কাদের খানের কন্যার মুখে সুলতান মাহমূদকে হত্যার কথা শোনে আমার হাত কেঁপে ওঠে এবং হাতের আঙ্গুল ………বেহালার তারে আঘাত হানে। ফলে হঠাৎ করে ঝাঝালো আওয়াজে বেহালাটি কর্কশ হয়ে ওঠে। সেই সাথে আমার কণ্ঠও রুদ্ধ হয়ে যায়।”
সুলতান মাহমূদ খুন হলে পৃথিবীতে কি কেয়ামত ঘটে যাবে? এজন্য তোমার হাত কেঁপে উঠবে কেন? জিজ্ঞেস করলো সিমনতাশ।
সুলতান হোক আর সাধারণ সৈনিকই হোক, কাবোরই অন্যায় খুনের শিকার হওয়া স্বাভাবিক নয় শাহজাদী! আমি জানি, আপনি সুলতান মাহমূদকে প্রাণাধিক শ্রদ্ধা করেন। সুলতান নিহত হলে আপনি যেমন কষ্ট পাবেন, দ্রুপ আমিও কষ্ট পাবো শাহজাদী। কারণ, আপনার মতো আমিও সুলতান মাহমূদকে ইসলামের ঝাণ্ডাবাহী মনে করি।”
“সুলতানের প্রতি তোমার সুধারনা তোমার মধ্যেই থাকুক। এ নিয়ে এখানকার কারো সাথে কথা বলো না। দৃষ্টিহীন শিল্পীকে সতর্ক করে দিল সিমনতাশ।
শাহজাদী! কে তাকে হত্যা করবে, কখন হত্যা করবে? উদ্বিগ্নকণ্ঠে জানতে চাইল শিল্পী।
এ বিষয়টি এখনো আমার জানা সম্ভব হয়নি, জবাব দিল সিমনতাশ। ঠিক আছে। আমি এখন যাই, তুমি বিশ্রাম করো।”
আর একটু সময় থাকো শাহজাদী! তুমি আমাকে রেখে গেলেই আমি আরাম করতে পারবো না। একথা শোনার পর আমার পক্ষে আর ঘুমানো সম্ভব হবে না।
“না ঘুমিয়ে দুশ্চিন্তা করে কি হবে? তার কি কোন উপকার করা তোমার, পক্ষে সম্ভব? বললো সিমনতাশ। তোমার পক্ষে তো আর এই গৃহ যুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব নয়, তুমি তো সুলতানকে খুনীদের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না।”
আপনি যদি আমাকে এ ব্যাপারে তথ্য দিতে পারেন, তাহলে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার আগেই আমি গযনী গিয়ে সুলতানকে আগেভাগেই সতর্ক করবো।”
তুমি আসলেই একজন আবেগী মানুষ। দৃষ্টিহীন শিল্পীর কথায় হেসে ফেললে সিমনতাশ। তুমি তো দেখতে পাও না। এতদূর গয়নীর পথ তুমি কি করে যাবে?”
পড়েমরে এক ভাবে চলে যাবো শাহজাদী। তাও যদি না পারি, তবে এই এলাকায় আমার কিছু শিষ্য আছে তাদের কাউকে পাঠিয়ে দেবো।”
তুমি কি এ ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ? তুমি যা বলছে তা কি তুমি করে দেখাতে পারবে? একটু দৃঢ় কণ্ঠে শিল্পীকে জিজ্ঞেস করলো সিমনতাশ।
আপনি আসল কথাটি আমাকে বলেই দেখুন না শাহজাদী। বাকীটা আমি আপনাকে করে দেখিয়ে দেবো। শাহজাদী! সুলতান মাহমূদ সম্পর্কে আপনার বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার কথা জানার পরই কেবল আমি শ্রদ্ধা ও আস্থার কথা বলেছি।
আমাদের মধ্যে যে সব কথাবার্তা হয়েছে, তা যেন কেউ জানতে না পারে। শিল্পীকে সতর্ক করে দিল সিমনতাশ।
* * *
দৃষ্টিহীন বেহালাবাদকের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করতে করতে সিমন তার মাকে ডাকল, মা! মা! আব্বা কি আমাদের বংশের অপমৃত্যুর ধারাটাকেই তাজা রাখতে চায়?”
কি হয়েছে বেটি?
