ফারিতা লিখেছেন, যে পাথরটি সুলতান মাহমূদ ভারত থেকে নিয়ে এসেছিলেন, এটির বৈশিষ্ট্য ছিল, এই পাথর চুবিয়ে ক্ষত স্থানে পানি দিলে ক্ষত খুব দ্রুত শুকিয়ে যেতো।
* * *
এই অভিযান থেকে গযনী ফেরার পর সুলতান মাহমূদ একটি ছোট্ট কাফেলা নিয়ে তার শায়খ ও মুর্শিদ তথা আধ্যাত্মিক গুরু ও শায়খ আবুল হাসান কিরখানীর উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। মুর্শিদের দরবারে পৌঁছার আগেই তিনি কাফেলার সঙ্গীদের থামিয়ে দিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। তখন তিনি ছিলেন খুবই সাধারণ পোশাক পরিহিত। এই পোশাকে অপরিচিতদের পক্ষে সুলতান মাহমূদকে চেনা সম্ভব ছিল না। শায়খের আস্তানার অনেক দূরেই তার নিরাপত্তা রক্ষীদের রেখে একাকী পায়ে হেঁটে মুর্শিদের দরবারে হাজির হলেন সুলতান। শায়খ ও মুর্শিদের দরবারে তিনি কখনো রাজকীয় বেশভূষা নিয়ে উপস্থিত হননি। মুর্শিদের দরবারে গিয়ে তিনি তার হাতে চুমু দিয়ে মাথা নীচু করে বসে পড়লেন।
‘সেই সময়টি স্মরণ করুন সুলতান! এককার যখন আপনি পরাজিত হয়ে হিন্দুস্তান থেকে ফিরে এসেছিলেন। সুলতানকে দেখে প্রথমেই বললেন শায়খ আবুল হাসান কিরখানী। তিনি আরো বললেন, তখন আপনি ছিলেন বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত। আপনার অগণিত সৈন্য নিহত হয়েছিল। আপনার সেনাবাহিনী পর্যদস্ত হয়ে পড়েছিল। ভেঙে গিয়েছিল আপনার মনোবল। আপনাদের বিপন্ন মনে করে আপনার শত্রুরা আপনার উপর শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তখন আমি আশংকা করেছিলাম, আপনি না আবার মনোবল হারিয়ে শত্রুদের মোকাবেলায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া থেকে বিরত থাকেন।…….
জয় পরাজয় আল্লাহর হাতে সুলতান! যে পরাজয় স্বীকার করে নেয় পরাজয় তার ভাগ্যলিপি হয়ে ওঠে। আর সেই পরাজয় স্বীকার করে নেয় যার ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে। শহীদদের মিশনকে এগিয়ে নেয়া ছাড়া আপনি তাদের রক্তের ঋণ কিছুতেই শোধ করতে পারবেন না।…..
শহীদদের ত্যাগকে সম্মান করা আপনার কর্তব্য। যারা বুক টান করে মৃত্যুকে পরওয়া না করে শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত করে হিন্দুস্তানে গিয়েছিল, কিন্তু তারা আর গযনীতে ফিরে আসেনি, তাদের আত্মত্যাগ ভুলে গেলে এর শাস্তি দুনিয়াতেই আপনাকে ভুগতে হবে। কারণ, এরা আপনার নির্দেশে যায়নি, গিয়েছিল আল্লাহর পয়গাম ছড়িয়ে দিতে, আল্লাহর বিধানকে বুলন্দ করতে।”
“শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে আমি তাদের স্মারক হিসেবে গযনীতে একটি জামে মসজিদ এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্যে নির্মাণ কাজ শুরু করে দিতে নির্দেশ দিয়ে দিয়েছি। বিনীত কণ্ঠে মুর্শিদকে জানালেন সুলতান। তাদের স্মৃতিস্বরূপ আমি একটি স্মৃতি মিনার নির্মাণ করাচ্ছি। শহীদদের পরিবার বর্গের জন্য সরকারী ভাতার ব্যবস্থা করেছি এবং তাদের সন্তানদের বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা নিয়েছি।”
“এসবই ভালো কাজ। তবে আমার ক’টি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন সুলতান।’ বললেন শায়খ কিরখানী। তারপর কিরখানী বললেন,
বিজয়ের পর গযনীর লোকেরা আপনাকে এভাবে অভ্যর্থনা দিয়েছে, যাতে মনে হয় আপনি যেন আসমান ছুঁয়ে নীচে নেমে এসেছেন। আমি শুনেছি আপনার পথে নারীরাও ফুল ছিটিয়েছে। কবিরা আপনার প্রশংসায় কবিতা রচনা করেছে, শিল্পীরা আপনার প্রশংসায় সঙ্গীত গেয়েছে। রাজ দরবারে অসংখ্য লোক এসে আপনার হাতে চুমু দিয়ে আপনাকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বিজয়ী আখ্যা দিয়েছে।…….
