এক দিন দৃষ্টিহীন বেহালাবাদক রাজমহলের কাছে এসে তার বেহালায় সুর তুললো। সিমনতাশ বেহালার সুরে মুগ্ধ হয়ে তাকে রাজমহলে ডেকে পাঠাল। আরসালান দৃষ্টিহীন শিল্পীর কণ্ঠে একটি সঙ্গীত শোনার পরই তাকে রাজ দরবারের শাহী শিল্পী হিসেবে মনোনীত করে ফেললেন।
আবুল মনসুর আরসালান তার কন্যাকে খুবই স্নেহ করতেন এবং তার সঙ্গীত প্রিয়তাকেও তিনি পছন্দ করতেন। এই সুবাদে সিমনতাশ মাঝে মধ্যেই তার পিতার জ্ঞাতসারে রাজদরবারের এই শিল্পীকে তার ঘরে ডেকে পাঠাতো। এ ব্যাপারে সিমনতাশের বাবা আরসালান ছিল খুবই উদার।
“সিমনতাশ! শুনছো, শুনতে পাচ্ছো, কি সুন্দর সুর! সত্যি পাগল করার মতো। উচ্ছাসিত কণ্ঠে সুরের আওয়াজে মুগ্ধ হয়ে সিমনতাশকে বললো আকসী। মনে হচ্ছে, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।
“জানো আকসী! যার সুর ও বেহালার বাজনা তোমাকে পাগল করে তুলছে, সেই শিল্পী দৃষ্টিহীন। বান্ধবী কাদের কন্যাকে বললো আরসালান কন্যা। আল্লাহ তার চোখে আলো দেননি কিন্তু কণ্ঠে দুনিয়ার যাদুকরী আওয়াজ দিয়েছেন। আব্বা অনুমতি দেন না বলে, নয়তো আমি এই শিল্পীকে সুলতান মাহমূদের দরবারে নিয়ে যেতাম।”
“আরে তা কেন? এই শিল্পীকে তুমি সুলতান মাহমূদের দরবারে নিয়ে যেতে চাও কেন? সুলতান মাহমুদের সাথে তোমার কি কাজ?” জিজ্ঞেস করলো আকসী।
“কি আর হবে। এক মুসলমানের সাথে আরেক মুসলমানের যে সম্পর্ক থাকে আমারও তার সাথে একই কাজ। আমি এই দৃষ্টিহীন শিল্পীর সঙ্গীতের মাধ্যমে সুলতান মাহমুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতাম। তুমি কি শোননি, তিনি হিন্দুস্তানের কতো হিন্দু রাজাকে পরাজিত করেছেন এবং কতো মূর্তি ভেঙেছেন?”
“তাতে তোমার খুশী হওয়ার কি আছে? বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো আকসী। সুলতান মাহমূদ তো তোমার ও আমার খান্দানের শত্রু সে যেসব হাতি ঘোড়া ঢাল তলোয়ার হিন্দুস্তান থেকে নিয়ে এসেছে, সেসব তো আমার ও তোমার খান্দানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। মনে হয় তুমি তোমার খান্দানের ইতিহাস জানো না সিমন!”
“আমার বংশের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে আমি পূর্ণ অবগত; আমার অতীত সম্পর্কে অবগত বলেই আমি সুলতান মাহমুদের গুণগ্রাহী” বললো সিমনতাশ। তিনি আমাদের শত্রু নন, বরং আমার ও তোমার পরিবার তার শত্রু। সুলতান মাহমূদ ইসলামের পতাকাবাহী। তিনি একজন সফল মূর্তি সংহারী। তুমি হয়তো জানো না তিনি হিন্দুস্তানের কতোজন হিন্দু রাজা মহারাজাকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। কিন্তু তিনি সেখানে রাজত্ব করার জন্যে থেকে যাননি।”
“তার এসব যুদ্ধ ও অভিযানততা হিন্দুস্তানের ধন সম্পদ লুট করার জন্যে সিমন! ধন-সম্পদ হাতিয়ে নিতেই সে বারবার হিন্দুস্তানে হানা দেয়। এবার তো সে হাতি বোঝাই করে সোনা দানা নিয়ে এসেছে। সে অগণিত সোনাদানা সাধারণ মানুষ ও তার সৈন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে। আর এখন সে আমাদেরকে তার গোলামে পরিণত করার তৎপরতা চালাচ্ছে।
“আরে! আমিতো তার বন্দী হতেও প্রস্তুত। উচ্ছাসিত কণ্ঠে বললো সিমনতাশ।
“তোমার মধ্যে কোন আত্মমর্যাদাবোধ নেই সিমন! তিরস্কারভরা কণ্ঠে বললো আকসী। তুমি না এলিক খানের ভাতিজী! যে এলিক খান আজীবন সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। তোমার আব্বা কি এ ব্যাপারে তোমাকে কিছু বলেননি?”
