সুবক্তগীনের নিজের রাজ্যেই বিদ্রোহ দেখা দিল। আমীর বু আলী হাসান খোরাসানের কিছু অংশ দখল করে নিল। সে বিদ্রোহী ফায়েককে আশ্রয় দিল। এ সুলতান সমঝোতা চুক্তির পয়গাম পাঠালেন কিন্তু আলী হাসান কোন পাত্তাই দিল না। ওদের শিকড় উপড়ে ফেলা ছাড়া সুলতানের আর বিকল্প কোন পথ রইল না। ৯ বিদ্রোহী মুসলিম ভাইদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা ছাড়া তার আর উপায় রইল না। ৪ এদিকে বু আলী হাসান ও অন্যদের পর্দার আড়ালে থেকে খৃস্টানরা সার্বিক সহযোগিতা ও উস্কানী দিচ্ছিল। এরা বিধর্মীদের উস্কানিতে কমণ্ডজ্ঞান হারিয়ে আত্মগর্ভে বুঁদ হয়ে পড়েছিল। শেষতক সুলতান সৈন্য নিয়ে বলখ পৌঁছলেন, এদিকে নূহও তার সৈন্য নিয়ে সুলতানের সহযোগিতায় এগিয়ে এলেন।
ফায়েক ও আলী হাসান জ্বরজানের শাসক ফখরুদ্দৌলাকে দলে ভিড়িয়ে নিল। ফখরুদ্দৌলার দারা নামের এক সেনাপতি ছিল। তার বীরত্বের কীর্তিগাথা দূর পর্যন্ত মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হতো।
এসব রাজা তাদের বাহিনী নিয়ে হেরাত পর্যন্ত অগ্রসর হল। সুলতান সুবক্তগীন ও তার বাহিনী হেরাতের একটি ময়দানে উপনীত হলেন। তার কাছে যুদ্ধের জন্য এ স্থানটি ছিল খুবই যুৎসই। এই শক্ত প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় সুলতানের সহযোগী একমাত্র বাদশাহ নূহ। সে কিশোর ও অনভিজ্ঞ হওয়ার কারণে আমীর ফায়েক তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল এই আশায় যে, সে ভীত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দেবে। সুলতানের বড় শক্তি শাহজাদা মাহমূদ এখন কৈশোর পেরিয়ে এক টগবগে যুবক। ওদিকে সারা হিন্দুস্থানের রাজা-মহারাজারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম আঘাত হানতে প্রস্তুত। এদিকে নিজ ভূমিতে ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে মুসলিম সেনারা পরস্পরের মুখোমুখি। একজন অপর জনের রক্তপিপাসু। এমন কঠিন সময়ে সুলতান সুবক্তগীন যখন যুবক মাহমূদ আর তরুণ নূহের দিকে তাকালেন তখন তার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল।
“আব্বা আপনার চোখে পানি!” বিস্ময়মাখা প্রশ্ন মাহমূদের।
“ইসলামের কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ঝরানো ছাড়া আর কি করার আছে মাহমূদ!” ধরা গলায় বললেন সুলতান সুবক্তগীন।
“মুসলমানরা যখন ঐক্যবদ্ধ ছিল ইউরোপ-কুফরীস্তানেও তারা ইসলামের বিজয় কেতন উড়াতে সক্ষম হয়েছিল। মুসলমানদের অনৈক্যের কারণে ইউরোপ থেকে আজ ইসলাম নির্বাসিত। হিন্দুস্থানেও ইসলামের ঝাণ্ডা আজ ভূলুণ্ঠিত। বহু মুসলিম দেশ খৃস্টানরা দখল করে নিয়েছে, আরো দখলের চেষ্টা করছে। অপরদিকে হিন্দুরাও আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে। তোমাদের দেখে আমার চোখে পানি এসে গেছে এই ভেবে যে, আমরা তো পরস্পর লড়াই করে একদিন শেষ হয়ে যাবো, সন্তানদের জন্যে কি রেখে যাচ্ছি। আমরা তো তোমাদের জন্য পতিত এক ইসলামী সালতানাত রেখে যাচ্ছি। ক্ষমতার লোভ, গৃহবিবাদ আর ঈমান কেনাবেচার বাজার আজ সরগরম। ঐ সব ঈমান বিক্রেতা, ক্ষমতালিলুর সন্তানেরা ক্ষমতার লোভে ইসলামের শত্রুদের হাতে নিজের ঈমান-ইজ্জত বিক্রি করতে মোটেও দ্বিধা করবে না। কুফরীস্তানের মূর্তি ভাঙা ছিল আমার দায়িত্ব। বাতিল বিরোধী সংগ্রামের দায়িত্ব তোমাদের হাতে সোপর্দ করতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু আমার মুসলিম ভাইয়েরা–আমরা যারা একই খোদা, একই কাবা, একই কুরআনের আদর্শে চলি–একই রাসূল (স.)