তিনি গযনীকে তার রাজ্যের অধীন করার নেশায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এ ধরনের সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। ফলে এলিকখানও তার প্রজাদের সাথে মিথ্যাচার শুরু করে দিয়েছিলেন। তিনি নানা মিথ্যা বলে তার প্রতিবেশী শাসকদের প্রভাবিত করতে লাগলেন, মসজিদের খুতবায় মিথ্যা বলতে লাগলেন। কুরআন শরীফ হাতে নিয়ে মিথ্যা বলতে শুরু করলেন। তিনি তার সেনা ও প্রজাদের বলতে লাগলেন, সুলতান মাহমূদ একজন লুটেরা। সে তার রাজ্য বিস্তারের জন্যেই এসব লুটতরাজ করে। এলিকখান মিথ্যা শপথ করে নিজের লিপ্সা চরিতার্থ করতে গিয়ে ভ্রাতৃঘাতি লড়াইয়ের সূচনা করলেন। ফলে মুসলমানদের ঐক্য ভেঙে গেল। মুসলিম শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ল। এর বিপরীতে কুফরী শক্তি আরো শক্তিশালী হলো।….
আমার শিক্ষক আমাকে এও বলেছেন, সুলতান মাহমূদ যদি তার সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রতি আগ্রহী হতেন, তাহলে প্রতিবেশী ছোট্ট ছোট্ট রাজ্যগুলো দখল করে নেয়ার মতো সামরিক শক্তি তার সব সময়ই ছিল। তুর্কিস্তানের খানদেরকে ভার বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করানো তার জন্যে মোটেও কঠিন ছিল না। কিন্তু এসবে তার দৃষ্টি ছিল না। সুলতান মাহমুদের দৃষ্টি ছিল অন্যত্র। …
মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারতের যে অঞ্চলে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, ভারতের হিন্দু শাসকরা সেইসব এলাকার মুসলমানদের জীবন সংকীর্ণ করে ফেলেছিল এবং মুসলমানদেরকে ইসলাম ও ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। ফলে সেই এলাকার মসজিদগুলো ধ্বংস হয়ে মন্দিরের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। মুসলমানরা হারিয়ে ফেলেছিল আত্মপরিচয়। সুলতান মাহমূদ একবার আদিষ্ট হলেন
“তুমি হিন্দুস্তানের নিবনিবু ইসলামের আলোকে প্রজ্জ্বলিত করো।”
জানো আকসী! সুলতান মাহমূদের একজন আত্যাত্মিক গুরু আছেন। তিনি হলেন শায়খ আবুল হাসান কিরখানী। জ্ঞান প্রজ্ঞা দূরদর্শিতায় তিনি এতোটাই প্রাজ্ঞ যে, ভবিষ্যতে কি হতে যাচ্ছে তা তিনি অনেকটা নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারেন। সাধারণ মানুষরা যা কাল্পনাও করে না, তার দেমাগ অবলীলায় সেইসব বিষয় চিন্তা করে। তিনি সময়ের গতি বুঝেন এবং সমাজের পরিবর্তন ও করণীয় সম্পর্কে আগে থেকেই মানুষকে সর্তক করেন। সেই কিরখানী সুলতান মাহমূদকে বলেছেন–“কুফর এবং স্বজাতির গাদ্দারদেরকে সর্বাগ্রে তোমাকে খতম করতে হবে….।
আমার শিক্ষক বলেছেন, যখন ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তখন তাদের ক্ষতস্থান থেকে ঝড়ে পড়া প্রতি ফোঁটা রক্তে যমীন কেঁপে ওঠে। আসমান কাঁদে এবং আল্লাহর ফেরেশতাগণ কাঁদে।”
“সিমনতাশ! তুমিতো এর আগে কখনো এমন কথা বলেনি। আকসী সিমনতাশের মুখ দু’হাতে চেপে ধরে বললো। এ বয়সে তোমার এসব ভারিক্কি কথাবার্তা শোভা পায় না। তোমার শিক্ষক হয়তো তোমাকে ভুল শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি তো দেখছি এই বয়সেই তোমাকে দরবেশে পরিণত করতে চান। এমন একটি সুন্দর রাতে, এমন সুন্দর সুর লহরীও গানের মধ্যে তুমি কেমন যেন রুক্ষ শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে সিমন!”
