পুরোহিত তরবারী উঠিয়ে নিয়ে তালালের তরবারীর পাশে বিদ্ধ করে তালালকে বললো, এখন তরবারী দুটো আরো ডানদিকে দাবিয়ে দাও।
উভয় তরবারী যখন ডান দিকে দাবিয়ে দিল, তখন মাটির একটি চাকার মতো ধীরে ধীরে সরে আসতে শুরু করল। এখানে নিশ্চয় আলগা মাটির কোন দেয়াল আছে। তালাল মাটির দেয়ালটিকে শক্ত করে টান দিলে সেটি গড়িয়ে পড়ে গেল এবং একটি সুড়ং এর মতো ফাঁকা জায়গা বেরিয়ে এলো।
রাণী! তুমি এই সুড়ং পথে ঢুকে পড়ে। রাণীর উদ্দেশ্যে একথা বলে পুরোহিত তালালের উদ্দেশ্যে বললো
তুমিও এর মধ্যে প্রবেশ কর। আমি মশাল নিয়ে তোমার পেছনে পেছনে আসছি।
সালেহর দিকে তাকিয়ে পুরোহিত বললো, তুমি! তুমি কি ভেতরে যাবে?সালেহ মাথা নেড়ে বললো–
না, আমি ঢুকবো না।
সালেহর অনাগ্রহ দেখে পুরোহিতের ঠোঁটের কোণায় স্মিত হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
রাণী শকুন্তলা, পুরোহিতের কথা শোনেই মাথা নীচু করে সুড়ং এর মধ্যে ঢুকে পড়ল। তার পিছু পিছু তালালও প্রবেশ করল। পুরোহিত তাদের উদ্দেশে বললো, অন্ধকার দেখে তোমরা ভয় করো না।
সালেহ দাঁড়িয়ে থেকে ভাবছিল, পুরোহিত হয়তো মশাল নিয়ে ওদের পিছু পিছু যাবে। কিন্তু ওরা ভেতরে প্রবেশ করার পর পুরোহিত মশালের দিকে ভ্রূক্ষেপই করল না।
একটু পরেই সুড়ং এর ভেতর থেকে কোন কিছু পিছলে পড়ার শব্দ শোনা গেল। এরপর দুবার ধমকের আওয়াজ শোনা গেল। এরই মধ্যে কানে ভেসে এলো শকুন্তলার ক্ষীণ চিৎকার। এ সময় পুরোহিত আড় চোখে সালেহর দিকে তাকাল। পুরোহিতের ঠোঁটের স্মিত হাসি তখন আরো প্রলম্বিত হয়েছে।
ততক্ষণে সুড়ং এর ভেতরে শোনা গেল তালালের চিৎকার।
সালেহ ভাই! আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করো।
তালালের চিৎকার শুনে কোন বিপদ মনে করে সালেহ সুড়ং এর ভেতরের দিকে দৌড় দিতে চাচ্ছিল ঠিক তখনই পুরোহিত তার পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে বলল–
তুমি বলেছিলে এ সব ধনভাণ্ডারে প্রতি তোমার কোন আগ্রহ নেই। তাই তুমি এখানেই থাকো। তোমার মতো মানুষের বেচে থাকার দরকার আছে।
সুড়ং এর ভেতর থেকে ক্রমান্বয়ে শকুন্তলা ও তালালের আর্তচিৎকার আরো প্রকট ভাবে আসতে লাগল। চিৎকার শুনে মনে হচ্ছিল তারা সুড়ং এর মধ্যে কোন গভীর গর্তে পড়ে গেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় সালেহ করণীয় কি বুঝে উঠতে পারছিল না। সে এটাও বুঝতে পারছিল না আসলে ভেতরে ওরা কেন চিৎকার করছে। সে নীরবে পুরোহিতের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিল। কিছুক্ষণ পর সালেহ পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করল, ওরা ভেতরে চিৎকার করছে কেন? পুরোহিত জ্বলন্ত মশাল হাতে নিয়ে সালেহকে বললো,
তুমি আমার পেছনে পেছনে এসো। তোমাকে চিৎকারের কারণ দেখাচ্ছি।
