এক সময় তারা ঠিকই দেয়ালের কাছে পৌঁছে গেল। নদীর তীরবর্তী দেয়ালটি খাড়া ছিল না, ছিল ঢালু। ফলে দুর্গ প্রাচীরের উপর থেকে নীচের সবকিছু পরিষ্কার দেখা যেতো। কিন্তু রাতের অন্ধকারে উপর থেকে প্রাচীরের নীচের কোন কিছু দেখার উপায় ছিল না।
আল্লাহর নাম দিয়ে পঞ্চাশজন যোদ্ধা পানিতে দাঁড়িয়ে দুর্গ প্রাচীরের পাথর খোলার চেষ্টা শুরু করে দিল। কিন্তু একদম নিঃশব্দে কোনকিছু করার উপায় ছিল না। শাবল ও খুন্তির আঘাতের আওয়াজ দুর্গ প্রাচীরের উপর পর্যন্ত চলে যাচ্ছিল। কিন্তু সুড়ংকারীদের সুবিধা এই ছিল যে, পানিতে প্রাচীরে শাবল মারার আওয়াজ প্রতিধ্বনীত হয়ে এমন তরঙ্গ শব্দ সৃষ্টি হচ্ছিল, সেখানে আসলে কি হচ্ছে তা সহজে কারো পক্ষে বোঝার উপায় ছিল না।
দুর্গ প্রাচীর ভাঙতে গেলে খুন্তি শাবলের আওয়াজ হবে এ বিষয়টি সুলতান আগেই আন্দাজ করেছিলেন। তিনি পঞ্চাশজনের বাহিনীকে ওখানে পাঠানোর পরই তাদের প্রাচীর ভাঙার আওয়াজকে ছাপিয়ে দেয়ার জন্যে লড়াইরত সৈন্যদেরকে নির্দেশ দিয়ে রেখে ছিলেন, তারা সবাই যাতে এক সাথে হৈ-হুল্লা করে উঠে এবং দফ-নাকাড়া বাজাতে শুরু করে।
সম্মুখ ভাগে মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড শোরগোল, দফ নাকাড়ার বাজনা ও শ্লোগান শোনে দুর্গের সকল রাজপুত এদিকে এসে জড়ো হলো। তাদের ভাব ছিল নিশ্চয় এদিক থেকে গযনী বাহিনী চূড়ান্ত আঘাত হানছে। এই হৈ-হুল্লা আক্রমণের পূর্ব ইঙ্গিত ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। ওদিকে কোন প্রতিবন্ধকতার শিকার না হওয়ায় পঞ্চাশজন যোদ্ধা নিশ্চিন্ত মনে দুর্গপ্রাচীর থেকে পাথর খুলতে লাগল। ঘন্টা খানিক পরেই তারা প্রাচীর ভেদ করে মাটির স্পর্শ পেয়ে গেল। সুড়ং খনন করে এর আয়তন বড় করা তেমন মুশকিল ছিল না; কিন্তু অসুবিধা সৃষ্টি করল পানি। পাথর খোলার সাথে সাথে খালি জায়গা নদীর পানিতে ভরে যাচ্ছিল।
পঞ্চাশজন লোক এক সাথে খনন করার কারণে সুড়ং ছিল যথেষ্ট বড়। তারা দ্রুত খনন কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। খননের এক পর্যায়ে বিশাল একটি পাথর দেখা দিল। খননকারীদের কাছে শক্ত ও মজবুত শাবল ছিল। তারা সেই শাবল দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করে সেই পাথরকেও মূল কাঠামো থেকে খুলে ফেলল। বিশাল পাথর খোলার সাথে সাথেই দুর্গের আলো দেখা গেল। এ সময় খননকারীরা দ্রুততার সাথে অন্য পাথর খুলে দিলে প্রায় পনেরো বিশ হাত চওড়া সুড়ং তৈরী হয়ে গেল। সুড়ং এতোটা উঁচু হলো যে, একজন মানুষ সোজা দাঁড়িয়ে অনায়াসে এর ভেতর দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে।
শেষ পাথরটি খোলে ফেলার সাথে সাথেই দুর্গের ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করল।