মা! তুমি কি জানো না, কাশগরের খান এখানে কি জন্যে এসেছে।
খোরাসানের উপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে শত্রুবাহিনী। এজন্য কাদের খান আব্বাকে চাচা এলিকখানের পথেই চালিত করতে এসেছে। অথচ চাচার মৃত্যুর দুঃখটা এখনো দগদৃগে ঘায়ের মতোই আমাদের পীড়া দিচ্ছে। মা! তুমি কি আব্বাকে এ পথ থেকে ফেরাতে পারবে?
মা মেয়ের মধ্যে যখন এসব কথাবার্তা হচ্ছিল ঠিক সেই সময় আবুল মনসুর আরসালান খান দরজা ঠেলে সেই ঘরে প্রবেশ করলেন। মা মেয়ে দু’জনই উঁচু আওয়াজে কথাবার্তা বলছিল। ফলে তা শুনতে পেয়ে আরসালান খান চোখ বড় বড় করে মা মেয়ের দিকে তাকাল।
আরসালান খানকে প্রবেশ করতে দেখে সিমনতাশের মা ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন।
মনে হচ্ছে তোমরা কোন জটিল বিষয়ে কথাবার্তা বলছিলে? স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলো আরসালান খান। সিমনতাশের মা স্বামীর কানে মুখ লাগিয়ে বললেন, “আপনি শুধু আমাদের বাহ্যিক চেহারা দেখতে পাচ্ছেন, আপনি যদি আমাদের মনের ভেতরের দৃশ্য দেখতে পেতেন, তাহলে সেখানে আপনার নজরে পড়তে ইসলামের নিবেদিত প্রাণ সৈন্যদের ক্ষতবিক্ষত লাশ, আপনি দেখতে পেতেন ইসলামের পতাকা কিভাবে রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। আপনি আমাদের চোখের অন্তদৃষ্টি দিয়ে দেখুন, সেখানে আপনি দেখতে পাবেন একই ধর্মের অনুসারী একই আল্লাহর ও একই রসূল সা.-এর কলেমা পাঠকারী মানুষ একে অন্যের রক্তে কিভাবে হোলি খেলছে।
“চুপ করো। রাজকীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে তোমাদের মাথা ঘামানোর দরকার নেই। গর্জে উঠলেন আবুল মনসুর। আমি কি করবো না করবো, এ ব্যাপারে দখলদারী করার দুঃসাহস তোমরা কোত্থেকে পেলে?”
“হ্যাঁ, এখন আমি কিছু বললেই দুঃসাহস হয়ে যায়। আর যখন আমার দেহে তাজা রূপ-যৌবন ছিলো, তখন শত মন্দকথা বললেও তা দুঃসাহস হতো না। ঝাঝালো কণ্ঠে বললেন সিমনতাশের মা। এখন তো আর আমাকে প্রয়োজন নেই। পাঁচ পাঁচটি সুন্দরী যুবতী আপনাকে সব সময় ঘিরে থাকে। এজন্যই আল্লাহ আপনার কান বধির করে দিয়েছেন, চোখেও টুপি এটে দিয়েছে। মাথাটাও ওই ছুকড়িরা দখল করে নিয়েছে। এখন আর আপনার পক্ষে নিজের বুদ্ধিতে কোন কিছু চিন্তা করা সম্ভব হয় না। আপনি কি কখনো ভেবেছেন, যে দুই ছুকড়িকে তুহফা হিসেবে আপনার কাছে পাঠানো হয়েছে, কি উদ্দেশে কেন এদের এখানে পাঠানো হয়েছে?
“সে যাই হোক। তোমাকে আমি যে অধিকার ও সুবিধা দিয়েছি, তা আমি আর কাউকে দেইনি। বললেন আবুল মনসুর। তুমি জানো না বেগম! আমরা সুলতান মাহমূদকে জানতে দিচ্ছি না, আমরা শক্তি সঞ্চয় করছি এবং ধীরে ধীরে একটি সম্মিলিত বাহিনী তৈরীর চেষ্টা করছি। মাহমূদ এটা জানতে পারলে খাওয়ারিজমের মতো আমাদেরকেও গিলে ফেলতে চাইবে। তুমি জানোনা বেগম। সুলতান মাহমূদ এখন কতো বিপুল শক্তির অধিকারী।”
