যে আল্লাহ আজ আপনাকে ক্ষমতা ও মর্যাদা দান করেছেন, তিনি এই ক্ষমতা আপনার কাছ থেকে ছিনিয়েও নিতে পারেন। তোষামোদীদের প্রশংসা বাণীর চেয়ে মজলুম ও অত্যাচারিতের দীর্ঘশ্বাস আল্লাহর কাছে অনেক বেশী দ্রুত পৌঁছে। হিন্দুস্তানের বিজয় আপনার প্রজাদের সংখ্যা বিপুলভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্যও অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনটি যেন না হয় সোনা-রূপা আপনাকে একদেশদর্শী করে দেয়। যে সম্পদ আপনার কব্জায় এসেছে, তা আল্লাহর অনুগ্রহ ও আমানত। এ সম্পদ আপনার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র থেকে আপনাকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং বহি:শত্রুদের প্রতি আপনার কড়া দৃষ্টি রাখতে হবে।….
সাম্প্রতিক বিজয়ের জন্যে আমি আপনাকে মোবারকবাদ জানাচ্ছি। আমি অনুভব করছি হিন্দুস্তানের বিজিত এলাকাগুলোয় আযানের ধ্বনি মুখরিত হয়। আপনাকে আবারো সেই সব জায়গায় যেতে হবে। যেসব স্থানে কালসাপের মাথা এখনো থেতলে দেয়া সম্ভব হয়নি। আমি ভবিষ্যতের একটা চিত্র পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি, যদি হিন্দুদের মাথা গুঁড়িয়ে দেয়া না যায় তাহলে কুচক্রী এই হিন্দুজাতি ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত অব্যাহত রাখবে।…. ঠিক আছে এখন আপনি গযনী ফিরে যান, গিয়ে আগামী যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি শুরু করে দিন।”
“সম্মানিত মুর্শিদ! আপনি যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, এই দিক নির্দেশনা আমার খুব বেশী প্রয়োজন ছিল। কুফরী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেই আমার জীবন কেটে যাবে এই বাস্তবতা আমি হৃদয়ে গেথে নিয়েছি, এ বিষয়ে আমার মধ্যে কোন সংশয় সন্দেহ নেই। আমার দুঃখ ও দুশ্চিন্তার কারণ হলো, স্বজাতির লোকেরা আমার সবচেয়ে ভয়ানক শত্রু। স্বজাতির প্রতিবেশী শাসকরা আমাকে ধ্বংস করার জন্যে এক জোট হয়েছে। গৃহযুদ্ধে আমাকে বারবার প্রচুর রক্ত ঝরাতে হচ্ছে।”
“একটা পার্থক্য আপনাকে বুঝতে হবে সুলতান! বললেন আবুল হাসান কিরখানী। এক পক্ষ হলো আপনার সালতানাতের শত্রু। এই শত্রুপক্ষ আপনার কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে চায়। আর এক পক্ষ হলো এমন শত্রু যারা ইসলামকে দুর্বল করে দিতে তৎপর। এদেরকেই বলা হয় গাদ্দার। আপনাকে ব্যক্তিগত শত্রু এবং ইসলামের শত্রুদের পার্থক্য বুঝতে হবে। আপনার ক্ষমতা ও মর্যাদার বিরোধিতার কারণে কাউকে জীবিত রাখবেন না। আপনার স্ত্রী কন্যা পুত্র আপন ভাইও যদি ইসলামের ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত হয় তবে তাকে বেচে থাকার সুযোগ দেবেন না।
