বাস্তবেও তিনি এই অঢেল সম্পদ গযনীর অধিবাসীদের জাতীয় জীবন উন্নয়নে ব্যয় করেছিলেন। এই যুদ্ধের পর তিনি মর্মর পাথরের একটি বিশাল মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন। এই মসজিদের সাথে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি মসজিদের নাম রেখেছিলেন “আসমানী মহল”।
মসজিদটি রূপ-সৌন্দর্যে ছিল অনুপম। এই মসজিদ নির্মানে তিনি বহু জায়গার বিখ্যাত সব স্থাপত্যবিদ এনে জড়ো করেছিলেন। মসজিদের দেয়াল এবং ছাদে যে সব নক্সা উৎকীর্ণ করিয়েছিলেন সেগুলোতে স্বর্ণ ও রৌপ্য গলিয়ে কারুকাজকে আরো মনোমুগ্ধকর করা হয়েছিল। মিনারগুলোর উপরিভাগে দেয়া হয়েছিল স্বর্ণের প্রলেপ।
বিশ্ববিদ্যালয়টিকে তিনি প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সেকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে রূপান্তরিত করেছিলেন। মসজিদের ভেতরে আকর্ষণীয় কারুকার্যময় গালিচা বিছানো হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য গ্রন্থরাজী সংগ্রহ করে সেগুলোকে স্থানীয় ভাষায় ভাষান্তরিত করিয়েছিলেন। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার একটি অনন্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল সুলতান মাহমূদের বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বের নানা জায়গা থেকে তিনি বিশেষজ্ঞ জ্ঞানীদের এখানে জমায়েত করেছিলেন এবং তাদের জন্যে খুবই উচ্চ মানের সম্মানী ভাতা বরাদ্দ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও নিয়মিত বৃত্তি দিতেন।
বিভিন্ন যুদ্ধে শাহাদত বরণকারীদের সন্তানদেরকে সেখানে বিনা খরচে শিক্ষা দেয়া হতো এবং তাদের ও পরিবারের সার্বিক ব্যয় সরকারী ভাণ্ডার থেকে নির্বাহ করা হতো।
ঐতিহাসিক আবুল কাসিম ফারিতা এবং আল বিরুনী লিখেছেন, জামে মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় মথুরা ও কনৌজ বিজয়ের স্মারক হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল। অধিকাংশ ঐতিহাসিক সুলতান মাহমূদের সোমনাথ বিজয়কে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু সুলতান মাহমূদের দৃষ্টিতে মথুরা বিজয় ছিল সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মথুরা ছিল হিন্দুদেবতা হরিকৃষ্ণের জন্মভূমি। হিন্দুদের কাছে মথুরা ছিল মুসলমানদের মক্কা মদীনার মতোই পবিত্র স্থান।
এই অভিযানে সুলতান মাহমুদ যে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন করেছিলেন এর মধ্যে স্বর্ণমুদ্রা ছিল ত্রিশ লাখ। আর মণিমুক্তা হীরা জহরত ও স্বর্ণের টুকরোর কোন হিসাব ছিল না। পঞ্চান্ন হাজার হিন্দু গ্রেফতার হয়েছিল এবং সাড়ে তিনশ হাতি গযনী বাহিনীর হাতে এসেছিল। ঘোড়া ও তরবারীর তো কোন হিসাবই ছিল না।
ঐতিহাসিক ফারিতা লিখেছেন, বিপুল ধন-সম্পদ ছাড়াও এই অভিযানে সুলতান মাহমূদ হিন্দুস্তান থেকে তিনটি বিস্ময়কর জিনিস এনেছিলেন। এর মধ্যে একটি ছিল ময়নার মতো পাখি, একটি হাতি এবং একটি পাথর।
