সুলতান যখন তিন দিকের অবরোধ কাজ সম্পন্ন করেন, তখন সালেহ সেই পুরোহিতের ভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে সেখানে হাজির হলো।
সালেহ সেখানে পৌঁছারপর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান সুলতানকে জানাল, গোয়েন্দা সালেহ এই খবর নিয়ে এসেছে। সালেহ খবর পেয়ে সুলতান মাহমুদ মথুরায় খবর পাঠালেন, ওখানে যে সৈন্যদের রেখে আসা হয়েছে অর্ধেক সেখানে রেখে বাকী সৈন্য অতি দ্রুত মুনাজে পাঠিয়ে দেবে। সেই সাথে সেখানে রেখে আসা সকল জঙ্গী হাতিকেও এরা সাথে নিয়ে আসবে। সে সময় সুলতানের হাতে প্রায় সাড়ে তিনশ জঙ্গি হাতি ছিল। মথুরার রিজার্ভ সৈন্যরা মুনাজ পৌঁছালে তাদেরকে তিনি মুনাজ ও কল্লৌজের মধ্যবর্তী এলাকায় পাঠিয়ে দিলেন।
অধিকাংশ ইতিহাসগ্রন্থে সুলতান মাহমুদের সতেরো বারের ভারত অভিযানের মধ্যে মুনাজের উল্লেখ নেই। কোন কোন ইতিহাস গ্রন্থে সামান্য ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও মুনাজে যে তার এযাবতকালের ভারত অভিযানের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন লড়াই লড়তে হয়েছিল এর বিস্তারিত আলোচনা অনুপস্থিত। মুনাজে ছোট্ট একটি দুর্গজয়ে তার যে শক্তি ক্ষয় করতে হয়েছিল মথুরা মহাবন এবং বুলন্দ শহরের মতো বড় বড় তিনটি লড়াইয়েও এত শক্তিক্ষয় হয়নি। মুনাজের রাজপুতদের অবস্থা এমন ছিল যে, সৈন্য ও সাধারণ মানুষদের মধ্যে পার্থক্য করাই মুশকিল হচ্ছিলো। ছোট ছোট ছেলেরাও সৈন্যদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল।
ঐতিহাসিক উলবী লিখেছেন, যুদ্ধকালে মুনাজের রাজপুতদের অবস্থা ছিল দড়ি ছেঁড়া উটের মতো এবং অজেয় দৈত্যের মতো ভয়ংকর।
মুনাজ যুদ্ধের কমান্ড ছিল সুলতানের নিজের হাতে। তিনি সরাসরি রণাঙ্গনে কমাণ্ড দিচ্ছিলেন। তিনি যে দিক দিয়েই তার লোকদেরকে দুর্গ ফটক ভাঙ্গা কিংবা দুর্গ প্রাচীরে ফাটল ধরানোর জন্য পাঠাতেন, দুর্গ প্রাচীরের উপর থেকে তাদের উপর বৃষ্টিরমতো তীর ও বর্শা নিক্ষিপ্ত হতো। গযনীবাহিনীর তীরন্দাজরা অগ্রসর হয়ে দুর্গপ্রাচীরের উপর দণ্ডায়মান তীরন্দাজ ও বর্শাধারীদের উপর তীর বৃষ্টি বর্ষণ শুরু করল গযনীর তীরন্দাজদের তীর বিদ্ধ হয়ে যে রাজপুতেরা দুর্গপ্রাচীর থেকে গড়িয়ে পড়তো সাথে সাথে শূন্যস্থান অন্য রাজপুতেরা পূর্ণ করে ফেলতো। দুর্গ প্রাচীর থেকে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে হুমকি ভেসে আসছিল।
‘মাহমূদ! বাঁচতে চাইলে ফিরে যাও।‘
‘হে গযনীর ডাকাতেরা! তোমরা কবরস্থানে এসে গেছো।‘
এসব হুমকি ধমকির পাশাপাশি নানা অশ্রাব্য গালি গালাজও ভেসে আসছিল দুর্গপ্রাচীর থেকে।
দিনের প্রায় অর্ধেক চলে গেল। অবস্থা দৃষ্টে সুলতান বললেন–
এই দুর্গ সহজে করায়ত্ত করা যাবে না। এজন্য নতুন করে চিন্তা করতে হবে।
