হ্যাঁ, এখানে ধনভাণ্ডার লুকানো রয়েছে। সে যা বলেছে তাই সত্য। বললেন পুরোহিত।
এই পাহাড়ে ধনভাণ্ডার কোত্থেকে এলো। আর তোমাদের পরিচয় কি? জানতে চাইলো তালাল।
আমি কনৌজের প্রধান মন্দিরের প্রদান পুরোহিত। আর সে কনৌজ রাজার স্ত্রী রাণী। তোমরা যদি পুরস্কার নিতে চাও, তবে আমি তোমাদের পুরস্কার দিয়ে দেবো। কিন্তু তোমাদেরকে পুরস্কার নিয়ে এখান থেকে চলে যেতে হবে। তালালের উদ্দেশ্যে বললো পুরোহিত।
চলে যাবো না থাকবো সেটা আমরা ভেবে দেখবো। এর আগে বলো ধনভাণ্ডার কোথায়? পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলো তালাল। এসো। বলে রাণী শকুন্তলা তালালের বাজু ধরে তাকে নিয়ে গুহার কাছে চলে গেল এবং বললো, আমি তোমাকে ধনভাণ্ডার দেখিয়ে দিচ্ছি।
শকুন্তলার আহ্বানে তালাল তার সঙ্গে চলে গেল। সালেহ তাকে বাধা দিল কিন্তু তালাল বাধা মানল না। সালেহ তখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সে কি করবে। সে তালালের অনুসরণও করতে পারছে না, আবার পুরোহিতকেও ছেড়ে যেতে পারছে না। কারণ, পুরোহিতকে ছেড়ে দিলে সে হয়তো তার অন্য লোকদের ডেকে নিয়ে আসতে পারে। এদিকে শকুন্তলার মতো সুন্দরী নারীর সাথে তালালের চলে যাওয়াটাকেও সে মেনে নিতে চাচ্ছে না। কিংকর্তব্য বিমূঢ় অবস্থায় সালেহ হাতের তরবারী উঠিয়ে পুরোহিতের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সালেহ আশংকা করছিল, তালাল জীবিত ফিরে এলেও এই সুন্দরী নারীর কুপ্রভাব তার উপর পড়বেই পড়বে।
শকুন্তলা ও তালাল কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো। তালালের চেহারা ও তার ভাবভঙ্গিই বলে দিচ্ছিল, সে আর গযনী বাহিনীর দৃঢ়চেতা কর্তব্য পরায়ন গোয়েন্দা নয়; সে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন তালাল।
তালাল এসেই পুরোহিতকে বললো, সে যেন বলে দেয় আসলে ধণভাণ্ডার কোথায় আছে?
এ সময় সালেহ হুংকার দিয়ে বললো; তালাল! বেরিয়ে এসো ওখান থেকে।
তালাল সালেহ’র দিকে একবার তাকিয়ে পুরোহিত ও শকুন্তলার দিকে তাকিয়ে বললো, তোমরা দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে বসো। এর পর তালাল সালেহকে ওখান থেকে একটু দূরে নিয়ে বললো,
সালেহ ভাই! আমার কথাটি মনোযোগ দিয়ে শোন। আমি মোটেও কর্তব্য ভুলে যাইনি এবং কর্তব্য পালনে কোনরূপ অবহেলা করছি না। আমি তোমাকে ধোকা দিচ্ছি না। এখান থেকে আমরা দুজনে যদি কিছু নিয়ে নেই তাতে ক্ষতি কি?
তালাল! তোমার শরীর থেকে আমি এই মহিলার দুর্গন্ধ পাচ্ছি, সেই সাথে তোমাকে অপবিত্র মনে হচ্ছে। নারীর সবচেয়ে বড় শক্তিই হচ্ছে তার নারীত্ব আর পুরুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তার পৌরুষত্ব। আমার তখনই সন্দেহ হচ্ছিল ওই মহিলা তোমাকে কোন মন্দ উদ্দেশ্যে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। তুমি দাবি করছে, আমাকে তুমি কোনরূপ ধোকা দিচ্ছে না।……..
