পণ্ডিত গুহা থেকে বাইরে বের হয়ে মশালের হাতল মাটিতে গেড়ে দিয়ে তরবারীটি ছুঁড়ে ফেলে মাটিতে বসে পড়ল। পণ্ডিত যেন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, সালেহ আর তার উপর হামলা করবে না।
এখানে বসো, অনেকটা নির্দেশের ভঙিতেই সালেহকে বললো পণ্ডিত।
কাবুতে পেয়েও তুমি আমাকে কেন হত্যা করোনি? কেন আমাকে তুমি সাপের গুহায় গড়িয়ে পড়তে পিছু হটতেবাধ্য করেননি? বসতে বসতে সালেহ পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করল।
‘আমার দৃষ্টিতে হত্যা করার মতো কোন অপরাধ তুমি করোনি। বরং তোমার কর্তব্য পালন আমাকে মুগ্ধ করেছে’ বললো পুরোহিত। তুমি আমার মতোই কর্তব্যপরায়ণ এবং নিজ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তোমার মধ্যে লোভ-লালসা নেই। যুদ্ধ বিগ্রহকে আমি ঘৃণা করি। আমি ধর্মের সেবক বটে কিন্তু এক সময় আমি সৈনিক ছিলাম। এর প্রমাণ তুমি হাতে নাতে পেয়েছে। যে ভাবে তুমি আমাকে জব্ধ করতে চেয়েছিলে তা কোন সাধারণ লোকের পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব হতো না। ধনভাণ্ডারকে তুমি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে । এজন্য আমি তোমাকে পুরস্কৃত করতে চাই।
তুমি যদি আমাকে পুরস্কৃত করতেই চাও, তাহলে সেই জিনিস তুমি আমাকে দাও, যা আমি তোমার কাছে চাই, বললো সালেহ। তোমার এই ধনভাণ্ডার থেকে আমার কিছুই দরকার নেই।
কি চাও তুমি? জিজ্ঞেস করল পুরোহিত।
কনৌজে সৈন্যরা কোথায় সুলতান মাহমুদের সাথে মোকাবেলা করার পরিকল্পনা করেছে? তারা কি দুর্গবন্দী হয়ে লড়াই করবে, না দুর্গের বাইরে গিয়ে গযনী বাহিনীর মোকাবেলা করবে?
শোন দোস্ত! আমরা একে অন্যের শত্রু। আমাকে তুমি এমন কোন প্রশ্ন করো না যে প্রশ্নের জবাব দিলে আমার দেশ ও জাতির ক্ষতি হতে পারে এবং তাতে সুলতান মাহমূদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে পারে। তুমি একজন বিশ্বস্ত দেশ প্রেমিক। এজন্য আমি তোমাকে একটি জরুরী কথা বলে দিতে চাই। শোন বন্ধু! আমি যে কথা তোমাকে বলবা সেটি তোমার জন্যে বিরাট পুরস্কার। তুমি এখান থেকেই চলে যাও এবং ফিরে গিয়ে তোমার সুলতানকে বলো, তিনি যেন কনৌজের দিকে অগ্রসর না হোন। আমাদের মহারাজা প্রতীজ্ঞা করেছেন, কনৌজে এলে সুলতান মাহমূদকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারবেন এবং গঙ্গা যমুনার মধ্যবর্তী জায়গাটিকে তিনি গযনী বাহিনীর জন্যে কবরস্তানে পরিণত করবেন।
তোমাদের মহারাজার কাছে কি এমন শক্তিশালী সেনাবাহিনী আছে? পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলো সালেহ।
যদি কোন সেনাবাহিনী শত্রুকে সম্পূর্ণ ধবংস করার দৃঢ় সংকল্প করে তখন সে তার সামর্থ ও শক্তির দিকে তাকায় না। বললো পুরোহিত। পুরোহিত আরো বললো, কনৌজের প্রতিটি নারী শিশু পর্যন্ত গযনী সুলতানের উপর মূর্তি ও মন্দির ধ্বংসের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া। তাছাড়া কনৌজের মহারাজা শুধু একা নন, তার সাথে লাহোরের মহারাজা ভীমপালও রয়েছেন। তার সেনাবাহিনী এখানে পৌঁছে গেছে।
ভীমপাল এখন কোথায়? তার সৈন্যরাই বা কোথায়?