এমন সময় দুর্গের ভেতরের কেউ পানি দেখে চিৎকার শুরু করে দিল। ততক্ষণে খননকারীদের খননকাজ শেষ। তারা শত্রুদের উপস্থিতি টের পেয়ে পিছু হটতে শুরু করল।
কিন্তু রাজপুতেরাও ছাড়ার পাত্র নয়। শত্রুর উপস্থিতি টের পেয়ে তারা মশাল উঁচু করে এদিকে দৌড়ে এলো। রাজপুতেরা ছিল বর্শা ও তরবারী সজ্জিত। তখনই উভয় পক্ষের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে গেল। গযনীর সৈন্যরা তো পানিতেই ছিল রাজপুতেরা দলে দলে এসে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করল। পানির মধ্যে শুরু হয়ে প্রচণ্ড লড়াই। এ সময়ের মধ্যে সুড়ং পথে দিয়ে রাজপুতেরা মশাল হাতে নিয়ে আসতে শুরু করলে মশালের আলোয় শত্রু মিত্র পরিষ্কার দেখা যেতে লাগল।
এ দিকে সুলতান মাহমুদ সুড়ং খননকারীদের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিলেন। তিনি তাদের অবস্থা জানার জন্য কয়েকজন সৈন্যকে প্রেরণ করলেন। তারা এসে খবর দিল নদীর মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে গেছে।
খবর শুনে সুলতান একটু অগ্রসর হয়ে দেখলেন, নদীর মধ্যে অসংখ্য মশাল জ্বলছে, যেন নদীতে চলছে মশাল মিছিল। এ সময় তিনি বাকী সৈন্যদেরকে নদীতে নামিয়ে দিলেন এবং তাদের সাথে মশালও দিয়ে দিলেন। এ সময় সুলতান মাহমূদ কমান্ডারদের বললেন
মনে হচ্ছে আমার যোদ্ধারা সুড়ং খনন কাজ শেষ করে ফেলেছে, এই সুড়ং পথেই হয়তো রাজপুতেরা নদীতে নেমেছে। যাও, তোমরা গিয়ে বাস্তব অবস্থা দেখে আমাকে জানাও।
নদীর পানি সুড়ং পথে তীব্র বেগে দুর্গে প্রবেশ করছিল। আর সেই পথ দিয়ে রাজপুতেরা দুর্গের বাইরে আসছিল। কমান্ডারগণ এগিয়ে দেখল, নদীতে অসংখ্য মশাল নাচছে এবং আহত নিহত সৈন্যরা নদীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।
এদিকে সুলতান মাহমূদ ভাবছিলেন, সুড়ং পথে দুর্গের ভেতর তার সৈন্যদের প্রবেশ করানো যায় কিনা। এমন সময় সুড়ং খননকারী এক আহত যোদ্ধা ফিরে এসে সুলতানকে জানাল।
সুড়ং পথে ভেতরে সৈন্য পাঠানো যাবে না সুলতান! এমনটি করলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।”
বাস্তব অবস্থা অনুধাবন করে নদীতে যুদ্ধরত সকল যোদ্ধাকে তিনি ফিরিয়ে আনতে নির্দেশ দিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ইতিহাসিকগণ যারা প্রতিদিনের ঘটনাবলীর বিস্তারিত বিবরণ লিখেছেন তা অনেক দীর্ঘ।
সেসব বর্ণনার সারমর্ম হলো, গয়নীর অকুতোভয় যোদ্ধারা ব্যাপক রক্তক্ষয় করে দুর্গ প্রাচীরের দু’জায়গায় ভাঙন সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিল। কিন্তু রাজপুতেরা এমন বীরত্ব ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল যা দেখে সুলতানের কণ্ঠে ইশ ইশ ধ্বনী উচ্চারিত হলো। তিনি রাজপুতদের বীরত্বও ত্যাগের মহোৎসব দেখে বিস্মিত হলেন।
