মন্দিরগুলোতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লোকজনকে ক্ষেপিয়ে তোলা হচ্ছিল এবং রক্তাক্ত লড়াই করে মুসলমানদের পরাজিত করার জন্যে জনগণকে প্ররোচনা দেয়া হচ্ছিল। এর ফলে মুনাজের নারী মহলের মধ্যে সৃষ্টি হয় যুদ্ধ উন্মাদনা। তারা পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
রাজমহলে রায়চন্ত্রের রক্ষিতারাও পর্যন্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্যতিক্রম শুধু রাধা। সে সব কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাজমহলে একাকী শুয়ে থাকতো। নয়তো দুর্গ প্রাচীরের উপরে ওঠে গযনী সৈন্যদের আগমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকতো।
এক দিন সন্ধ্যার আগে দুর্গ প্রাচীরে দাঁড়িয়ে রয়েছে রাধা। সম্পূর্ণ উদাস মন। দূরের আকাশের লালিমায় স্থির তার দৃষ্টি। এমন সময় রাধার কণ্ঠে উচ্চারিত হলো।
“সে এদিক দিয়ে আসবে! জানি না কবে আসবে সে।”
“কে আসবে?” তার পাশের কেউ জিজ্ঞেস করল।
কারো দিকে না তাকিয়ে উদাস মনেই সে জবাব দিল- “মুসলমান; গযনীর সৈন্যরা!”
একথা বলেই হঠাৎ কেঁদে উঠলো রাধা। আশ-পাশে তাকিয়ে নীরব হয়ে গেল তার কণ্ঠ। রাধা পাশে তাকিয়ে দেখল, এক ঋষী তার পাশেই দাঁড়ানো। এবং সে রাধার কাছে জানতে চাচ্ছিল কে আসবে? অথচ রাধা এমনই উদাস-আনমনা ছিল যে, এতো কোলাহল ও হট্টগোলের মধ্যেও সে নিজেকে একাকী ভেবে ছিল।
এই ঋষি সম্পর্কে রাধা জানতো। অনেক প্রভাব প্রতিপত্তি ও মর্যাদাবান লোক এই ঋষি। মুনাজের প্রধান পুরোহিতও তাকে দেখলে দু’হাত জড়ো করে কুর্ণিশ করে। ঋষি ধর্মীয় গুরু হওয়ার পাশাপাশি খ্যতিমান একজন চিকিৎসকও। মানুষকে ধর্মের দীক্ষা দেয়ার পাশাপাশি তিনি মানসিক রোগী ও ভূত-প্রেতের আছর করা লোকদের চিকিৎসা করেন। মানুষকে ভূত-প্রেতের অত্যাচার প্রভাব থেকে হেফাযত করেন। এমন একজন মহামনীষীকে কাছে দেখেও যে রাধার উল্লাসিত হওয়ার কথা ছিল সেই রাধার কাছে ঋষির উপস্থিতি অসহ্য মনে হলো। মনে মনে ভীষণ ক্ষুব্ধ হলো রাধা।
“রাজকুমারী কি মুসলমানদের আগমনের অপেক্ষা করছেন?”
