হঠাৎ দৃষ্টিহীন শিল্পীর বেহালার আওয়াজ বেতাল হয়ে গেলো যেন কেউ বেহালার তারে প্রচণ্ড আঘাত করেছে। বেহালাটি একটু বেসুরো উঁচু আওয়াজ তুলে স্তব্ধ হয়ে গেলো।
“সুলতান মাহমূদ এখন ভয়ংকর একটি শক্তি। সে যেভাবে হিন্দুস্তানের রাজ্যগুলো দখল করেছে এভাবে তুর্কিস্তানের সবগুলো রাজ্যও দখল করে নেবে। তুমি দেখোনি কি ভাবে খাওয়ারিজম দখল করে নিলো। তুমি কি ভুলে গেছো এখন কে খাওয়ারিজম শাসন করছে? বললো আকসী।
“সুলতান মাহমূদের বিখ্যাত সেনাপতি আলতানতাশ এবং তার ডেপুটি আরসালান জায়েব। জানো এরা গযনীর কসাই। তারা যাকেই গযনীর প্রতিপক্ষ মনে করছে তাকেই হত্যা করেছে।”
“তাহলে আমার ও তোমার আব্বা কি করতে চান?” জানতে চাইলে সিমনতাশ।
“তারা খোরাসানের উপর আক্রমণ করতে চান।” বললো আকসী। সুলতান মাহমুদের কাছে খবর পৌঁছার আগেই তারা খোরাসানকে কজা করে নিবেন। কিন্তু সুলতান মাহমূদ যখন জবাবী আক্রমণ করবেন, তখন সেই আক্রমণ কে প্রতিরোধ করবে?”
“কেন? তোমার আব্বা আবুল মনসুর, আমার আব্বা কাদের খান এবং বুখারার শাসক তোগা খান মাহমূদের মোকাবেলা করবেন। তুমি জানো না, সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে তুর্কিস্তানের সকল শাসকদের জোটবদ্ধ করা হচ্ছে।” বললো আকসী।
সিমনতাশ হাসতে লাগল, যেন তার হাসি আর শেষ হবে না। তার হাসি ছিল বিদ্রুপাত্মক! দীর্ঘ হাসির পর সিমনতাশ আকসীর উদ্দেশে বলল, কতিপয় টিকটিকি আর নেংটি ইঁদুর মিলে কি সিংহের মোকাবেলা করতে পারে?”
“তোমার এই সিংহের যদি জীবনই না থাকে, তবে কি মোকাবেলা করতে পারবে না?” রহস্যময় কণ্ঠে বললো আকসী।
“জীবনই থাকবে না মানে?” বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চাইল সিমনতাশ।
তাকে খোরাসান আক্রমণের আগেই হত্যা করা হবে। কথাটি মুখ ফসকে বলে ফেললো আকসী। সাথে সাথে প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্যে আকসী বললো। তোমার বেহালাবাদকের মনে হয় ঘুম পেয়েছে, নয়তো চলে গেছে। আর তো বেহালার সুর শোনা যাচ্ছে না।’
ঠিক তখনই আবার দৃষ্টিহীন বেহালাবাদকের বেহালার মৃদু সুর বাজতে শুরু করল। সেই সাথে বাদকের অনুচ্চ কণ্ঠের হালকা আমেজের কণ্ঠও কানে ভেসে এলো।
সিমন! তোমার বেহালাবাদক হঠাৎ নীরব হয়ে গিয়েছিল কেন? সে কি আমাদের কথা শোনার জন্যে বাজনা বন্ধ করে দিয়েছিল?”
