কিন্তু পথিমধ্যে এক কুমির শিলাকে শিকারে পরিণত করল। যে দৃশ্য দেখে রাধা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। অতঃপর লক্ষণ ও রাধা উভয়কেই গযনীর টহলরত গোন্দোদের হাতে গ্রেফতার হয়ে মথুরায় সুলতান মাহমূদের কাছে পেশ করা হয়।
সুলতান তাদেরকে কোন প্রকার শাস্তি না দিয়ে সসম্মানে নিজ নিজ বাবার কাছে পাঠিয়ে দেন। তখন থেকেই রাধা আমূল বদলে যায়।
ছোট বেলা থেকে রাধা মুলমানদের সম্পর্কে যা শুনে এসেছিল, গযনীর সৈন্যদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে বাড়ীতে ফিরে আসা পর্যন্ত তাদের আচার-আচরণ দেখে রাধার এতো দিনের ধারণা ধারণা বিশ্বাস মিথ্যা প্রমাণিত হলো।
সেই শৈশব থেকেই হিংস্র জন্তুর মতোই রাধার মনে ছিল মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা। সে মুসলমানদের হাতে গ্রেফতারী এড়াতে বিষপানে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। কারণ সে জানতো, তার মতো সুন্দরী তরুণীকে মুসলিম সৈন্যরা শিকারী হিংস্র জন্তুর মতোই ক্ষতবিক্ষত করে ফেলবে। জানতে মুসলিম সৈন্যরা খুবই হিংস্র এবং নারীখেকো।
কিন্তু গ্রেফতার হওয়ার পর অবাক বিস্ময়ে রাধা প্রত্যক্ষ করলো, তাকে ও লক্ষণপালকে গ্রেফতারকারী দলনেতা নিজ কন্যা ও ছেলের মতোই মর্যাদা দিয়েছে। তার চেয়েও বিস্ময়ের ব্যাপার, চরম শত্রু জেনেও সুলতান মাহমুদ তাদের প্রতি সামান্যতম উন্মা পর্যন্ত প্রকাশ করেননি বরং তাদের জাতীয়তাবোধের ব্যাপারে প্রশংসা করেছেন এবং কোন প্রকার শাস্তি না দিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদেরকে তার সেনাসদস্যকে দিয়ে সসম্মানে বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
রাধার বিশ্বাস ছিল মুসলমানরা বাস্তবিকই অসভ্য, তাদের কোন নীতি ধর্ম নেই। রাধার কাছে পৌত্তলিকতার বাইরে কোন ধর্ম মতের অস্তিত্ব ছিল না। আত্মমর্যাদাবোধ ও সম রাজপুতদের কাছে ছিল জীবনের চেয়ে দামী। কিন্তু ধর্মের শত্রুদের ধ্বংস করার জন্যে জাত্যাভিমানী এই রাজপুত কন্যা নিজের সমকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইচ্ছাপোষণ করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় সে মুসলমানদের হাতে গ্রেফতার থাকার পরও তার এই অপরূপ রূপ সৌন্দর্য নিয়ে কেউ টুশব্দটি পর্যন্ত করেনি। অথচ গোটা অঞ্চল জুড়ে রাধার রূপের প্রশংসা করে না এমন মানুষ একজনও ছিল না।
লক্ষণ গ্রেফতার হওয়ার পর দলনেতাকে তাদের সাথে রক্ষিত সোনাদানা দিতে চাইলো এবং তাদের মুক্তির বিনিময়ে ঘোড়া বোঝাই করে ধন-রত্ন দেয়ার প্রস্তাব করলো। কিন্তু মুসলমান সৈন্যরা বিপুল এই ধনভাণ্ডারের প্রতি বিন্দুমাত্র আকর্ষণবোধ করলো না। বরং তারা লক্ষণের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে কর্তব্য পালনে অবিচল রইলো।