বিনীত কণ্ঠে রাধাকে জিজ্ঞেস করলেন ঋষি।
আমি যার জন্যেই অপেক্ষা করি? আপনি আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছেন কেন?” ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো রাধা।
হস্তক্ষেপ করিনি রাজকুমারী! এসেছি আপনার দুঃখে শরীক হতে। আমি জেনেছি, আমাদের রাজকুমারীর উপর ভৌতিক আছর পড়েছে যার চিকিৎসা আমাকে করতে হবে। মহারাজ আমাকে বলেছেন, আপনি মথুরা থেকে ফিরে আসার পর থেকেই মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অবশ্য হওয়ারই তো কথা।
আমি জানি রাজকুমারী! মুসলমানরা মানুষ নয়, হায়েনার মতো হিংস্র। এরা মানুষ খাওয়ার জন্যই এদেশে আসে। আপনি না বললেও আমি জানি, ওরা আপনার সঙ্গে কি আচরণ করেছে। এরা সোনা-দানা হীরা জহরত আর নারীর জন্যে পাগল। এই নারী আর ধনরত্নের জন্যেই এরা বারবার হিন্দুস্তানে আসে।
মিথ্যা কথা! সবই মিথ্যা। উত্তেজিত কণ্ঠে বললো রাধা।
আপনি যা বলছেন, তারা আমার সাথে এমন কোন আচরণ করেনি। তারা নারী লোভী নয়। গযনী সুলতানের দরবারে আমি একজনও নারী দেখিনি। আমার বাবার মতো রাজা মহারাজাদের দরবারেই নারী বেশী থাকে। বাবার মতো রাজাদের পেছনে দাঁড়িয়ে সুন্দরী তরুণীরা পাখা দোলায়। তাদের সেবা করে তরুণীরা। সুন্দরী তরুনীরাই তাদের ঘুম পাড়ায়, ঘুম থেকে জাগায়। মিথ্যা কথা। মুসলমানরা হিংস্র জন্তু নয় প্রকৃতই মানুষ। বরং ভালো মানুষ। তারা আমাদের দেয়া সোনাদানা গ্রহণ করেনি।
ঋষি জ্ঞানী লোক, পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ। সে রাধার কথার বিরোধিতা না করে বরং তার সাথে সহানুভূতি ও স্নেহমাখা কথা বলতে শুরু করলেন। মায়া ও মমতার পরশ দিয়ে ঋষি রাধার ক্ষোভকে কিছুটা প্রশমিত করে ফেললেন। অবস্থা এমন হলো যে, কয়েক দিনের নীরব নিস্তব্ধ হয়ে ওঠা রাধা কথা বলতে বলতে ঋষির সাথে হাঁটতে শুরু করল।
এরপর থেকে প্রতিদিন ঋষি রাধার কাছে আসতে শুরু করলেন। দীর্ঘ সময় রাধা ঋষীর সাথেই ব্যয় করে। তার সাথে নানা বিষয়ে কথা বলে। বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলে ঋষি বুঝতে পারলেন, রাধা ঠিকই মুসলমান আছরে আক্রান্ত। তা ছাড়া রাধার মধ্যে একটা প্রচণ্ড ভীতিও কাজ করছে।
রাধা ঋষিকে জানাল, প্রতি রাতেই সে সেই কুমিরকে স্বপ্নে দেখে, কুমিরের মুখে শিলার মরদেহ ঝুলছে এবং কুমিরের মুখ থেকে তাজা রক্ত ঝরছে। তখন আতংকিত হয়ে রাধা চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং তার সারা শরীর ঘামে ভিজে যায়।
রাধার এই আতংক দূর করার চিকিৎসা ছিল তার সাথে কথা বলে মনের আতংক দূর করে ফেলা। ঋষী নানা বিষয়ে রাধার সাথে কথা বলে তার মন থেকে কুমিরের ভয় এবং মুসলমান প্রীতি দূর করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু রাধার শারীরিক অবস্থা ক্রমান্বয়ে আরো খারাপ হতে লাগল। রাজা রায়চন্দ্র যুদ্ধের ব্যস্ততার জন্যে রাধার প্রতি মনোযোগ দিতে পারছিলেন না। তিনি রাধার সুচিকিৎসার জন্যে ঋষীকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন।
ঋষী ছাড়াও রাধার চিকিৎসার জন্যে আরো খ্যাতিমান অভিজ্ঞ বৈদ্য আনা হলো। কিন্তু রাধার শারীরিক অবস্থার আরো অবণতি ঘটল। এক পর্যায়ে রাধা ওষুধ পথ্য খাওয়া ছেড়ে দিল। ঋষি ছাড়া আর কাউকেই সে কাছে ঘেষতে দিতো না। ঋষিই হয়ে উঠলেন তার বিশ্বস্ত সঙ্গী। একদিন রাধা ঋষিকে বললো–
