ঋষীজী! মুসলমানদের সুলতান আমাকে বলেছিল, জয় পরাজয় তোমাদের কৃষ্ণদেবী ও বাসুদেবের হাতে নয়, জয় পরাজয় আমাদের আল্লাহর হাতে…..।
এখন তো আমি তার প্রতিটি কথারই বাস্তব প্রতিফলন দেখছি। আচ্ছা, ওই ঝিলের জল কুমিরটি কি মুসলমানদের আল্লাহ? যে শিলাকে খেয়ে ফেলেছে।
আমাদের দুই সৈনিককে কে হত্যা করলো। আমরাই বা কেন গ্রেফতার হলাম?
হরিকৃষ্ণের জন্ম ভূমির ধ্বংসস্তূপ আমি দেখে এসেছি। সেখানকার মূর্তিগুলোর ভাঙা টুকরো আমি দেখেছি। এরাই না আমাদের দেবদেবী, আমাদের ভগবান! এদের যদি কোন শক্তি থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই মুসলমানরা তাদের আক্রমণ করার আগেই ধ্বংস হয়ে যেতো।
রাধার ইসলাম ধর্মের সতোর প্রতি আকর্ষণ এবং পৌত্তলিকতার প্রতি অশ্রদ্ধা দেখে ঋষি নানা যুক্তি ও ঘটনা বলে রাধাকে পৌত্তলিকতার বিশুদ্ধতা বোঝাতে লাগলেন। তিনি রাধাকে এমন সব ঘটনাবলী শোনালেন, যেগুলো কোন সচেতন ও চিন্তাশীল মানুষের কাছে যৌক্তিক ও সত্য বলে মনে হয় না। পৌত্তলিকতার বিপরীতে ঋষি ইসলাম ধর্মকে অসত্য এবং মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য নানান অযৌক্তিক কথা কাহিনী বর্ণনা করতে শুরু করলেন। একপর্যায়ে ঋষি বলতে লাগলেন, মুসলমানরা মিথ্যুক, লুটেরা প্রতারক, ধোকাবাজ, হিংস্র।
আপনি তাদের যাই বলুন, আমি নিজ চোখে যা দেখেছি, তাকে তো আর মিথ্যা বলতে পারি না।’ ঋষির কথার জবাবে বললো রাধা। আমার সাথে লক্ষণপাল ছিল। একপর্যায়ে সেও বলেছিল, রাধা! আমি মুসলমানদের অব্যাহত বিজয়ের রহস্য বুঝে ফেলেছি। সে বলেছিল, আমি মুসলমানদের মধ্যে নারী ও মদের ব্যবহার দেখিনি। এটাই তাদের বিজয়ের অন্যতম কারণ।
রাধা ঋষিকে জানালো, যে দিন মুসলমানরা আমাদের বিদায় করে দেয়, সে দিন খুব ভোরে আমাকে ও লক্ষণকে জাগিয়ে দিয়ে ছিল। আমরা ঘুম থেকে জেগে দেখি তখনো সূর্য উঠতে অনেক দেরী। চারদিকে তখনো অন্ধকার। ঠিক সেই সময় কোত্থেকে জানি সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর আওয়াজ ভেসে আসছিল। আমরা ভেবেছি, এটা হয়তো তাদের ভাষার কোন সঙ্গীত হবে। আওয়াজটা আমার কাছে খুবই চমৎকার লাগছিল।
আমি আমার পাহারাদারকে জিজ্ঞেস করলাম—
কেউ কি গযনীর ভাষায় গান করছে?
