আমি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছি মহারাজ! উচ্ছাসিত কণ্ঠে বললো পুরোহিত। রাণী শকুন্তলার সাথে গয়নীর এক গোয়েন্দাকেও সাপের গর্তে নিক্ষেপ করেছি। আর এক গোয়েন্দাকে প্রতারিত করে জীবন ভিক্ষা দিয়ে বিভ্রান্ত করে পাঠিয়ে দিয়েছি। তাকে বলে দিয়েছি, তুমি গিয়ে বলবে, তোমাদের সুলতান যেন কনৌজের দিকে পা না বাড়ায়।
পুরোহিত সালেহকে যা কিছু বলেছিলেন সবই মহারাজা রাজ্যপালকে বলল। তিনি আরো বললো, মহারাজ! আমি আপনার মর্যাদা ও সম্মানের জন্য মন্দিরের সম্মান রক্ষার্থে এবং আপনার বিজয়ের জন্যে মিথ্যা বলেছি। আপনি আমার এই মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করে দেখাবেন।
ধনভাণ্ডারের চিন্তা করার দরকার নেই। ভগবানের দয়ায় ধনভাণ্ডার পর্যন্ত কেউ পৌঁছাতে পারবে না। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, যে কথা আমি গোয়েন্দাকে বলে দিয়েছি এর ফলে সুলতান মাহমূদ আতংকিত হয়ে পড়বে। এখন আপনি কিছু সৈন্য শহরের বাইরে পাঠিয়ে দিন। লড়াই করুন মহারাজ! লড়াই করুন!
পণ্ডিত মহারাজ! আপনি এক গোয়েন্দার মাধ্যমে সুলতান মাহমূদকে বিভ্রান্তিকর খবর দিয়ে মারাত্মক ভুল করেছেন বললেন মহারাজা রাজ্যপাল। মহারাজা তখন তার কাছে রক্ষিত ভীমপালের চিঠি পুরোহিতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই চিঠিটি ভীমপাল রায়চন্দ্রকে লিখেছিলেন, রায়চন্দ্র সেটি আমার কাছে একটি নোটসহ পাঠিয়ে দিয়েছেন।
একি? এটি সেই ভীমপালের চিঠি যাকে লোকে নির্ভিক অকুতোভয় বলে ডাকে! তাচ্ছিল্য মাখা কণ্ঠে বললেন পুরোহিত। ভীতু, কাপুরুষ। এজন্যই তো
সে আমাদের এলাকায় ঘুরছে তার ভাইও এখানেই রয়েছে। কিন্তু তার সেনাবাহিনী দিয়ে আমাদের সাহায্য না করে শুধু শুধু গযনী বাহিনীর বিরুদ্ধে উষ্কানী দিচ্ছে। আবার ভয়ও দেখাচ্ছে।
এই চিঠি পড়ে আপনি ভয় পাবেন না মহারাজ!
এই চিঠিতে যা কিছু লেখা আছে তার সবই বাস্তব পণ্ডিত মশাই! বললেন রাজা রাজ্যপাল। আপনি সুলতান মাহমূদকে ভুল তথ্য দিয়েছেন গঙ্গা যমুনার মধ্যবর্তী স্থানে তার জন্যে কঠিন জাল বিছিয়ে রাখা হয়েছে। এখন দেখতে পাবেন সে আরো কোন অসাধারণ কৌশলে তার সৈন্যদেরকে কনৌজে পাঠায়।
দেখবেন, সে সাধারণ অভিযাত্রীদের মতো করে তার সৈন্যদের অগ্রসর হতে দেবে না। এখন তার সৈন্যরা বিশাল এলাকা নিয়ে পাশাপাশি সামনে অগ্রসর হবে। তার সৈন্যদের দুই বাহু বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে থাকবে। তার গোটা সৈন্যবাহিনী এক সাথে সামনে এগুবে না। আপনি মাহমূদের রণকৌশল সম্পর্কে জানেন না পণ্ডিত মশাই! মাহমূদ ভয়ংকর চিতাবাঘ! আপনি তার উপস্থিতি তখন টের পাবেন, যখন আপনার ঘাড় তার দাঁতে আটকে যাবে এবং আপনার শরীর তার পাঞ্জার ভেতরে চলে যাবে। আক্রান্ত হওয়ার আগে কেউ বলতে পারে না, মাহমূদ মাটির নীচ থেকে আক্রমণ করেছেন না গাছের উপর থেকে হামলে পড়েছে।
