দোস্ত! তুমি এখনো যুবক! তুমি এই দুনিয়ার অনেক কিছুই দেখোনি। আমি অনেক কিছু দেখেছি। অনেক কিছু শুনেছি। আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে অনেক কিছু আছে। আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক সমৃদ্ধ। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় আমি বুঝতে পেরেছি যার ভেতরে ধনসম্পদের লোভ লালসা বাসা বাধে সে আর মানুষ থাকে না। এই গুহায় যে সাপগুলো রয়েছে মনে করতে পারো এগুলো মানুষের পাপের ফসল। সাপের একটি দিক হলো লোভ, অপর দিকটি হলো লালসা। আর তৃতীয় আরেকটি দিক আছে যাকে বলা হয় খ্যাতি। প্রতিটি পাপই একটি সাপ। এ সাপগুলো মানুষের পায়ের নীচেই গড়াগড়ি করে। ধর্ম কর্ম ত্যাগ করে ধনসম্পদ পেয়ে যদি মানুষ সব কিছু পেয়ে গেছে বলে উল্লাসিত হয় এবং মনে মনে যদি ভাবে আমি পৃথিবী জয় করে ফেলেছি, তাহলে তার বিবেক অন্ধ হয়ে যায়। বিবেকের অন্ধত্বের কারণে একটু ইঙ্গিতেই
সে এ ধরনের সাপের গুহায় গিয়ে স্বেচ্ছায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আর তার অতি লোভ তার জীবনকেই কেড়ে নেয়। দোস্ত! আমিও ইচ্ছা করলে এই ধনভাণ্ডার হাতিয়ে নিতে পারতাম। আমি ছাড়া আর কেউ এই ধনভাণ্ডারের খবর জানে না। এই ধনভাণ্ডারের যে প্রকৃত মালিক সেই জানে না, ধনভাণ্ডার কোথায় রাখা হয়েছে। কিন্তু যে দিন থেকে এই ধনভাণ্ডার হেফাযতের দায়িত্ব আমার উপর এসেছে আমি পথ ভ্রষ্ট হওয়ার আশংকায় সারারাত পূর্জা অর্চনা করে কাটিয়েছি।
তোমার ধর্ম সত্য হলে এই ধনরাজী তোমাকে বিভ্রান্ত করতে পারতো না বললো সালেহ। আমাকে দেখ না। তুমি আমাকে বলেই দিয়েছো, সাপের গুহার উপরে কোন পাটাতন রেখে গর্ত পেরিয়ে গেলেই ধনভাণ্ডার পাওয়া যাবে। কিন্তু তাতেও এই ধনভাণ্ডারের প্রতি আমি মোটেও আগ্রহবোধ করছি না। আমি আমার কর্তব্য পালনের ব্যাপারেই চিন্তা করছি। সালেহ পুরোহিত আরো বললো, আমার একটি কথা মন দিয়ে শোন পণ্ডিত! তোমাকে দিয়ে আমি আমার কর্তব্য কর্ম পূর্ণ করতে চাই। আমি পবিত্র কুরআন হাতে নিয়ে শপথ করেছি, কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আমি জীবন বিলিয়ে দেবো, কখনো কোন লোভ লালসার শিকার হবো না। এখন তোমার প্রাণ আমার হাতে তুমি যদি আমার প্রশ্নের জবাব না দাও, তাহলে বাধ্য হয়েই আমি তোমাকে সাপের গুহায় নিক্ষেপ করবো।
তুমি কি নিজেকে এতোটাই বুদ্ধিমান মনে করো? এই বলে তীর্যক দৃষ্টিতে সালেহর দিকে তাকিয়ে বললো পুরোহিত,
পুরোহিতের কথায় সালেহ হেসে ফেললো। পরক্ষণেই তার হাসি মিলিয়ে গেল পুরোহিতের চেহারায় বিস্ময়কর আত্মবিশ্বাস দেখে। কারণ, পুরোহিত এক হাতে মশাশল নিয়ে নিয়েছে এবং অপর হাতে তরবারী। পুরোহিতের হাতের মশালের হাতল ছিল তরবারীর চেয়েও অনেক দীর্ঘ। পুরোহিত হঠাৎ এমন দ্রুত উঠে গেল যে, সালেহ তার অবস্থান থেকে নড়তেই পারল না।