-এর আনুগত্য করি তারাই আজ আল্লাহর পথ ভুলে বসেছি। বাবা! মুসলিম মিল্লাতের ভবিষ্যত অন্ধকার। ক্ষমতা ও মসনদের লোভ আর মদ ও মেয়েতে ডুবে গিয়ে ওরা মুসলিম জাহানকে টুকরো টুকরো করছে। তোমরা দেখতে পাচ্ছ, প্রত্যেক মুসলিম রাজ্যে অবিশ্বাস, বিবাদ, প্রতারণা কিভাবে বিস্তার ঘটেছে। বর্তমান মুসলমানরা দৃশ্যত ঐক্যবদ্ধ হলেও এদের মনে প্রতারণার বীজ সুপ্ত রয়েছে। একে অন্যের প্রতি এরা ভীষণ অসহিষ্ণু। এরা মতভিন্নতাকেও মনে করে শত্রুতা। এরা শুভাকাঙ্ক্ষীকেও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। আমাদের উঁচু মহল থেকে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নির্বাসিত হয়ে গেছে। খেলাফত আছে নামে মাত্র।” দীর্ঘক্ষণ কথা বলে সুলতান নীরব হয়ে গেলেন। এরপর মাথা উঁচু করে বললেন, “মাহমূদ ও নূহ! তোমাদের বাহিনীকে আমার সামনে এনে দাঁড় করাও।”
মাহমূদ ও নূহের সৈন্যরা সুবক্তগীনের সামনে এসে সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছে। সুবক্তগীন নিজের ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে আছেন। সুবক্তগীন যেখানে দাঁড়ানো সে জায়গাটি একটি টিলার মতো। সেখান থেকে আমীর ফায়েক, আলী হাসান ও ফখরুদ্দৌলার বাহিনীর তবু দৃশ্যমান। সুবক্তগীন চোখ বুলালেন নূহ ও মাহমূদের বাহিনীর প্রতি। অনুক্ত যন্ত্রণায় তার বুক ভারী হয়ে উঠল। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে সৈনিকদের প্রতি উচ্চ আওয়াজে বলতে লাগলেন–
“আল্লাহর সিপাহীগণ! আমি তোমাদের মত একই ধর্মের অনুসারী, একই বেশ-ভূষায় সজ্জিত আরেকটি বাহিনী দেখতে পাচ্ছি। তারা আমাদের প্রতিপক্ষ। তোমরা আর ওরা যদি এক হয়ে যাও, পরস্পর শত্রুতা পরিহার করে ঐক্য গড়ে তোল তাহলে ইসলামের ঝাণ্ডা আবার তারেক বিন যিয়াদ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজিত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আজ তোমাদের ও ওদের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। শত্রু ও চক্রান্তকারীরা আমাদেরকে পরস্পর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের জন্যে জীবনত্যাগী আর ওরা সিংহাসন ও ক্ষমতার পূজারী। তারা দীন, ঈমান, ইজ্জত ও হুরমতকে নিলাম করে দিয়েছে। হিন্দুস্তানের পৌত্তলিকরা আমাদের উপর দু’বার হামলা করেছে, তোমরা ওদের তুলনায় অনেক কম লোকবল নিয়েও তাদের পরাজিত করেছে। বলতে পারো, কোন শক্তিবলে তোমরা এতো বিশাল বাহিনীকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছিলে? সেই শক্তি হলো তোমরা আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর নাম বুলন্দ করার লক্ষ্যে মরণপণ যুদ্ধ করেছে। আর তারা ক্ষমতা, মসনদ ও তাগুতের জন্যে জীবনবাজি যুদ্ধ করেছে। আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে তোমরা শাহাদাঁতের আশায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে, তাই বিজয় তোমাদের পদচুম্বন করেছিলো।
