সেখানে গযনীর সৈন্যরা ভাঙা প্রাচীর দিয়ে দুর্গের ভেতরে গিয়ে আক্রমণের কথা ছিলো সেখানে রাজপুতেরা বাইরে বেরিয়ে এসে গযনী সৈন্যদের উপর আক্রমণ করে আবার দুর্গে ফিরে যাচ্ছিল। শুধু তাই নয়, রাজপুত সৈন্যরা এক পর্যায়ে দুর্গে ফটক খোলা রেখেই বাইরে এসে মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে আবার দুর্গে ফিরে যেতো।
এই অবস্থা দেখে এক পর্যায়ে সুলতান মাহমূদ কমান্ডারদের বললেন, এরা বাহাদুর কিন্তু কিছুটা নির্বোধ। এরা নির্বিচারে নিজেদের শক্তি খরচ করছে। তাই আক্রমণ না করে এখন শুধু প্রতিরোধ করো। আর তাদের শক্তিক্ষয় করতে দাও।
দুই প্রতিপক্ষে মধ্যে যখন এমনই মরণপণ যুদ্ধ চলছে, রাজা রায়চন্দ্রের কুমারী কন্যা রাধাকে তখন একাধারে ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে রাখা হচ্ছিলো। যখনই রাধা হুঁশ ফিরে পেতো, তার কণ্ঠে অতি ক্ষীণ আওয়াজে উচ্চারিত হতো! আল্লাহ আমার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। একথা শোনার সাথে সাথে রাজকীয় বৈদ্য পুনরায় রাধাকে সংজ্ঞাহীনের ওষুধ খাইয়ে দিতেন।
এভাবে চব্বিশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর পঁচিশতম দিনে সুলতান মাহমূদ সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন, দুর্গের প্রাচীরের উপরে এবং ভাঙা অংশগুলোতে তীব্র আক্রমণ করে দুর্গের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করবে এবং দুর্গ ফটক খোলে রাজপুতেরা বাইরে এলে প্রচণ্ড আক্রমণ করে দুর্গ ফটক খোলা রাখার চেষ্টা করবে।
পঁচিশতম দিনের লড়াই ছিল চূড়ান্ত লড়াই। ইতোমধ্যে রাজপুতেরা তাদের বিপুল শক্তি ক্ষয় করে ফেলেছে। গযনীর সৈন্যরা যখন সব কয়টি দুর্গফটকের ভাঙা অংশ এবং দুর্গ প্রাচীরের উপর একযোগে আক্রমণ করে বসল, তখন রাজপুতেরা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিল। মুসলমানরা দুর্গে প্রবেশ করে দেখতে পেল শক্রদের জনবল একেবারেই কম।
রাজপুতেরা তখন মোকাবেলা করার চেয়ে আত্মহত্যাকেই বেশী প্রাধান্য দিচ্ছিল। অনেক রাজপুত পরিবার পরিজন সবাইকে ঘরে বন্দি করে আগুন ধরিয়ে দিল এবং আত্মীয় স্বজন ও পরিবার-পরিজনসহ আগুনে আত্মহুতি দিল। বাইরের রাজপুতদের সামনে কোন হিন্দু নারী নজরে পড়লেই হল সে দৌড়ে গিয়ে তাকে হত্যা করছিল। মুনাজের বহু সৈন্য উঁচু দুর্গপ্রাচীর ও বুরুজ থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যুবরণ করল।
সুলতান মাহমূদ যখন দুর্গে প্রবেশ করলেন, তখন এক কথায় দুর্গের ভেতরের সবখানে আগুন জ্বলছে এবং সেই আগুনে রাজপুতেরা ভষ্ম হচ্ছে। বলা চলে মুনাজের সব অধিবাসী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। শুধু রাজমহলটি ছিল অক্ষুণ্ণ রাজমহলে কেউ অগ্নি সংযোগ করেনি।
