মুনাজ যুদ্ধে সুলতানকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। এজন্য তিনি তাৎক্ষণিক অগ্রাভিযানের নির্দেশ না দিয়ে কিছুটা সময় নিতে চাচ্ছিলেন। যাতে ক্লান্ত ও আহত যযাদ্ধারা একটু বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারে।
কয়েকদিন মুনাজে অবস্থান করার পর সেনাপতিগণ সুলতানকে পরামর্শ দিলেন, অভিযানের নির্দেশ দিয়ে দেয়া হোক! বিলম্ব করলে অবশেষে ভীম পালের সৈন্যরা এসে শত্রু বাহিনীর শক্তি বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাস্তবতা ও ঝুঁকির আশংকা বিবেচনা করে সুলতান কনৌজের দিকে অভিযানের নির্দেশ দিলেন। তিনি গোটা বাহিনীকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে একটি অংশকে যমুনা নদীর তীরে ঘেষে এবং অপর একটি অংশকে গঙ্গা নদীর তীর ঘেষে সামনে অগ্রসর হতে বললেন। অগ্রবর্তী দলকে খুবই শক্তিশালী করা হলো। মাঝে থাকলেন তিনি নিজে বেশীরভাগ সৈন্য নিয়ে; আর পেছনে রাখলেন একটি রিজার্ভ বাহিনী। প্রতিটি ইউনিট পূর্ণ রণপ্রস্তুতি নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছিল।
১০১৮ সালের ২০ ডিসেম্ভর মোতাবেক ৪০৯ হিজরী সনের ৮ শাবান কনৌজ পৌঁছলেন সুলতান। তিনি গোটা দুর্গ অবরোধ করলেন। কিন্তু খুবই হাল্কা প্রতিরোধের মুখোমুখি হলো মুসলিম সৈন্যরা। অনেকটা নির্বিঘ্নে অবরোধ আরোপ করতে দেয়াকে তিনি কনৌজ শাসকদের একটা কূটচাল মনে করে রিজার্ভ সৈন্যদেরকে পূর্ণ সতর্ক থাকতে বললেন। বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন এবং বাইরের আক্রমণ সম্ভাবনা যাছাই করার জন্যে বহুদূর পর্যন্ত তিনি পর্যবেক্ষক ও গোয়েন্দাদের ছড়িয়ে দিলেন। তার প্রবল আশংকা ছিল হিন্দুরা অবশ্যই পেছন দিক থেকে আক্রমণ করবে। কিন্তু সুলতান মাহমূদের সকল আশংকা-উদ্বেগের অবসান ঘটিয়ে অবরোধের দ্বিতীয় দিনই কনৌজের দুর্গবাসী সাদা পতাকা উড়িয়ে দিল।
* * *
সুলতান মাহমুদ প্রথমে চৌকস একটি ইউনিটকে দুর্গের ভেতরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। এরপর একই সাথে আরো দুটি সেনা ইউনিটকে ভেতরে পাঠালেন। এরা ভেতরে যাওয়ার সাথে সাথেই ভেতরের অবস্থার খবর এসে গেলো যে, ভেতরে কোন ধরনের সংঘর্ষ বাধার সম্ভাবনা নেই। তখন সুলতান নিজে কনৌজ দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করলেন।
সুলতান ভেতরে প্রবেশ করলেন। কনৌজ সৈন্যদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জিজ্ঞেস করে জানা গেল অবরোধ আরোপের আগেই কনৌজের মহারাজা পরিবার পরিজন নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে গেছেন। সুলতান মাহমুদের নির্দেশে হিন্দু সেনাপতি ও কমান্ডারদের জিজ্ঞেস করা হলো, রাজ্যের ধন-ভাণ্ডার কোথায়? তারা তাদের জানা মতে ধনভাণ্ডারের অবস্থান জানালো; কিন্তু সেখানে তল্লাশী করে কিছুই পাওয়া গেল না।
সুলতান রাজমহলকে ধ্বংস করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং প্রধান মন্দিরের সব মূর্তি ভেঙে ফেলার হুকুম দিলেন।