“হৃদয় যখন আলোয় আলোকিত হয়ে যায় তখন এমনটিই হয়ে থাকে আকসী! আমাকে তুমি রুচিহীন বলছো। আসলে আমি রুচিহীন নই। আমার রুচির জন্যই তো এই দৃষ্টিহীন শিল্পী রাজ দরবারের রাজকীয় শিল্পীতে পরিণত হয়েছে। আমি হৃদয় আলোকিত করার যে কথাগুলো বলেছি, এসবই আমি পেয়েছি আমার শিক্ষকের পাঠ ও এই দৃষ্টিহীনের সঙ্গীত থেকে। আমি সব সময়ই এই শিল্পীর বেহালার তারে ভিন্ন কিছু অনুভব করি। এই শিল্পীর সঙ্গীত সব সময় আমাকে অপার্থিব পয়গাম শোনায়।”
“সঙ্গীত? সঙ্গীতের মধ্যে আবার তুমি কি পয়গাম আবিস্কার করে সিমন?” জানতে চাইলো আকসী।
“সে কথা আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। তবে তা আমি হৃদয় দিয়ে অনুভব করি।”
দৃষ্টিহীন শিল্পী ধীরলয়ে বেহালা বাজাচ্ছিল এবং কেমন যেন আবেশ জড়ানো সুরে গুণগুণাচ্ছিল। কখনো শিল্পীর কণ্ঠের চেয়ে বেহালার আওয়াজ আবার কখনো বেহালার আওয়াজের চেয়ে শিল্পীর কণ্ঠ উচ্চকিত হচ্ছিল। এক সময় সিমনতাশ ও আকসী পায়চারী করতে করতে দৃষ্টিহীন শিল্পীর কাছে চলে এলো। কিন্তু শিল্পী আপন মনে সঙ্গীত ও বেহালায় মগ্ন ছিল। সে কারো উপস্থিতি মোটেও টের পেলো না।
“তুমি তোমার বাবাকে এ বিষয়টি বোঝাতে পারবে যে, সুলতান মাহমুদ তার সাম্রাজ্য বিস্তারে উৎসাহী নয়? আকসী সিমনতাশকে প্রশ্ন করলো। তোমার আব্বা কি বিশ্বাস করবেন সুলতান মাহমূদের সার্বিক যুদ্ধ উন্মাদনা ইসলামের জন্যে?”
“না, আমি হয়তো তা পারবো না। তাছাড়া আব্বাকে এ ব্যাপারে বোঝানোর প্রয়োজনও আমি বোধ করি না। বললো সিমনতাশ। আব্বা হয়তো সুলতান মাহমূদের বিরোধিতা করেন বটে কিন্তু তিনি হয়তো সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না। তিনি শত্রুতা করেন ঠিকই বিরোধিতাও করেন, সেজন্য সুলতানের কোন সহযোগিতাও করবেন না।”
“আমি তোমাকে একটি গোপন কথা বলতে চাই সিমন” বললো আকসী। তোমার আব্বা কিন্তু সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন।”
“তাই নাকি! তাহলে আমি তাকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখবো।” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো সিমনতাশ।
“মাথা ঠিক করো সিমন! কিছুটা উম্মমাখা কণ্ঠে বললো আকসী। কোন তুর্কি মেয়ের জন্যে এমন আত্মমর্যাদাহীন হওয়া শোভা পায় না। তুমিতো দেখছি মানসিকভাবে গযনীর বাদী হয়ে গেছে।”