মহারাজার কথা শেষ হওয়ার আগেই তাকে জানানো হলো, একজন দূত এসেছে। সে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ বয়ে এনেছে।
মহারাজা তাকে তাৎক্ষণিক তার কাছে পাঠিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন।
দূত এসে জানাল, গযনীর সৈন্যরা মুনাজ অবরোধ করতে শুরু করেছে।
আমরা যদি ওদের পেছনে দিক থেকে আক্রমণ করি তাহলে ওদের ক্ষতি সাধন করার কি কোন সম্ভাবনা আছে? দূতের কাছে জানতে চাইলেন রাজ্যপাল।
না, মহারাজ! এমন সুযোগ নেই। গযনী বাহিনীর একটি অংশ মুনাজ অবরোধ করছে, আর একটি অংশ মুনাজ ও কনৌজের মধ্যবর্তী স্থানে তাঁবু না খাঁটিয়ে সম্পূর্ণ রণপ্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান করছে। রাতের বেলায়ও তারা তাদের ঘোড়াগুলোকে সাথেই রাখে। আমাদের লোকেরা উপজাতীয় লোকদের বেশ ধারণ করে দেখে এসেছে মুসলিম সৈন্যরা বহুদূর পর্যন্ত টহল দিচ্ছে। আমরা সেখানকার প্রতিটি উঁচু গাছ ও উঁচু টিলার উপরে মুসলিম সৈন্যদের অবস্থান নিতে দেখেছি।
এর অর্থ হলো, আমরা যদি মুনাজের সাহায্যে সেনা পাঠাই, তাহলে গযনীবাহিনী পথিমধ্যেই তাদের আটকে দে?ে জিজ্ঞেস করলেন মহারাজা।
জী হ্যাঁ, মহারাজ! আমাকে বলে দেয়া হয়েছে, আমি যেন আপনাকে মুনাজের দিকে সৈন্য না পাঠাতে বলি, বললো দূত।
পণ্ডিতজী মহারাজ! নিজের কানেই তো অবস্থা শুনলেন, পুরোহিতের উদ্দেশ্যে বললেন কনৌজরাজ।
পুরোহিতকে একথা বলে রাজ্যপাল তার সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠালেন। সেনা কর্মকর্তারা এলে তিনি গযনী বাহিনীর অবস্থা সম্পর্কে তাদের অবহিত করে বললেন-তোমরা যদি কনৌজকে বাঁচাতে চাও, তাহলে মুনাজের রাজপুতেরা কি করে সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে। দেখতে হবে, তারা লড়াই করে না হাতিয়ার ফেলে আত্মসমর্ণ করে। তারা যদি শক্তভাবে অবরোধের মোকাবেলা করে এবং দুর্গ থেকে বাইরে এসে মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হয় তাহলে তাদের সাহায্য করবে। আর যদি তা না হয় তবে তোমাদেরকে কনৌজ বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে।
১০১৮ সালের নভেম্বরে সুলতান মাহমূদ মুনাজ দুর্গ অবরোধ করেন। তাকে আগেই গোয়েন্দারা খবর দিয়েছিল মুনাজের রাজপুতেরা তাদের স্বজাতির মর্যাদা রক্ষায় জীবন দিয়ে দিতে প্রস্তুত। এদেরকে যুদ্ধে কাবু করা সহজ ব্যাপার নয়। সারা ভারতে এরা লড়াকু জাতি হিসেবে খ্যাত।
সুলতান যে আবরোধ বেষ্টনী গড়ে তুলেন, তা ছিল তিন দিক থেকে বেষ্টিত। এক দিকে ছিল প্রবাহমান যমুনা নদী। সুলতানকে জানানো হয়েছিল, অবরোধকালে কনৌজের সৈন্যরা আক্রমণ করতে পারে। কনৌজবাহিনীর আক্রমণ আশংকায় তিনি সৈন্যদের একটি অংশকে মুনাজ ও কনৌজের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান নেয়ার নির্দেশ দেন।