পাহারাদার আমাকে জানাল, এটি গানের আওয়াজ নয়। এটি আযানের আওয়াজ। এই শব্দগুলো আমাদের আল্লাহর শব্দ।
আমি আযানের কোন শব্দই বুঝতে পারিনি কিন্তু আযানের ধ্বনী যেন আমাকে যাদুর মতো মুগ্ধ করল। একটু পরে আমি দেখলাম, মথুরায় অবস্থানকারী সকল সৈন্য একটি ভোলা জায়গায় সমবেত হলো এবং সারি বেধে দাঁড়াল। একলোক সবার সামনে দাঁড়িয়ে কখনো ঝুকছে, কখনো দাঁড়াচ্ছে আবার কখনো মাটিতে মাথা আনত করে রাখছে। আর বাকীরা তাকে অনুসরণ করছে। আমি পাহারাদারকে জিজ্ঞেস করলাম, সবাই ওখানে এমন করছে। কেন? প্রহরী জানাল, এটাই আমাদের ইবাদত।
ঋষিজী! মুসলমানদের এই ইবাদত আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। পাহারাদারকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমরা কার ইবাদত কর? তোমাদের সামনে তো কোন মূর্তি নেই?…..।
পাহারাদার বললো, আমরা যার ইবাদত করি, তিনি থাকেন আমাদের হৃদয়ে। তিনি সব জায়গাই বিরাজ করেন। তিনি আমাদের রব। তিনিই আমাদের জয়ী করেন। আমরা যখন তার ইবাদতে ক্রটি করবে, তার নির্দেশ পালন করা থেকে বিরত থাকব তখন সব ক্ষেত্রেই আমাদের পরাজয় ঘটতে থাকবে।’
ঋষি রাধার কথা শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। রাধা অনবরত কথা বলেই যাচ্ছিল। রাধা বললো,
তোমাদের সুলতান হয়তো এই ইবাদত করেন না। কারণ, তিনি তো সুলতান।
পাহারাদার জানাল, সুলতানও এই ইবাদতে রয়েছেন। তিনি হয়তো সৈনিকদের মধ্যে কোথাও রয়েছেন। তিনিও সাধারণ সৈনিকদের মতোই মাথা নত করে ঝুঁকে সিজদা দেন। ইবাদতের সময় তিনি আর সুলতান থাকেন না।
ঋষিজী! আমরা ছোট বেলা থেকেই দেখছি, আমাদের পিতা মহারাজ যদি কখনো মন্দিরে যান তখন সবাইকে মন্দির থেকে বের করে দেয়া হয়।
ঋষিজী! বলুন তো? আসলে সত্য কোনটি?…আমাদের কি কোন রব নেই।
রাধার প্রশ্নের জবাবে ঋষি বলতে লাগলেন, পৌত্তলিক ধর্মে কাকে রব মনে করা হয়। কিন্তু রাধা ঋষির কথায় অনাস্থা প্রকাশ করে বললো, তাহলে কুমিরই কি আমাদের রব? না, কুমির আমাকে প্রতি রাতেই ভয় দেখায়, সে রব হতে পারে না। রব আমার অন্তরে বিরাজ করছেন।
* * *
মহারাজ! রাজকুমারী পাগল হয়ে গেছে। রাধার কাছ থেকে উঠে গিয়ে রাজা রায়চন্দ্রকে জানালেন ঋষি। মনে হয় মথুরায় মুসলমানরা তাকে এমন কিছু পান করিয়েছে, যার প্রভাব তার শরীর থেকে এখনও যায়নি। এই রোগের চিকিৎসা আমার সাধ্যের বাইরে মহারাজ! রাজকুমারী তার ধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে গেছে। এখন সে নানান অহেতুক কথা বলতেই থাকে। অনেক সময় কথা বলতে বলতে নীরব হয়ে যায়। অনেক সময় বিকট চিৎকার দিয়ে তার চেহারা কাপড় বা হাতে ঢেকে ফেলে। অধিকাংশ সময়ই বলতে থাকে, আমার রব আমার হৃদয়ে এসে গেছে। এটা সেই মুসলমানদের আছর মহারাজ!
ঠিক আছে। তাকে আর আপনার চিকিৎসা করার দরকার নেই। তাকে তার অবস্থাতেই থাকতে দিন।’ বললেন রাজা রায়চন্দ্র। আমি সুলতান মাহমূদের মাথা কেটে এনে তার সামনে ফেলে দেবো। তখন ঠিকই দেখবেন তার মন থেকে মুসলমানদের রব চলে যাবে। এখন এসব নিয়ে ভাববার অবসর আমার নেই ঋষিজী! গযনী বাহিনী অনেক কাছে চলে এসেছে।” বলে রাজা রায়চন্দ্র রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