কিন্তু আমি মনে করছি এই নারী ও গুপ্তধন তোমার ও আমার মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে কেন্দ্র করে তুমি ও আমি এক সময় একে অন্যের প্রতিপক্ষে পরিণত হতে পারি। তোমার ভুলে যাওয়া উচিত নয়, সুলতান মাহমূদের জয় পরাজয় তোমার ও আমার কর্তব্য পালনের উপরই নির্ভর করে।
সালেহ ভাই! আমার কথাটি একটু শোন। আমরা হিন্দুস্তানের মানুষ। গযনীর লোকেরা আমাদের কি দেয়? গযনী সেনাবাহিনীর কাছ থেকে আমরা যে সামান্য পারিশ্রমিক পাই, মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে এই জটিল কাজের এতটুকু বিনিময় কি যথেষ্ট।
যে দায়িত্ব আমরা কাঁধে তুলে নিয়েছি, এর প্রতিদান দেবেন মহান আল্লাহ। তালাল! তুমি কেন নিজেক গযনী সেনাদের কর্মচারী মনে করছে। আমরা গযনী বাহিনীর কর্মচারী নই; ইসলামের সৈনিক।
সালেহ ভাই! হাতের কাছে এতো বিপুল সম্পদ পেয়েও তা ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না।
নিজের লক্ষ্যের কথাটি একবার স্মরণ করো তালাল। আমরা কুরআন শরীফ হাতে নিয়ে শপথ করে ছিলাম কর্তব্য পালনে প্রয়োজনে জীবন বিলিয়ে দেবো। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে ধোকা দেবো না। আমরা শপথ করেছিলাম, আমাদের পায়ের নীচে যদি স্বর্ণমুদ্রার স্তূপ ঢেরে দেয়া হয় তবুও সেদিকে তাকাবো না। সর্ববস্থায় নিজের ঈমানকে রক্ষা করবো। প্রিয় তালাল! কখন কার মৃত্যু এসে যায় বলা যায় না। এমনও হতে পারে ঈমানের বিপরীতে এই সম্পদ জীবনে ভোগ করার সময়ই পাওয়া যাবে না, এর আগেই মৃত্যু এসে যাবে।
ঠিক আছে সালেহ ভাই! আমাকে সময় মতো পরীক্ষা করে নিও। এখন তুমি একটু এখানে দাঁড়াও, আমাকে ওখান থেকে কিছু নিয়ে আসার সুযোগ দাও। এই বলে তালাল সালেহর কথায় প্রক্ষেপ না করেই আবার পুরোহিতের কাছে চলে গেল।
তালাল পুরোহিতকে বললো, আমাকে ধনভাণ্ডারের কাছে নিয়ে চলো।
হ্যাঁ, পণ্ডিত মহারাজ! এখন আর আমাদের অপেক্ষা করার সময় নেই। চলুন! তালালের সুরে সুর মিলিয়ে শকুন্তলাও পুরোহিতকে ধনভাণ্ডার দেখিয়ে দেয়ার তাগাদা দিল।
পুরোহিত বসা অবস্থা থেকে দাঁড়িয়ে ফাঁকা দেয়ালের এক জায়গায় আঙুল রেখে তালাল ও সালেহর উদ্দেশ্যে বললো, তোমরা উভয়েই তোমাদের তরবারী বর্শার মতো করে এখানে আঘাত করো।
পুরোহিতের কথায় সালেহ কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সে ঠায় নির্বিকার দাঁড়িয়ে রইল। তালাল অগ্রসর হয়ে সেখানে তরবারী দিয়ে আঘাত করলে তরবারী অর্ধেকেরও বেশী সেখানে দেবে গেল। এবার তালাল সালেহকে আসার জন্যে ডাকল। কিন্তু সালেহ বললো, তোমাদের এই ধনভাণ্ডারের প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। সালেহ তরবারী তালালের দিকে নিক্ষেপ করে বললো, এই নাও তরবারী। যা করার তুমিই করো।