অবরোধের প্রথম দিন শেষ হলো। এ দিনে মুসলমানরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হলো। মুনাজ দুর্গের ভেতরের পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সেখানকার অধিবাসী নারী পুরুষ আবাল বনিতা এমনকি ছোট ছোট শিশুরা পর্যন্ত তীর কামান বর্শা তরবারী হাতে নিয়ে দুর্গপ্রাচীরের উপরে এবং দুর্গের সর্বত্র মহড়া দিচ্ছিল। তারা স্লোগান দিচ্ছিল, আমাদেরকে দুর্গের বাইরে গিয়ে গযনী বাহিনীর উপর আক্রমণের অনুমতি দেয়া হোক। মুনাজের রাজা রায়চন্দ্র ছিলেন দূরদর্শী ও জাত লড়াকু। তিনি আনাড়ী ছেলে মেয়েদেরকে দুর্গের বাইরে এমনকি দুর্গপ্রাচীরে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছিলেন না। তিনি আবেগী লোকদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধি ছাড়া শুধু আবেগের জোরে যুদ্ধ করা যায় না। অবশ্য তোমরা মুনাজের সম্মান। কিন্তু তোমরা জানো না গযনীর সৈন্যরা চোর ডাকাতের দল নয়। ওরা এমন ভয়ংকর যোদ্ধা যাদের সামনে পাহাড়ের মতো শক্ত প্রাচীর কাঁপতে থাকে। তোমাদের প্রশিক্ষিত সৈন্যরা দুর্গপ্রাচীরে রয়েছে। কোন কারণে শত্রু সৈন্যরা যদি দুর্গের ভেতরে ঢুকে পড়ে তখন মুনাজের ইজ্জত রক্ষার দায়িত্ব হবে তোমাদের উপর। মথুরা ও মহাবনের কাপুরুষরা যে ভাবে গযনী সৈন্যদের হাতে দুর্গ তুলে দিয়েছে আমরা সে ভাবে তাদের হাতে দুর্গ তুলে দেবো না।
রাজা রায়চন্দ্রের কথা শোনে সমবেত জনতা শ্লোগান দিতে লাগলো, আমাদেরকে দুর্গের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হোক, আমরা চরমভাবে প্রতিশোধ নেবো।
নগরবাসীর আবেগ ও উচ্ছ্বাস দেখে রাজা রায়চন্দ্র সমবেত লোকদের থেকে কিছু সংখ্যক লোককে বাছাই করে তার কাছে থাকতে বললেন এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন, তোমাদেরকে প্রয়োজনের সময় দুর্গের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। রাজার আশ্বাসে জনতার ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হলো।
এদিকে রাজা রায়চন্দ্রের রাজপ্রাসাদে নারীরাও অস্ত্র সজ্জিত হয়ে গেলো। তারা শহরের অন্যান্য নারীদেরকে লড়াইয়ের জন্য সংগঠিত করতে শুরু করল।
রাজপ্রাসাদের মধ্যে মাত্র একজন ছাড়া আর সবার মধ্যেই বিরাজ করছিল যুদ্ধ উন্মাদনা। কিন্তু রাজা রায়চন্দ্রের উর্বশী কন্যা রাধার মধ্যে এই যুদ্ধের কোনই প্রতিক্রিয়া ছিল না। তার অবস্থা অনেকটা এমন ছিল, এই মাটি মানুষের হানাহানির সঙ্গে যেন তার কোনই সম্পর্ক নেই।
আগেই বলা হয়েছে, রাজা রায়চন্দ্রের বোন শিলা ও কন্যা রাধা রাজা রাজ্যপালের ছেলে লক্ষণপালের সাথে সুলতান মাহমূদকে হত্যা করার জন্য অভিযানে বের হয়েছিল। শিলা ও রাধার রূপ সৌন্দর্য ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তারা ভেবেছিল তাদের রূপসৌন্দর্যের যাদুকরী আকর্ষণে মুগ্ধ করে তারা সুলতানকে হত্যা করতে সক্ষম হবে।
