“আব্বু আপনাকে একথা কে বলেছে যে সুলতান মাহমূদ আপনার রাজ্য গিলে ফেলার জন্যে শক্তিশালী হয়েছে? বাবার কানে মুখ লাগিয়ে উচ্চ আওয়াজে বললো সিমনতাশ। এই ধারণা হয়তো আপনাকে তুর্কিস্তানীরা দিয়েছে। তুর্কিরা আপনাকে দাবার ঘুটির মতো ব্যবহার করছে।”
“ও কথা বলো না বেটি! কাদের খানের প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। সে যা বলে ভেবে চিন্তে খোঁজ খবর নিয়েই বলে। লোকটিকে আমার বিশ্বস্ত মনে হয়।
“বিশ্বস্ত তো মনে হবেই। কারণ আপনার কাছে তার বিশ্বস্ততা প্রমাণ করতে সে তার যুবতী কন্যাকে সাথে করে নিয়ে এসেছে। শ্লেষাত্মক ভঙিতে বললেন সিমনের মা। ওই ছুকড়ি যেভাবে সেজেগুজে হাতমুখ নাড়িয়ে আপনার গায়ের সাথে গা মিশিয়ে কথা বলছিল, তার সবই আমি দেখেছি। একটা খেমটা মাথাড়ির আহ্লাদের জন্যে আপনি কি গোটা সেনাবাহিনীকে গযনী বাহিনীর হাতে জবাই করে ফেলতে চান?”
“আব্বু! রক্ষয়ী এই গৃহ যুদ্ধের এ পথে ক্ষতি ছাড়া আর কি পেয়েছি আমরা? চাচা এলিকখান গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পালিয়ে পালিয়ে আতংক নিয়ে রাজ্য শাসন করেছেন। চাচীতে বলেছেন, চাচাকে পরাজিত করার পরও সুলতান মাহমুদ তার রাজ্য দখল করেননি।” বললো সিমনতাশ।
মা ও মেয়ে দুজন আবুল মনসুরের দু’কানে মুখ লাগিয়ে উচ্চ আওয়াজে আবুল মনসুরকে বোঝাতে চেষ্টা করলো, তিনি যেন কিছুতেই কাদের খানের প্ররোচনায় পা না দেন। আবুল মনসুর তাদরেকে যুক্তি দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করলেন; কিন্তু মা ও মেয়ের যুক্তির কাছে আবুল মনসুরের যুক্তি টিকতে পারছিল না।
এক পর্যায়ে আবুল মনসুর আল্লাহর দোহাই দিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! তোমরা আমার কথা শোন। আমি চতুর্দিক থেকে অবরুদ্ধ গেছি। একদিকে সুলতান মাহমূদ আর এক দিকে কাদের খান ও তোগা খান। আমি যদি এদের কথা না শুনি তাহলে এরা আমার ক্ষতি করবে, আর যদি এদের কথা শুনি তাহলে আমাকে সুলতান মাহমূদের শত্রুতা মেনে নিতে হয়।”
“সুলতান মাহমূদের সাথে আপনার শত্রুতার দরকার কি? আপনি তার সাথে দোস্তি করে ফেলুন, তাহলেই তো সমস্যা দূর হয়ে যায়। বললেন সিমনের মা।
“ মাহমূদ আমাদের খান্দানের শত্রু। বংশের চিহ্নিত শত্রুকে আমি দোস্ত বানাতে পারি না।…..হঠাৎ ক্ষেপে উঠলেন আবুল মনসুর। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন “তোমরা জেনে রাখো, আমার খান্দানকে অপদস্থ করার প্রতিশোধ আমি অবশ্যই মাহমূদের কাছ থেকে নেবো।……এখন আর আমার পক্ষে পিছিয়ে আসা সম্ভব নয়। আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আমাদের পরিকল্পনা চূড়ান্ত।”
“এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মধ্যে কি সুলতান মাহমুদকে হত্যার পরিকল্পনাও আছে আব্দু? প্রশ্ন করলো সিমন। ঠিক এ সময় মা মেয়ে একজন অপরজন দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে দিয়ে ক্ষীণ আওয়াজে সিমন তার মাকে বললো
মা, তুমি ভাবভঙ্গি বদল করে আব্দুর কাছ থেকে তাদের পরিকল্পনা জানার চেষ্টা করো।’
‘মেয়ের কথায় তার মা ভাবভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে ফলে বললো- আপনি যদি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে আর সেটি পরিবর্তনের কথা আমরা বলবো না। বরং আপনি পরিকল্পনামতো এগিয়ে যান। আমরা আপনাকে সাহস যোগাবো।’
কি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আপনারা? আমাদেরকেও বলুন। যাতে আমরাও আপনাকে সহযোগিতা করতে পারি।’ মা ও মেয়ের কৌশলে আটকে গেলেন আবুল মনসুর। তিনি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন এবং কাদের খান তোগা খান এবং তার সম্মিলিত বাহিনীর যুদ্ধ পরিকল্পনা এবং যুদ্ধের আগেই সুলতান মাহমূদকে হত্যার চক্রান্তের কথা সবিস্তারে বলে দিলেন।
* * *
পরদিন কাদের খান যখন আবুল মনসুরের রাজমহল থেকে সুলতানের বিরুদ্ধে চক্রান্তের নীল নক্সা শেষে বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন সিমনতাশ দৃষ্টিহীন সঙ্গীত শিল্পীকে তার ঘরে ডেকে এনে বললো- “তুমি বলেছিলে, আমি যদি সুলতানের বিরুদ্ধে সংগঠিত চক্রান্তের ব্যাপারে তোমাকে জানাতে পারি তাহলে তুমি এ খবর নিয়ে গয়নী চলে যেতে পারবে। আমার জিজ্ঞাসা হলো, এ ব্যাপারে কিসের ভিত্তিতে আমি তোমার উপর ভরসা করবো? কে যাবে গযনী খবর নিয়ে?”
“আসলে আমার কাছে এমন কোন ব্যবস্থা নেই যা দিয়ে আমি আপনার কাছে আমার বিশ্বস্ততা প্রমাণ করতে পারবো।’ জবাব দিলো দৃষ্টিহীন শিল্পী। তবে আমি যা বিশ্বাস করি আপনিও যদি তা-ই বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনার উচিত আমার উপর আস্থা রাখা ।
“বার্তা নিয়ে গযনী কে যাবে? সে কথা দয়া করে আপনি জানতে চাইবেন না। আপনি শুধু একটি ঘোড়া সগ্রহ করে দেবেন এবং সেই ঘোড়ার লাগাম আমার হাতে তুলে দেবেন। আমি কিছু দিন আপনার দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবো, কিছু দিন পর আবার আপনার কাছেই ফিরে আসবো।
‘কুরআন শরীফ নিয়ে তাতে চুমু দিয়ে দৃষ্টিহীন শিল্পীর হাতে তুলে দিয়ে সিমনতাশ বললো- “এটি জগতের সবচেয়ে পবিত্র কিতাব কুরআন। এটি হাতে নিয়ে শপথ করো, তুমি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।”
“না শাহজাদী! কসম করা ঠিক হবে না’ বললো শিল্পী। কসম করলেই অন্তর আয়নার মতো পরিষ্কার হয়ে যায় না। দেখা যায়, বেঈমান মোনাফেক লোকেরাই বেশী কসম করে। আপনার দেয়া এই কুরআন শরীফ আমার সাথে থাকবে। আমার এটির দরকার আছে। ফিরে এসে এটি আপপনাকে ফেরত দেবো।……কবে নাগাদ আমার লোক পাঠাতে হবে? শাহজাদী?”