আকসী! একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বেহালাবাদকের ব্যাপারেও তোমার এতো ভয়? বললো সিমনতাশ। এই দৃষ্টিহীন লোকটির বেহালা ছাড়া জগতের আর কোন কিছুর প্রতি কোন আগ্রহ নেই।
আকসী সিমনতাশের হাত ধরে তাকে আরো কিছুটা দূরে নিয়ে গিয়ে বলল, তুমি জানো না সিমন! সুলতান মাহমূদের গোয়েন্দারা সব জায়গায় থাকে। আমার আব্বা তার দরবার থেকে দুই গোয়েন্দাকে পাকড়াও করে জল্লাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। আমার তো মনে হয় তোমার আব্বার দরবারেও গযনীর গোয়েন্দা আছে।”
“তা হয়তো থাকতে পারে। কিন্তু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী একজন জাত বেহালা পাগল কখনো গোয়েন্দা হতে পারে না। কিন্তু তুমি যে বললে সুলতান মাহমূদকে হত্যা করা হবে! কিভাবে কখন তাকে হত্যা করা হবে?”
সম্ভবত আজই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।’ বললো আকসী। সিমন! আমার তো মনে হয় তোমার গৃহ শিক্ষক হয়তো গযনীর গোয়েন্দা। গোয়েন্দা না হলে তুর্কিস্তানের এমন ভয়ংকর শত্রুকে সে ইসলামের পতাকাবাহী বলতে পারতো না। তুমি যদি তোমার আব্বার জীবন বাঁচাতে চাও, তাহলে তোমার গৃহ শিক্ষকের কথা আর বিশ্বাস করো না। এই ধূর্ত বুড়োটা তোমাকে বিভ্রান্ত করছে।”
সুলতান মাহমুদকে হত্যার কথা শুনে সিমনতাশের কণ্ঠণালী যেন শুকিয়ে এলো। সে আর কোন কথাই বলতে পারছিল না। আকসী একের পর এক কথা বলেই যাচ্ছিল এবং আনন্দে ভেঙ্গে পড়ছিল।
দীর্ঘক্ষণ পর অত্যন্ত বিধবস্ত কণ্ঠে সিমনতাশ বললো,
আকসী! আমাদের এখন যাওয়া দরকার। অনেক রাত হয়েছে। তুমি তোমার ঘরে চলে যাও, আমি দৃষ্টিহীন এই লোকটিকে তার ঘরে দিয়ে আসি।”
আরে, তুমি যাবে কেন? কোন চাকরানী কর্মচারীকে বলো ওকে দিয়ে আসুক।
কিন্তু সিমনতাশ আকসীর কথার কোন জবাব না দিয়েই বেহালাবাদকের দিকে অগ্রসর হলো।
***
রাজ প্রাসাদের কাছেই একটি ঘরে থাকতে দেয়া হয়েছিল দৃষ্টিহীন সঙ্গীত শিল্পীকে। সিমনতাশ শিল্পীর হাত ধরে তাকে তার থাকার ঘরে নিয়ে গেল। পথিমধ্যে তাদের মধ্যে কোন কথাই হয়নি। কিন্তু শিল্পীকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে সিমনতাশ বের হতে যাচ্ছে তখন শিল্পী সিমনকে থামতে অনুরোধ করে বললো–
আপনি শাহজাদী! আর আমি আপনার এক নগণ্য সেবক।’ উদাস কণ্ঠে বললো শিল্পী। যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আপনাকে একটি কথা বলতে চাই। আমার এখন এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত।”
কেন? তোমার চলে যেতে হবে কেন? প্রশ্ন করলো সিমনতাশ।
কাদের খানের শাহজাদী আমাকে গযনীর গোয়েন্দা বলে সন্দেহ করেছেন। সিমন শাহজাদী……। রাজত্ব শাসন এসব ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র কোন আগ্রহ নেই। আমার পৃথিবীটাতে শুধু আছে নিকষ অন্ধকার আর আমার এই বেহালার সুর। চোখের অন্ধকারকে আমি বেহালার তারের সাহায্যে আলোকিত করে রাখি।”
না, আকসী তোমাকে গোয়েন্দা বলেনি। হঠাৎ করে তোমার বেহালা একটু ঝাঝালো আওয়াজ করে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তুমিও নীরব হয়ে গিয়েছিলে, তাই সে ভেবেছিল তুমি হয়তো আমাদের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করছিলে।