“আমি সবই জানি আকসী। আমার চাচা এলিকখান সুলতান মাহমুদের সাথে প্রতিটি যুদ্ধেই পরাজিত হয়েছেন এবং পালিয়ে জীবন রক্ষা করেছেন। এ ব্যাপারে আমার আব্বার আর কি বলার আছে? আমার আব্বাতো বধির। তিনি তাই শুনতে পান যা তাকে শোনানো হয়।
“তুমি তোমার বাবাকে নির্বোধ মনে করো? বিস্ময়মাখা কণ্ঠে জানতে চাইলো আকসী। মনে হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তোমার মধ্যে শুধু রূপ সৌন্দর্যই দিয়েছেন, আত্মমর্যাবোধ ও জ্ঞানগরিমা দেননি। গযনী ও খোরাসানের মধ্যে তোমার মতো সুন্দরী দ্বিতীয়টি হয়তো নেই। কিন্তু তোমাকে রূপের রানী মনে হলেও জ্ঞান বুদ্ধিতে একেবারে শূন্য মনে হয়।
“আমাকে নির্বোধ বলতেই পারো কিন্তু আমার গৃহ শিক্ষককে তুমি কিছুতেই নির্বোধ বলতে পারবে না। আমার শিক্ষক একজন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সাগর। তিনি আমাকে আমার খান্দানের ইতিহাস বলেছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, বাবার মধ্যে দূরদর্শীতার অভাব আছে। আমি বলেছিলাম এটাতো তার অক্ষমতা যে তিনি শুনতে পান না। আমার শিক্ষক বললেন, শ্রবণশক্তি দুর্বল হওয়াটাই আসল কথা নয়। মূলত যারাই ক্ষমতার মসনদে বসে তারাই বধির হয়ে যায়। তারা মনে করে সবই তারা শোনে; কিন্তু তখন তাদরেকে রূঢ় বাস্তব ঘটনা ও কঠিন সত্য কথাগুলো শোনানো হয় না।….
ক্ষমতাসীনরা মনে করে তারা সবই দেখছেন কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে দেয়া হয়। তারা মনে করে তারাই সঠিক চিন্তা করছে, কিন্তু সঠিক বিষয়টি তারা ভাবার অবকাশ পায় না। তাদের মেধা মননে ভিন্ন চিন্তা চাপিয়ে দেয়া হয়।….
আকসী! আমার শিক্ষক একদিন আমাকে বললেন, তোমার চাচা এলিকখান বধির ছিলেন না তিনি ছিলেন যথেষ্ট বিবেক ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি। কিন্তু গযনী জয় করার ভূত তার মাথায় চেপে বসেছিল এবং সুলতান মাহমূদকে পরাজিত করে বন্দী করার খায়েশ তাকে পেয়ে বসেছিল। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি যে কানে শোনার কথা ছিল তার কানে সেই বাস্তব কথা আর কখনো প্রবেশ করেনি। যে বাস্তব দৃশ্য তার দেখার কথাছিল তিনি তা দেখতে পাননি। যে বাস্তবতা তার বোধ-বুদ্ধিতে অনুভব করার কথা ছিল তা তিনি অনুভব করতে পারেননি।