গযনীর সৈন্যরা রাজ প্রাসাদে প্রবেশ করে দেখতে পেল জায়গায় জায়গায় মরদেহের স্তূপ। রাজপুতেরা একে অন্যকে হত্যা করেছে। খুব ঠাণ্ডা মাথায় তারা এই পরাজয়ের গ্লানি থেকে বাঁচার জন্যে আত্মহুতির পথ বেছে নিয়েছে। রাজমহলের রক্ষিতা ও নর্তকীদের দেহেও খঞ্জর তরবারী বিদ্ধ অবস্থায় দেখা গেল। রাজমহল তল্লাশী করে রাজা রায়চন্দ্র এবং রানীর মরদেহ তাদের শয়নকক্ষের পালঙ্কের উপর পাওয়া গেল।
গযনীর সৈন্যরা রাজমহলের প্রতিটি কক্ষ তল্লাশী করলো। কোথাও জীবন্ত কাউকে পাওয়া যায় কি-না। কিন্তু সব কক্ষেই তারা দেখতে পেলো মৃত মানুষের মরদেহ। সব কক্ষই ছিল খোলা। কিন্তু একটি কক্ষ ছিল বাইরের দিক থেকে বন্ধ। ছিটকিনী খুলে সৈন্যরা দেখতে পেলো এক তরুণী মৃতপ্রায় অবস্থা বিছানায় শুয়ে আছে। মানুষের আওয়াজ পেয়ে মৃতপ্রায় মেয়েটি ধীরে ধীরে চোখ মেললো এবং ক্ষীণ একটি আওয়াজ করল।
আওয়াজ শুনে উপস্থিত সৈন্যরা তার কাছে গিয়ে বুঝলো তরুণীটি মৃত নয়, তবে মারাত্মক অসুস্থ।
অসুস্থ রাধা অস্পষ্ট আওয়াজে জিজ্ঞেস করলো–
তোমরা কি মুসলমান সৈনিকা তোমাদের সুলতান কোথায়? তাকে ডেকে আনন। আমি তার কাছে বলতে চাই, আমি তার আল্লাহর নাম নিয়েই মরছি। আমি তার হাতে চুমু খেয়ে মরতে চাই।
জীবনৃত তরুণীর কণ্ঠে একথা শুনে গযনীর যোদ্ধারা বিস্মিত হলো। একটি অসুস্থ শত্র মেয়ের জন্যে এই অবস্থায় সুলতানকে এখানে আনা ঠিক হবে না মনে করে সৈন্যরা রাধার কথায় তেমন গুরুত্ব দিল না। রাধা যখন দেখতে পেলো তার কথায় এদের কাছে কোন গুরুত্বপাচ্ছে না, তখন হতাশাগ্রস্থ হয়ে তাদের দিকে কতোক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। এরই মধ্যে তার মাথা নীচের দিকে ঢলে পড়লো। সাথে সাথেই নিথর হয়ে গেলো রাধার হৃদকম্পন। বস্তুত রাধা আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে গযনী বাহিনীর সৈন্যদের সাক্ষী রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় হলো।
***
ব্যাপক রক্তপাত জীবনহানির পর গণ আত্মহত্যার মাধ্যমে মুনাজের রাজপুতেরা দুর্গ মুসলমানদের কজায় ছেড়ে দিল বটে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজেরাই অগ্নি সংযোগ করে দুর্গের সকল বাড়ী ঘর ধ্বংস করে দিল। রাজপুতদের কাছ থেকে মুনাজ দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নিতে সুলতান মাহমূদকে লড়তে হলো জীবনের অন্যতম কঠিনতম লড়াই। এতে ব্যাপক জনশক্তিও কুরবানী দিতে হলো ।
মুনাজ দুর্গ দখলের পর সুলতান মাহমূদের লক্ষ ছিল কনৌজ দুর্গ। কিন্তু কনৌজ সম্পর্কে তার কাছে পরস্পর বিরোধী খবর আসছিল। উভয়বিদ সংবাদের মধ্যে কোনটি সত্য কোনটি মিথ্যা তা যাছাই করা মুশকিল বিষয় হয়ে উঠছিল।
গোয়েন্দা সালেহ সুলতানকে জানিয়ে ছিল, মুনাজ ও কনৌজের মধ্যবর্তী জায়গায়ই হবে তাদের সাথে কঠিন মোকাবেলা। কিন্তু পরে যা খবর আসছিল তাতে জানা যাচ্ছিল মুনাজ ও কনৌজের মধ্যবর্তী স্থানের কোথাও হিন্দু সৈন্যদের কোন চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে না।
