রাজার সাথে যখন ঋষি রাধার ধর্ম বিদ্বেষী হওয়ার কথা বলেছিলেন, তখন সেখানে উপস্থিত ছিল আরো দু’জন বৈদ্য ও দু’জন সেবিকা। রাধার ধর্ম বিদ্বেষের কথা শুনে তারা কানে আঙ্গুল দিলো।
ঠিক এ সময় রাধা হঠাৎ করে বিছানা থেকে উঠে বাইরের দিকে ছুটতে লাগল। রাধাকে দৌড়ে বেশী দূর যেতে দেয়া হয়নি। তাকে ধরে ফেলা হলো। তখন রাজারায় চন্দ্র রাজ প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেছেন।
রাধার মা’কে রাধার বাইরে চলে যাওয়ার কথা জানানো হলো। এই খবর শুনে রাধার মা খুবই উদ্বিগ্ন হলেন। কারণ, তখন মুসলমানরা অবরোধ করে ফেলেছে। এমতাবস্থায় রাধা বেরিয়ে গেল নির্ঘাত সে নিহত হবে। তিনি মেয়ের এই অবস্থা দেখে বৈদ্যকে বললেন,
আপনারা ওকে এমন কোন ওষুধ দিন, যা সেবনে সে অচেতন হয়ে থাকবে। হুশ হলে আবার সেই ওষুধ খাইয়ে তাকে অচেতন করে রাখা হবে। রানীর নির্দেশে বৈদ্যরা রাধাকে একটি ওষুধ খাইয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে রাধা অচেতন হয়ে গেল। তারপর কক্ষের দরজা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে সবাই রাধার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো।
* * *
অবরোধের প্রথম দিন অতিবাহিত হলো। দিন রাতের মধ্যে এক মুহূর্তও বিশ্রাম করেননি সুলতান মাহমুদ। এক সময় তিনি দুর্গের পিছনে নদীর পাশে চলে গেলেন। নদী দুর্গের প্রাচীর স্পর্শ করে প্রবাহিত হচ্ছিল। সেখান থেকে ফিরে এসে সুলতান তার কমান্ডারদের বললেন, প্রতিটি পদাতিক ইউনিট থেকে দুই বা চারজন করে দক্ষ ও সাহসী সৈনিককে বাছাই করো এবং তাদের সমন্বয়ে ভিন্ন একটি দল গঠন করে তাদেরকে রিজার্ভ সৈন্যদের সাথে অবস্থান করতে বলো।
অবরোধের দ্বিতীয় দিন গযনীর সৈন্যরা আবারো দুর্গের প্রধান ফটক ভাঙার জন্যে আক্রমণ চালালো। কিন্তু দুর্গ প্রাচীরের উপর থেকে রাজপুতেরা বর্শা বল্লম ও তীরের তুফান ছুটিয়ে দিলো। বিপুল ক্ষয় ক্ষতি হলো মুসলিম বাহিনীর। কিন্তু দুর্গ ফটক ভাঙার কোনই অগ্রগতি করা সম্ভব হলো না। এরপরও ফটক ভাঙার চেষ্টায় বিরত দিলেন না সুলতান। এভাবে টানা সাত দিন চললো ফটক ভাঙার চেষ্টা আর রক্তাক্ত আক্রমণ প্রতি আক্রমণ।
সপ্তম দিন শেষে সন্ধ্যার পর সকল পদাতিক ইউনিট থেকে বাছাইকরা রিজার্ভ সৈন্যদেরকে তার অনুগামী হতে নির্দেশ দিলেন সুলতান। এই বাহিনীতে সৈন্য ছিল তিনশ’য়ের কিছু বেশী। সুলতান এই যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বললেন
গযনী ও ইসলামের মর্যাদার প্রশ্নে তোমাদেরকে আজ কঠিন ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ইসলাম এখন তোমাদের জীবন প্রত্যাশা করে। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি জীবন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে তবে সে তার ইউনিটে ফিরে যেতে পারো। রাতের এই অন্ধকারে আমি ফেরত যাত্রীকে দেখতে পাবো না। আমি এজন্য কারো প্রতি সামান্যতম বিরাগভাজনও হবো না।……
হে আল্লাহর সৈনিকেরা! আল্লাহ ছাড়া রাতের এই অন্ধকারে তোমাদের কেউ চিনতে পারছে না। কেয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তোমাদের চিনতে পারবে না।’ একথা বলে সুলতান দীর্ঘক্ষণ নীরব হয়ে গেলেন। এরপর বললেন,
এখন কি আমি ধরে নিতে পারি, তোমরা সবাই আমার সাথে রয়েছে?