কাশগরের শাসক কাদের খান, তার প্রতিবেশী শাসক আবুল মনসুর আরসালান খান এবং তোগা খান আপনার সালতানাত দখল করার জন্যে পায়তারা করছে। ওরা আবারও গৃহযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরা ইসলামী খেলাফতকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। খৃষ্টানরা এদেরকে সহযোগিতা করছে। এরা যদি মাথা তুলে এদের মাথা গুঁড়িয়ে দিন। তবে গুঁড়িয়ে দেয়ার আগে ওদের এটা বোঝার সুযোগ দেবেন যে তারা ভুলপথে ছিলো।”
* * *
গযনী সালতানাতের মোটামুটি ইতিবৃত্ত হলো, পূর্ব তুর্কিস্তানের শাসক এলিকখান ছোট ছোট রাজ্যগুলোর শাসকদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে সুলতান মাহমূদের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে বিপর্যস্ত করার অব্যাহত চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। (এই সিরিজের প্রথমও দ্বিতীয় খণ্ডে এদের বিরুদ্ধে সুলতান মাহমূদের একাধিক যুদ্ধের কথা বিবৃত হয়েছে।)
ইতোমধ্যে এলিক খানের মৃত্যু হয়েছে। তার স্থলে ক্ষমতাসীন হয়েছে তার ভাই আবুল মনসুর আরসালান খান।
আরসালানকে আল আসমও বলা হতো। আসম অর্থ বধির। সে কানে মোটেও শুনতো না। এজন্য তাকে আসম নামে ডাকা হতো। কাশগরের শাসক ছিল কাদের খান। তার প্রতিবেশী রাজ্যের শাসক ছিল তোগাখান। এগুলো ছিল একেকটি ছোট্ট ছোট্ট সামন্ত রাজ্য। এরা সবাই ছিল বাগদাদের অধীন। তখন বাগদাদের কেন্দ্রীয় খেলাফতের গুরুত্ব অনেকাংশেই কমে গেছে। বাগদাদের খলীফা কাদের বিল্লাহ আব্বাসী নিজেও ছিলেন একজন ক্ষমতালোভী। কাদের বিল্লাহ নিজেই পর্দার অন্তরালে সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে এসব সামন্ত শাসকদেরকে গৃহযুদ্ধে ইন্ধন যোগাতেন।
***
সুলতান মাহমূদ মথুরা ও কনৌজ বিজয় শেষে যখন গযনীতে ফিরে এলেন তখন কাদের খান আরসালানের রাজমহলে এসে উপস্থিত হলো। সাথে কাদের খানের তরুণী মেয়ে আকসীও এলো। রাতের বেলায় যখন কাদের খান ও আরসালান খাছ কামরায় একান্ত আলোচনায় মগ্ন তখন কাদের খানের যুবতী কন্যা আকসী আরসালানের ষোড়শী কন্যা সিমনতাশ রাজ মহল সংলগ্ন বাগানে পায়চারী করছিল।
সুনসান নীরব নিস্তব্ধ রাত। ঝিঁঝি পোকার গুঞ্জন ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই। এই নির্জনতার মধ্যে মৃদুলয়ের একটি মনকাড়া সুর বাতাসে ভেসে আসছিল। সেই মৃদু আওয়াজ ছিল একটি বেহালার সুরলহরী। সেই মনকাড়া সুরের সাথে কারো গুনগুনানীর শব্দও শোনা যাচ্ছিল। বেহালার মৃদু আওয়াজ ও গুনগুনানীর শব্দের মধ্যে এক ছিল মায়াবী আকর্ষণ। যে কাউকে এই বেহালার সুর মুগ্ধ বিমোহিত ও তন্ময় করে দিতে সক্ষম ছিল।
মন মাতানো এই সুরের স্রষ্টা ছিল একজন দৃষ্টিশক্তিহীন বেহালাবাদক। সিমনতাশই এই বেহালাবাদকে বাগানের এক কোণে বসিয়ে রেখেছিল এবং আকসীকে নিয়ে আনমনে বাগানে পায়চারী করছিল। দৃষ্টিহীন বেহালা বাদক প্রায় বছর দেড়েক থেকে আরসালানের রাজ দরবারে অবস্থান করছে। আরসালানের যুবতী কন্যা সিমনতাশ সঙ্গীত খুবই পছন্দ করতো। এক কথায় সে ছিল সঙ্গীতপ্রিয়।