এবারে পুরোহিত সালেহকে হুমকি দিল, তোমার হাতেও তরবারী আছে এবার এসো, তুমি তোমার কর্তব্য পালন কর, আর আমি আমার কর্তব্য পালন করি।
সালেহ যখন তরবারী উঠিয়ে পুরোহিতের দিকে অগ্রসর হলো, তখন পুরোহিত দীর্ঘ হাতলধারী জ্বলন্ত মশাল দিয়ে সালেহর চেহারায় আঘাত করল এবং সালেহর চেহারা ঝলসে গেল এবং তার দু’চোখে অন্ধকার নেমে এলো। এবার পুরোহিত চিৎকার দিয়ে বললো, পারলে আমার আঘাত থেকে প্রাণ বাঁচাও।
পুরোহিতের চিৎকার শুনে সালেহ লাফ দিয়ে সেখান থেকে সরে গেল।
পুরোহিত আবারো হুমকি দিয়ে বললো, আমি তোমাকে মোকাবেলা করার পূর্ণ সুযোগ দেবো তুমি তোমার কর্তব্য পালন করতে পার।
সালেহ কৌশল বদল করে পুরোহিতের উপর আঘাত করতে চেষ্টা করছিল কিন্তু প্রতিবারই পুরোহিত মশাল দিয়ে সালেহের আঘাত ঠেকিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু পুরোহিত সালেহর উপর কোন আঘাত হানল না। সালেহ একের পর এক আঘাতের চেষ্টা করে হাফিয়ে উঠলো। সালেহর কয়েকটি আঘাত গর্তের দেয়ালে গিয়ে আঘাত করল। এক পর্যায়ে পুরোহিত এক হাতে মশাল ও অন্য হাতে তরবারী নিয়ে সালেহর উপর প্রচণ্ড আক্রমণ করতে শুরু করল। সালেহ পুরোহিতের প্রতিটি আঘাতই তরবারী দিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু পুরোহিতের প্রচণ্ড এক আঘাতে সালেহর তরবারী হাত থেকে দূরে ছিটকে পড়ল। এবার পুরোহিতের মশালের উত্তাপের চাপে সে পিছু হটতে লাগল । যেই সালেহ পিছিয়ে গিয়ে তরবারী উঠাতে চাইল, তখন পুরোহিত তরবারী দিয়ে তার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করল। এবার বাঁচার জন্যে সালেহ বসে গেল। এবার পুরোহিত মশাল দিয়ে সালেহর চেহারায় আঘাত করতে চাইলে সে বসে বসেই আরো পেছনে সরে গেল এবং বসে বসেই পিছনের দিকে সরতে লাগল। পেছন ফিরে সালেহর পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল না যে, সে সাপের গুহার পাড়ে চলে এসেছে।
এবার পুরোহিত তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, দেখে নাও, তুমি এখন কোথায় এসে পৌঁছেছে। তোমার পেছনেও মরণ আগেও মরণ। বলো, বাঁচতে চাও না মরতে চাও।
মরণে আপত্তি নেই, বললো সালেহ। কারণ, আমি ধনরত্নের লোভে মরছি না। কর্তব্য পালন করতে গিয়ে মরছি। এসো, আঘাত করো পণ্ডিত। মরতে মরতেও লড়ে যাবো।
তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে পণ্ডিত বললো, না তোমার মরার দরকার নেই, বাইরে বেরিয়ে এসো। একথা বলে পুরোহিত মশাল নিয়ে গুহার বাইরে বেরিয়ে এলো।
রণক্লান্ত বিধ্বস্ত পরাজিতের মতোই গুহার বাইরে বেরিয়ে এলো সালেহ।
