেখে তারা হাসছে।
এই ঘোড়াওয়ালা আর কেউ নয় রাজ দরবারের বেহালাবাদক। সে এই অবস্থায় শহরের প্রধান গেট পেরিয়ে গেল। বেহালা বাদক ঘোড়াকে টেনে নিয়ে গেল কিছুদূর। তারপর শহর থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে সে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হলো। আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে সে হাতের লাঠিটি ফেলে দিয়ে ঘোড়াকে তাড়া করলো। কিন্তু খুব দ্রুত সে ঘোড়াকে দৌড়াতে দিল না। নিজের আত্মবলের উপর নির্ভর করে দৃষ্টিহীন শিল্পী অশ্বারোহন করার দুঃসাহস করলো। অবশ্য ঘোড়াটি তাকে নিয়ে ঠিক পথেই অগ্রসর হতে লাগল।
পনেরো ষোল মাইল পর দেখা দিল ঘনবন। এই বনে সাধারণত শাহী দরবারের লোকেরা শিকার করতে আসে। জঙ্গলকীর্ণ এই জায়গাটি বহু উঁচু নীচু টিলা ও খানা খন্দকে রয়েছে। এলাকাটিতে হরিণের খুব বিচরণ। সাধারণত হরিণ শিকারের জন্যেই এলাকাটি বিখ্যাত।
এখানকার হরিণগুলো বেশ বড় এবং স্বাস্থ্যবান হয়ে থাকে। হঠাৎ করে দৃষ্টিহীন শিল্পীর ঘোড়ার সামনে দিয়ে একটি আহত হরিণ পালাচ্ছিল। হরিণটির গায়ে দুটি তীর বিদ্ধ। শিল্পী আহত হরিণের পিছু ধাওয়া করল। হরিণটি আহত হওয়ায় বেশী দৌড়াতে পারছিল না। শিল্পীর ঘোড়া হরিণের কাছাকাছি পৌঁছতেই তীরদান থেকে একটি তীর নিয়ে ধনুকে ভরে ছুঁড়তেই হরিণটির পেছনের পায়ে নিক্ষিপ্ত তীর আঘাত হানল। এবার আর হরিণটি দৌড়াতে পারল না। একটি লাফ দিয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