একথা আমি তোমাকে বলতে পারবো না দোস্ত বললো পুরোহিত। আমি তোমাকে যে কথাটা বলতে চাচ্ছি তুমি এখান থেকে ফিরে গিয়ে তোমার সুলতানকে সতর্ক করো। তাহলে তিনি হয়তো খুশী হয়ে তোমাকে পুরস্কৃত করবেন। তাকে বলল, এই জঙ্গলাকীর্ণ গোটা এলাকা জুড়ে তার জন্যে মৃত্যুর জাল বিছিয়ে রাখা হয়েছে, এই জাল ছিন্ন করে তিনি বেরিয়ে যেতে পারবেন না। এখানে এলে তার বাহিনীরও সেই অবস্থা হবে, তার বাহিনীর হাতে মহাবনের সৈন্যদের যে অবস্থা হয়েছিল। মহাবনের সৈন্যরা যমুনায় ডুবে মরেছিল, এখন গযনী বাহিনীকেও সেই নদীতেই ডুবে মরতে হবে। ভীমপালের সৈন্যরা ছাড়াও এখানে রয়েছে মথুরা বুলন্দ শহরও মহাবনের পালিয়ে আসা সৈন্যরা। এ সব ফেরারী সৈন্যদের সমন্বয়ে আরেকটি সেনা দল তৈরী করা হয়েছে। এরা সবাই প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে। এখানে এলে তোমাদের সুলতানের পক্ষের দুর্গ অবরোধ করা কোনভাবেই সম্ভব হবে না। ……।
দোস্ত! বাস্তবে সুলতান মাহমূদকে এখনো সাত্যিকার প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়নি। অথচ তার বাহিনী এখন কোন কঠিন মোকাবেলা করার উপযুক্ত নয়। আমাদের মহারাজারা তাকে সুযোগ দিয়েছেন, যাতে তিনি কনৌজের জালে এসে পা দেন। তিনি কিন্তু এই জালেই পা দিতে আসছেন। তাই তুমি দ্রুত ফিরে যাও এবং তাকে ফেরাও। তাকে গিয়ে বলো, অনর্থক মানুষের জীবন হানি ঘটানো এবং বিদেশে এনে নিজ দেশের সৈন্যদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়া থেকে তিনি যেন বিরত থাকেন। এখানে এসে জীবন্ত পুড়ে মরার চেয়ে গযনী গিযে রাজার বেশে মৃত্যুবরণ করাই শ্রেয়।
এ কথার পর তারা দু’জনই পাহাড়ের কাছেই সমতলে বেঁধে রাখা ঘোড়ার কাছে এলো। দুটি ঘোড়া পাশাপাশি বাধা ছিল। একটিতে সওয়ার হয়ে এসেছিল শকুন্তলা অপরটিতে এসেছিল পুরোহিত।
পুরোহিত সালেহকে একটি ঘোড়া দেখিয়ে বললো, এই ঘোড়াটি শুকুন্তলার। যে গর্তে তোমার সঙ্গীর সাথেই মরেছে। তুমি ওর ঘোড়াটি নিয়ে যাও।
রাতের পর দিনের প্রথম প্রহরে পুরোহিত মহারাজা রাজ্যপালের রাজপ্রাসাদে মহারাজার সামনে উপবিষ্ট। পুরোহিত মহারাজাকে জানালেন, তার অতি প্রিয় রাণী শকুন্তলাকে ধনভাণ্ডার গ্রাস করে ফেলেছে। পুরোহিত গত রাতের শকুন্তলা ও তার মধ্যকার ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনা মহারাজাকে বললেন। শকুন্তলার মৃত্যুর ঘটনা শুনেও রাজার মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না। মহারাজা এই ঘটনা শুনে স্মিত হাসলেন এবং পুরো ব্যাপারটি বুদ্ধিমত্তার সাথে সামাল দেয়ার জন্যে পুরোহিতকে ধন্যবাদ জানালেন।
