আমরা গজনী দখল করতে পারলে ওখান থেকে আরব পর্যন্ত আক্রমণের পথ খুলে যাবে। বলল কালিঞ্জরের মহারাজা। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে এ প্রতিজ্ঞা বদ্ধমূল হওয়া উচিত যে, বিশাল মহাভারতের স্বপ্ন আমাদের বাস্তবায়ন করতেই হবে। মহাভারতের সীমানা ফোরাত ও দজলা পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। এ কাজ আমরা না করতে পারলে আরব এলাকা খৃস্টানদের দখলে চলে যাবে। আমার কাছে খবর এসেছে, মুসলমান রাজারা একে অন্যের বিরুদ্ধে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। এর অন্তরালে প্রধান ভূমিকা রাখছে খৃষ্টান গোয়েন্দারা। তারা মুসলিম আমীর-উমারাকে সুন্দরী মেয়ে ও মদের টোপ গিলিয়ে ওদের অন্দর মহল পর্যন্ত নিজেদের কজায় নিয়ে নিয়েছে।
আমাদেরও এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। বলল রাজা জয়পাল। মুসলমানদেরকে আমাদের বুঝিয়ে দিতে হবে যে, যুদ্ধবিদ্যায় আমরা কত পারদর্শী। তবে এ মুহূর্তে আমাদের সৈনিকদের মধ্যে মুসলিম যোদ্ধাদের প্রতি প্রচণ্ড ভীতি রয়েছে। এরা মনে করে মুসলিম যোদ্ধারা দুঃসাহসী ও ভয়ঙ্কর। কখনো ওদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। এই ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে জনসাধারণের মাঝেও। তাই দ্রুত সুলতান সুবক্তগীনের সৈন্যদের পরাজিত করে আমাদের সৈন্য ও প্রজাদের মন থেকে এই আতঙ্ক দূর করতে হবে। গজনী আমাদের দখলে চলে আসলে ওখান থেকে আমরা খৃস্টানদের কৌশল অবলম্বন করে সহজে কাজ করতে পারব।
আমাদের মেয়েরা ইহুদী ও খৃস্টান মেয়েদের তুলনায় বেশি সুন্দরী ও মেধাবী। বলল কনৌজের মহারাজ। আমাদের শত্রুদের পরাস্ত করতে, দেব-দেবীদের আদর্শ প্রচার ও প্রসারিত করতে, সর্বোপরি আমাদের প্রধান শত্রু মুসলমানদের ধর্মকে বিকৃত করার কাজে হাজারো মেয়েকে আমরা বলি দিতে প্রস্তুত রয়েছি। আমাদের যে মেয়েরা স্বামীর মৃত্যুতে জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দিতে পারে তারা নিজের ধর্ম ও জাতির কল্যাণে জীবন দিতে মোটেও দ্বিধা
করবে না। বস্তুত এ কাজে জীবন দেয়ার দরকার হবে না, সম্ভ্রমের বিনিময়ে মুসলিম সৈনিক ও নেতাদের ভেড়া বানানোর খুবই সহজ কাজ। এটা আমাদের মেয়েরা সানন্দে করবে।
আমি একটি কুমারী বলিদান করছি। বলল জয়পাল। অন্য রাজারা রাজা জয়পালের পরাজয়ে ক্ষতিপূরণের দাবী না তুলে নতুন করে তারই নেতৃত্বে গজনী, আক্রমণের ফয়সালা করে চলে গেল। জয়পাল সুবক্তগীনের প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে রাতদিন নতুন সৈন্য সংগ্রহ, তাদের ট্রেনিং ও রসদ সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে গেল।
মন্দিরে মন্দিরে পণ্ডিতেরা সাধারণ মানুষকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উৎসাহিত ও ক্ষুব্ধ করে তুলতে বিরামহীন কাজ করে চললো।