মথুরা থেকে কনৌজ যাওয়ার পথে বিস্ময়কর এই হাতিটি তার হাতে এসেছিল। যমুনার ডান তীরে আসাঈ নামক একটি ছোট রাজ্য ছিল। এই রাজ্যের শাসক ছিলেন চন্দ্র রায়। সুলতান মাহমূদকে তার গোয়েন্দারা জানিয়ে ছিল রাজা চন্দ্ররায়ের কাছে এমন বিশালদেহী একটি হাতি রয়েছে যে, এমন হাতি গোটা হিন্দুস্তানে আর কোথাও আছে বলে জানা যায়নি। শুধু বিশালদেহী হিসেবেই এই হাতিটি বিখ্যাত নয়, এটি নাকি শত্রু শিবিরে গিয়ে আতংক ছড়াতে খুবই পটু। অন্যান্য হাতির মতো এটি শত্রু বাহিনীর তীর বর্শার আঘাতে আহত হয়ে রণাঙ্গন ত্যাগ করে না।
কৌশলগত কারণে এই হাতিটি গযনী বাহিনীর জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সুলতান মাহমূদ আসাঈ দুর্গ অবরোধ করে রাজা চন্দ্ররায়কে হাতিটি হস্তান্তরের জন্য পয়গাম পাঠালেন। পয়গামে বললেন–
হাতিটি হস্তান্তর করে দিলে খুবই সহজ শর্তে অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে।”সুলতানের পয়গামের জবাবে রাজা চন্দ্ররায় বললেন
“রাজধানী থেকেও হাতিটি আমার কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। জীবন থাকতে আমি এই হাতি হাতছাড়া করবো না।”
তারপর রাজা চন্দ্ররায় এবং গযনী বাহিনীর মধ্যে শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। দুই বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ চলছে, এমন সময় চন্দ্ররায়ের বিশালদেহী হাতিটি রাজকীয় ভঙ্গিতে সুলতান মাহমুদের কাছাকাছি চলে এলো। হাতির উপরে যেসব আরোহী সওয়ার ছিল গযনী সৈন্যদের তীর বিদ্ধ হয়ে মরে গিয়ে হাতির হাওদায় পড়েছিল। হাতিকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোন মাহুত ছিল না। হাতিটি স্বেচ্ছায় যখন সুলতানের অবস্থানের দিকে এলো তখন সেটির চাল ছিল একেবারেই শান্ত নিরীহ।
কাঙ্খিত হাতিকে এদিকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে আসতে দেখে সুলতান মাহমুদ সেটিকে কজা করার নির্দেশ দিলেন। সুলতানের নির্দেশে দু’জন যোদ্ধা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘোড়া থেকে লাফিয়ে হাতির হাওদায় উঠে গেল এবং হাতিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল।
বিনা প্ররোচনায় বিনা নির্দেশনায় নিজ থেকে হাতি গযনী বাহিনীর কাছে চলে আসায় সুলতান মাহমূদ বললেন
“এই হাতি আল্লাহ আমাদের দান করেছেন।”
সুলতান এই হাতির প্রাপ্তিতে খুশী হয়ে এটির নাম দিয়েছিলেন “খোদা দাদ।”
ঐতিহাসিক ফারিতা লিখেছেন- সুলতান মাহমূদের আনা বিস্ময়কর পাখিটির বৈশিষ্ট্য ছিল, পাখির পিঞ্জিরা কোন ঘরে বা বাড়ীতে রাখলে সেই বাড়ীতে কেউ বিষ নিয়ে প্রবেশ করতে পারতো না। পাখি বিষের অস্তিত্ব টের পেলেই পিঞ্জিরায় অস্থিরভাবে ছটফট করতো। যেনো সে পিঞ্জিরা ভেঙে বেরিয়ে যাবে এবং বিশেষ ধরনের আওয়াজ করতো। লোকেরা পাখির এই আওয়াজ ও অস্থিরতা দেখে তল্লাশী করে লুকিয়ে রাখা বিষ খুঁজে বের করে নিতো। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, সুলতান মাহমূদ বিস্ময়কর এই পাখিটি উপঢৌকন স্বরূপ বাগদাদের খলীফাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