পুরোহিত মশাল নিয়ে আগে আগে সুড়ং পথে প্রবেশ করল। সালেহ পুরোহিতকে অনুসরণ করল। পনেরো বিশ কদম অগ্রসর হয়ে পুরোহিত থেমে গেল এবং সালেহর উদ্দেশ্যে বলল, তুমি আমার পাশে এসে দাঁড়াও! সাবধান সামনে অগ্রসর হবে না।
পুরোহিত এবার হাতের মশালটিকে নীচের দিকে তাক করাল। সালেহ উঁকি দিয়ে দেখতে পেল, সামনে একটি গভীর কূপ। সেই গভীর কূপ থেকে শকুন্তলা ও তালালের আর্তচিৎকতার ভেসে আসছে। ততক্ষণে তাদের আর্তচিৎকার অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
পুরোহিত সালেহর উদ্দেশ্যে বলল, চলো, এবার এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। উভয়েই যখন সুড়ং এর ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো, তখন পুরোহিত মাটিতে ক্লান্তিতে বসে পড়ল এবং সালেহর উদ্দেশে বলল, এসো, এখানে বসো। এখন বন্ধুর মতো তোমাকে আমি দুটি কথা বলবো।
সালেহ পুরোহিতের কাছে জানতে চাইলো, আগে আমাকে বলো, যা দেখলাম, তা আসলে কি? তুমি তো তাদেরকে ধনভাণ্ডার দেখতে পাঠিয়ে ছিলে?
আরে দোস্ত! আগে বলো, তোমার পরিচয় কি? সালেহকে জিজ্ঞেস করলো পুরোহিত। তুমি যদি পরিচয় দিতে না চাও। তবে আমি তোমার পরিচয় বলে দিতে পারি। আসলে তুমি মুসলমান। অবশ্য মুসলমান হলেও তুমি হিন্দুস্তানী মুসলমান। তবে তোমরা উভয়েই গযনী বাহিনীর গোয়েন্দা। কি? আমি ঠিক বলিনি?
হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছে। পুরোহিতের কথায় সায় দিলো সালেহ। কিন্তু আগে আমার প্রশ্নের জবাব দাও।
যে গভীর কুপ তুমি দেখেছে, এই কূপের মধ্যে হিন্দুস্তানের সবচেয়ে ভয়ংকর বিষাক্ত সাপ রয়েছে। যে সাপে এদের ধ্বংস করেছে।
এ গর্ত আমি খুঁড়েছি এবং এর মধ্যে সাপও আমিই রেখেছি। গর্তের উপড়ে খড়কুটা বিছিয়ে তাতে মাটির আবরণ দিয়েছি। এরা সাথে মশাল নিয়ে গেলেও বুঝতে পারতো না, মাটির নীচে গভীর গর্ত রয়েছে, আর সেই গর্তে অপেক্ষা করছে ওদের মরণ! বললো, পুরোহিত।
তাহলে ধনভাণ্ডার কোথায় রেখেছো? পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলো সালেহ।
ওখানেই আছে, তবে ধনভাণ্ডারে যেতে হলে গুহার উপরে কোন পাটাতন রেখে সেটি পেরিয়ে যেতে হবে। অবশ্য এছাড়াও নিরাপদ আরেকটি পথ আছে।
যাক আমাকে আর সেই পথের কথা বলোনা, পুরোহিতকে থামিয়ে দিল সালেহ। তাহলে হয়তো আমিও কর্তব্য ভুলে পথচ্যুত হয়ে যাবো।
অচেনা বন্ধু! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোন। তোমাকে আমি মূল্যবান তথ্য দিচ্ছি। কারণ, তোমার মধ্যে আমি ধনসম্পদের লোভ দেখিনি। লোকে বলে যেখানে ধনরত্ম লুকানো থাকে সেখানে নাকি অবশ্যই সাপ বিচ্ছু থাকে। যে সাপ বিচ্ছ ধনরত্মকে পাহারা দেয়। কথাটি মোটেও সত্য নয়। লোকেরা এও বলে, গুপ্তধন বিষাক্ত সাপের মতো বিষাক্ত হয়ে থাকে। কেউ যদি গুপ্তধন পেয়েও যায় তবে সাপে পরিণত হয়। একথার কারণ হলো, কেউ যাতে গুপ্তধন ছিনিয়ে নেয়ার সাহস না করে।….