আর এদিকে নিজেরা মুসলিম সুলতানকে ধ্বংসের আয়োজনে পুরোদমে লেগে পড়ল। গজনীর আশপাশে মুসলিম রাজারা একজোট হয়ে একের পর এক সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। অথচ যদি তিন লাখ হিন্দু বাহিনীর হাতে সুলতান সুবক্তগীন পরাজিত হতেন, তাহলে অন্য ছোট ছোট মুসলিম রাজ্যগুলো জয়পালের সৈন্য-স্রোতের মুখে খড়কুটোর মতো ভেসে যেতো। সুলতান শুধু নিজের অধিকৃত রাজ্যই রক্ষা করেননি, তিনি জীবনবাজি রেখে ইসলাম ও অন্যান্য ছোট ছোট রাজ্যের মুসলমানদের ঈমান, ইজ্জত, জীবন ও জমিন রক্ষা করেছেন। তবুও কেউ তার সহযোগী হল না। সবাই তার ওপর বিরূপ। তার ছেলে মাহমূদ একমাত্র তার সহযোগী।
সুলতান সুবক্তগীন হিন্দুস্তানের জায়গায় জায়গায় গড়ে তুলেছিলেন নিবিড় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। হিন্দু রাজা-মহারাজাদের মতিগতির খবর এরা তাকে খুব দ্রুত সরবরাহ করত। সুবক্তগীন এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন, জয়পাল আবার আক্রমণ করবে তার উপর। অবশ্য তিনি ধারণা করেছিলেন, এতো ক্ষয়ক্ষতি ও লোকবল হারিয়ে রাজা খুব তাড়াতাড়ি হামলা করার হয়তো সাহস পাবে না। এদিকে তার নিজের সৈন্যবাহিনীর অবস্থাও ছিল শোচনীয়। বিশাল বাহিনীকে অল্পসংখ্যক সৈন্য দিয়ে মোকাবেলা করতে গিয়ে তারও বহু জানবাজ যোদ্ধ। হারাতে হয়েছে। শুধু জয়পালের আক্রমণ আশঙ্কাই নয় আরো বহুবিধ সমস্যায় পতিত হয়েছিলেন সুবক্তগীন। প্রায় সকল প্রতিবেশী মুসলিম রাজা তার বিরুদ্ধে অস্ত্র শানাচ্ছিল। এই কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি দু’ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিলেন। সকল প্রতিবেশী মুসলিম রাজ্যে দূত পাঠালেন, তারা যেন সবাই হিন্দু আগ্রাসন মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। কিন্তু কেউ তার প্রস্তাবে সাড়া দিল না। সুলতান সুবক্তগীনের দ্বিতীয় পরিকল্পনা ছিল, পেশোয়ারের উত্তর-পশ্চিমের ছোট ছোট দুর্গগুলোর নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়া। তিনি সুনির্বাচিত ও দক্ষ কিছু সৈনিক নিয়ে এ অঞ্চলের আফগান ও খিলজী বংশজাত লোক অধ্যুষিত দুর্গগুলো দখল করে নেন। বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাদেরও যুদ্ধের জন্য প্রভাবিত করেন। আলেম-উলামার দ্বারা ইসলামের মাহাত্ম প্রচার করে এ অঞ্চলের সবাইকে ইসলামের পতাকা তলে সমবেত করতে সক্ষম হলেন।
আফগানী ও খিলজীদের নিজস্ব কোন সেনাবাহিনী ছিল না। তারা সুবক্তগীনের সাথে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করল এবং তাদের প্রচুর সংখ্যক যুবককে সুবক্তগীনের সেনাবাহিনীতে ভর্তি করাল।
এভাবে কেটে গেল আরো সময়। মাহমূদের বয়স এখন তেইশ বছর । সুলতান সুবক্তগীন তাকে খোরাসানের গভর্নর নিযুক্ত করলেন। তখন মুসলিম সালতানাতের অন্যান্য অংশে গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠল । বুখারার বাদশাহ আবুল মনসুরের ইন্তেকালে তার ছেলে নূহ মসনদে আসীন হলে ফায়েক নামক এক হাকিম বিদ্রোহ করল। নূহের সৈন্যরা সুলতান সুবক্তগীনের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানাল। সুলতান সুবক্তগীন নিজে নূহের সাথে দেখা করে তার জন্য সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলেন।