এ মুহূর্তে আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন না, যেগুলো আপনার দৃষ্টিতে আজ ফুলের মতো কোমল মনে হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে সেগুলো ফুল নয় বরং কাঁটা। কবি শিল্পী আর তোষামোদকারীরা আপনার যে প্রশংসা করছে আসলে সেগুলো প্রশংসা নয় মধুতে মেশানো বিষ। বিষ মধু বলে আপনাকে পান করানো হচ্ছে।……
আল্লাহ না করুন, আজ যদি কোন কারণে আপনি ক্ষমতাচ্যুত হন তাহলে এই প্রশংসাকারীরা সমস্বরে কোরাশ তুলবে যে, প্রকৃতপক্ষে মাহমূদ এমনটিরই উপযুক্ত। সুলতানী করার মতো কোন যোগ্যতাই তার মধ্যে ছিল না। তখন এরা সেই লোকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবে ক্ষমতার মসনদে যাকে তারা দেখবে….।
তোষামোদ ও প্রশংসা ক্ষমতা ও মসনদের ঘুণ পোকার মতো। দৃশ্যত শক্রর চেয়ে লুকিয়ে থাকা এই ঘুণ অত্যন্ত ভয়ংকর। খুব সন্তর্পণে ক্ষমতার তখৃতকে ভেতর থেকে ফোকলা করতে থাকে। আপনি যে রাতে বিজয়ের আনন্দ উৎসব করতে গযনীর লাখো অভিজাত শ্রেণীর লোককে দাওয়াত দিয়ে ভোজনের আয়োজন করেছিলেন, ভুলে গিয়েছিলেন সেই রাতে গযনীতেই বহু লোক দুঃখে- শোকে শুকনো রুটি খেয়ে অর্ধাহারে এক বুক কষ্ট নিয়ে ঘুমিয়েছে। এমনও হয়তো অনেক লোক ছিল, সেই রাতে যাদের পেটে এক টুকরো রুটিও যায়নি।…..
তোষামোদকারীরা হয়তো আপনাকে সেকথাই বুঝিয়েছে, গযনী সালতানাতের লোকেরা খুবই সুখে আছে এবং সবাই আপনার প্রশংসা করছে। মাহমূদ! নিজের বিবেকের আয়নায় নিজের চেহারা দেখবেন এবং জনতার চেহারা তোমোদীদের চোখে নয় নিজের চোখে দেখবেন। একাকী আপনাকে ভাবতে হবে, আপনি গযনীর শাসক নন। ব্যক্তিগতভাবে আপনিও গয়নীর অন্য দশটি মানুষের মতোই একজন মানুষ। অতএব অন্য দশজনের যে অবস্থা আপনাকেও তেমনই থাকতে হবে। নাগরিকদের চোখই হতে হবে আপনার চোখ।
শাসন, রাজত্ব আর কূটচাল পাশাপাশি থাকে মাহমূদ। ক্ষমতা লোভী তোষামোদী লোকেরা শাসকের সাথে প্রতারণা করে আর শাসক জনগণের সাথে প্রতারণা করে। একটা জিনিস আপনাকে বুঝতে হবে, অপরাধ ও সৎকাজ হাত ধরাধরি করে চলে। যে শাসক বা সুলতান তার চোখে তোষামোদীদের টুপি পরিয়ে রাখে এবং কানে প্রশংসাবাণীর সীসা ঢেলে দেয়, সে আল্লাহর কাছে অপরাধী বিবেচিত হয়।….