ভারত অভিযান ১০৬
সমস্বরে আওয়াজ ওঠলো, “আমরা সবাই আপনার সাথে আছি সুলতানে মুহতারাম! আমরা তো জীবন বিলিয়ে দেয়ার জন্যই আপনার সাথে এসেছি। আপনি নির্দেশ করুণ সুলতান! আমরা আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় আছি।
আজ তোমরা আমার নির্দেশে নয়, আল্লাহর নির্দেশে লড়াই করবে।” বললেন সুলতান। আজ রাতের এ লড়াইয়ে এই কুফরিস্তানে আল্লাহর নাম প্রচারিত হবে। শোন বন্ধুরা! এই দুর্গের পেছনে যে দুর্গ প্রাচীর রয়েছে, সেটি একেবারে পানি ছুঁয়ে রয়েছে। তোমাদের হাতে দুর্গ প্রাচীর ভাঙা এবং সুড়ঙ্গ খননের সরঞ্জাম দেয়া হচ্ছে, তোমাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন পানিতে নেমে দুর্গ প্রাচীরের নীচ দিয়ে সুড়ং করবে।
এখন সেখানে বেশী পানি নেই। এ সময়ে বেশী পানি থাকে না। কিন্তু পানি ঠাণ্ডা থাকে। যারা সাঁতার জান না, তারা নদীতে নামবে না। তোমাদের ঝুঁকি হলো, দুর্গ প্রাচীরের উপর থেকে শত্রুরা যদি তোমাদের দেখে ফেলে তাহলে তোমাদের উপর বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করবে।
দুর্গ প্রাচীর কতটুকু চওড়া তা আন্দাজ করতে তোমাদের কষ্ট হবে না । অর্ধেক প্রাচীর পর্যন্ত যদি তোমরা সুড়ং করতে পারা দেখবে বাকী অর্ধেক পানিই করে ফেলবে।
প্রায় তিন শতাধিক মৃত্যুঞ্জয়ী পদাতিক সৈন্য থেকে সুলতান পঞ্চাশজনকে আলাদা করলেন। রাতে লড়াইয়ের তীব্রতা থেমে গিয়েছিল। অন্ধকারের কারণে তীরন্দাজরা তীর নিক্ষেপে ক্ষান্ত হয়ে পড়েছিল। অবশ্য দুর্গ প্রাচীরের উপরে এবং বুরুজগুলোতে রাতেও তৎপরতা ছিল।
সুলতান ছিলেন দুর্গ প্রাচীর থেকে প্রায় সিকি মাইল দূরে। তিনি বীর সৈন্যদের আল্লাহর উপর সোপর্দ করে তাদেরকে দুর্গ প্রাচীর ঘেষে নদীর কিনারা দিয়ে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন।
***
রাজপুতেরা নদীর দিক থেকে আক্রমণের আশংকামুক্ত ছিল। কারণ, গযনী বাহিনীর কাছে নদী পথে আক্রমণের কোন সাজ সরঞ্জাম ছিল না। এ পর্যন্ত তারা নদীপথে কোন আক্রমণ পরিচালনা করেনি। ফলে রাজপুতেরা এদিক থেকে আক্রমণের ব্যাপারে পূর্ণ-ঝুঁকি মুক্ত ছিল।
অথচ গযনী বাহিনীর পঞ্চাশজন জীবন ত্যাগী যোদ্ধা নদীর দিক থেকেই আক্রমণের জন্যে অগ্রসর হচ্ছিল। এই পঞ্চাশ অভিযাত্রী উঁচু নলখাগড়া ও গাছগাছালীর আড়াল দিয়ে দুর্গ প্রাচীর কিছুটা দূরে থাকতেই নদীতে নেমে পড়ল। ধনুক তরবারী ছাড়াও তাদের সাথে ছিল শাবল আর খুন্তি কোদাল। নদীর পানি ছিল প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। নদীর তীরের কাছে পানি কোমর পর্যন্ত। মাঝে মধ্যে গর্তের মতো ছিল, যেখানে পানির পরিমাণ গলা বা বুক পর্যন্ত ছিল। যযাদ্ধারা পরস্পর হাত ধরাধরি করে অগ্রসর হচ্ছিল।