রাধাকে যখন সুলতান মাহমূদের সামনে হাজির করা হলো, তখন সুলতানের চেহারার দিকে তাকিয়ে রাধার মনে প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মে ছিল। সে আশঙ্কা করছিল নিশ্চয়ই সুলতান কোন ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ নেবেন। কিন্তু রাধার সব আশঙ্কা ও কল্পনার বিপরীতে সুলতান তখন বললেন
“আমরা এই জাত্যাভিমানী শত্ৰুকন্যাকে সম্মান করি। আমরা তাদের সংকল্পকে মোবারকবাদ জানাই।”
সুলতান মাহমূদ যখন তার সৈন্যদের নিয়ে মুনাজ দুর্গ অবরোধ করলেন, তখন রাধার কানে সুলতানের সেই কথা ধ্বনিত হতে লাগল–
“আমাকে হত্যা করার চেষ্টা তোমাদের অবশ্যই থাকা উচিত। এই চেষ্টার সফলতা ব্যর্থতা তোমাদের কৃষ্ণদেবী বা বাসুদেবের হাতে নয়, সফলতার চাবিকাঠি আমাদের আল্লাহর হাতে। তিনি হলেন সেই প্রভু, যার পয়গাম নিয়ে আমরা ভারতে এসেছি।”
এরপর সুলতান তার সেনাপতিকে নির্দেশ দিলেন–
“এদেরকে সসম্মানে ওদের শহরের কাছে রেখে আসার ব্যবস্থা করো এবং তাদের ঘোড়া, সোদানা সবই দিয়ে দাও।”
সাথে সাথে সুলতানের নির্দেশ কার্যকর করা হলো। রাধা ও লক্ষণপালকে শাহী অতিথির মতোই সেনাপ্রহরায় তাদের শহরের কাছে রেখে আসা হলো।
***
সুলতান মাহমূদকে হত্যার মিশনে যাওয়ার আগে রাধা যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু ফিরে এসে যখন সে তার বাবাকে মিশনের ব্যর্থতা সম্পর্কে অবহিত করছিলো তখনকার অভিব্যক্তি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। রাধা তার বাবাকে ভিন্ন এক সুরে বললো, আমরা যখন মুসলিম সৈন্যদের হাতে গ্রেফতার হয়ে সুলতান মাহমুদের সামনে নীত হলাম, তখন সুলতান মাহমুদ আমাকে নিজ কন্যার মতোই সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে কথা বললেন। রাধা তার বাবাকে তার গ্রেফতারী এবং লক্ষণ ও তার সাথে সুলতানের কথোপকথনের পুরো ইতিবৃত্ত জানালো। কিন্তু রাধার বাবা রায়চন্দ্র রাধার মানসিক পরিবর্তনের ব্যাপারটি বুঝতে পারেননি। ফলে তিনি রাধাকে বললেন
আমরা আমাদের এই বেইজ্জতির কঠিন প্রতিশোধ নেবো।
রাধা অন্য দশটি কুমারী মেয়ের মতো ছিল না। সে যেমন ছিল সুন্দরী তেমনই বুদ্ধিমতি। কিন্তু মিশনের ব্যর্থতা ও গযনী বাহিনী সম্পর্কে তার পরিবর্তিত বাস্তব ধারনার পর তার বাবা যখন মুসলমানের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ের হুংকার দিলেন, তা শুনে রাধার মাথায় যেন আসমান ভেঙে পড়ল।
স্বভাবগতভাবে রাধা ছিল খুবই আত্মপ্রত্যয়ী এবং সাহসী। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতি তার সবকিছু ওলট পালট করে দিল। দুনিয়ার সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলল রাধা। একাকী নীরব নিঃশব্দে দিন কাটাতে লাগল সে।
রাজ দরবার রাজমহল শহরের অলিগলি ভেতর বাহির সবখানে তখন যুদ্ধের সাজ-সাজ রব, গযনী বাহিনীকে প্রতিরোধের হুংকার, রণপ্রভূতি। যে কোন দিন গযনীর সৈন্যরা দুর্গ প্রাচীর ভেদ করতে পারে। রাজা রায়চন্দ্র এখন লড়াই ছাড়া আর কোন বিষয়ে কোন কথাই বলেন না।