খাজানা না পাওয়ার কথা চাউড় হলে সালেহ মন্দিরের প্রধান পুরোহিতকে গ্রেফতার করিয়ে আনলো। পুরোহিতকে যখন ধনভাণ্ডারের কথা জিজ্ঞেস করা হলো তখন তিনি সুলতানকে জানালেন- ধন-ভাণ্ডারের খবর আপনার সালেহ নামক গোয়েন্দা জানে। কিন্তু সেখানে হয়তো এখন আর কিছুই নেই। মহারাজা হয়তো সবই সাথে নিয়ে গেছেন।
ঐতিহাসিক আবুল কাসিম ফারিশতা লিখেছেন, “সুলতান মাহমূদের এই বিজয় কোন সাধারণ বিজয় ছিল না। কনৌজ বিজয় ছিল রাজনৈতিক বিচারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কনৌজ বিজয়ের ফলে ভারতের বিশাল অংশ সুলতানের দখলে চলে এলো।
৪.৩ সিমনতাশের বেহালা
১০১৭ সাল মোতাবেক ৪১০ হিজরী। সুলতান মাহমূদ মথুরা থেকে কনৌজ পর্যন্ত বিস্তর এলাকা জয় করে বিজয়ী বেশে গযনী ফিরে এলেন। সুলতানের বিজয়ী বাহিনী ফেরার আগেই গযনী খবর পৌঁছে গিয়েছিল, এবার সুলতান কয়েকজন রাজা মহারাজাকে পরাজিত করেছেন এবং ও বহু রাজ্য জয় করে দেশে ফিরছেন।
সুলতানের ফিরে আসার সংবাদ পেয়ে গযনীর আবাল বৃদ্ধসহ সব মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে এলো। সাধারণ লোকেরা আনন্দে শ্লোগান দিচ্ছিল, বিজয়ী সৈন্যরাও হর্ষধ্বনি করছিল। নারীরা দূরে দাঁড়িয়ে বিজয়ী সেনাদের শুভেচ্ছা জানচ্ছিল।
গযনীর অধিবাসীরা যখন উনপঞ্চাশ হাজার হিন্দু বন্দির বিশাল সারি এবং সাড়ে তিনশত জঙ্গী হাতির দীর্ঘ লাইন দেখল তখন আনন্দের আতিশয্যে খুশীতে নাচতে শুরু করল। গযনীর শিশুরা পর্যন্ত সুলতানের পথ আগলে দাঁড়িয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল। গযনীর উল্লসিত মানুষের হর্ষধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠেছিল।
অনেক গোড়া ঐতিহাসিক এবং পরবর্তীকালের ইতিহাসবিদ লিখেছেন, মথুরা, মহাবন, মুনাজ ও কনৌজ বিজয়ের পর সুলতান মাহমূদ গযনী পৌঁছে নির্দেশ দিলেন–
যেসব ধন সম্পদ হিন্দুস্তান থেকে আনা হয়েছে, শাহী মহলের বাইরের খালি জায়গায় সেগুলোকে রেখে দেয়া হোক। সৈন্যরা যখন সংগৃহীত সোনাদানা মণিমুক্তা এক জায়গায় স্তূপাকারে রাখলো, তা দেখে গর্ব ও অহংকারে মাহমূদের মাথা উঁচু হয়ে গিয়েছিল ।
এতটা বাস্তব যে, কনৌজ বিজয়ের পর গযনী ফিরে সুলতান মাহমুদ অর্জিত সকল যুদ্ধলব্ধ সম্পদ তার বাসভবনের সামনে স্তূপাকারে রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু সে সময়কার অন্যতম ঐতিহাসিক যমশরী এবং আবু আব্দুল্লাহ লিখেছেন, “কনৌজ, মথুরা, মহাবন ও মুনাজ বিজয়ের পর গফনী ফেরার সাথে বিজয়োল্লাসে উদ্বেলিত গযনীবাসির উৎসাহ ও আগ্রহের আতিশয্য দেখে সুলতান মাহমূদ যুদ্ধ লব্ধ সকল সম্পদ রাজমহলের বাইরে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এবং এসব সম্পদ দেখিয়ে তিনি জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “এসব সম্পদ তোমাদের, তোমাদের জীবন মান উন্নয়নে এ সম্পদ ব্যয় করা হবে।”
