হতভাগার দল। সেনাবাহিনীর সাথে এদের কোন সম্পর্ক নেই। বললো সালেহ। আগন্তুক অশ্বরোহী কৃয়ার মতো পাহাড়ের গুহার কাছে এসে থামল এবং এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিয়ে ফাঁকা জায়গায় প্রবেশ করল । আগন্তুকের একজন ছিল পুরোহিত আর অপরজন রাজ্যপালের কনিষ্ঠা স্ত্রী রাণী শকুন্তলা।
তারা উভয়েই ফাঁকা জায়গার ভেতরে গিয়ে দরজার মতো ফাঁকা জায়গা দিয়ে ভেতরে ঢুকল।
সালেহ ভাই! আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, চলো না ব্যাপারটি কি দেখে আসি, বললো তালাল।
এটা দেখার কি আছে। স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছো, একজন নারী আর একজন পুরুষ। নারী লোকটিকে দেখে মনে হচ্ছে সে কোন সাধারণ মহিলা নয় কোন শাহজাদী হবে হয়তো। জবাব দিল সালেহ।
রাতের এই আগন্তুক নারী কিংবা পুরোহিত কারো প্রতি সালেহর কোন আকর্ষন ছিল না। কিন্তু তালালের মন কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিল না। সে সালেহর কথার তোয়াক্কা না করে হঠাৎ করে দৌড়ে নীচে নেমে গেল। সালেহ তাকে আটকাতে পারল না। বাধ্য হয়ে সেও নীচে নেমে এলো।
তারা উভয়েই তাদের পরিধেয় কাপড়ের নীচে একটি করে খঞ্জর ও তরবারী লুকিয়ে রাখতো। উভয়েই তরবারী বের করে অত্যন্ত সন্তর্পনে কাদা পানির কিনারা দিয়ে গুহার একেবারে দরজার মতো ফাঁকা জায়গাটির কাছে। চলে গেল।
পুরোহিতের হাতে রাখা প্রজ্জ্বলিত মশাল গুহার ভেতর থেকে বাইরে কিঞ্চিত আলো বিকিরণ করছিলো। পুরেহিত ও শকুন্তলা কেউই কল্পনা করতে পারেনি, এই গভীর রাতে এখানে তারা দু’জন ছাড়া আর কোন মানুষের অস্তিত্ব থাকতে পারে। পুরোহিত ও শকুন্তলা পরস্পর যে কথাবার্তা বলছিল তালাল ও সালেহ গর্তের বাইরে থেকে তা পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিল।
রানী। এখানেই ধনভাণ্ডার রাখা হয়েছে। আমি আপনাকে আবারো অনুরোধ করছি, আপনি এই লোভে না পড়ে চলে যান। শকুন্তলার উদ্দেশ্যে বললো পুরোহিত।
এখানে তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না, বললো শকুন্তলা। কি ব্যাপারে? ধনভাণ্ডার কি এই বিছানার নীচে? জিজ্ঞেস করলো শকুন্তলা।
শুনুন রানী! এখন আমি ইচ্ছা করলে আপনাকে হত্যা করতে পারি। আপনি আমাকে হত্যার হুমকি দিয়ে ছিলেন এবং আমাকে কঠোর শাস্তির ভয় দেখিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি আমি আপনাকে হত্যা করি, তাহলে বলেন কে আমার হাত থেকে আপনাকে বাঁচাবে? আপনাকে আমি হত্যা করে মরদেহ এমন জায়গায় লুকিয়ে ফেলতে পারি, শতবার তালাশ করেও আপনার মরদেহের কোন চিহ্ন কেউ খুঁজে পাবে না।
খবরদার পণ্ডিত মশায়! হুমকির সুরে বললো রাণী। মনে করবেন না এই নির্জনে আপনি আমাকে অবলা নারী ভেবে প্রতিশোধ নিয়ে নেবেন। পণ্ডিতজী মহারাজ! আমি আবারো আপনাকে বলছি, নিজেকে ধোকায় ফেলবেন না।
মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও রাণী! যদি কাউকে ডাকার প্রয়োজন হয় তবে খুব জোরে চিৎকার করতে পারো, তবে কোন লাভ হবে না।
দোহাই পণ্ডিতজী মহারাজ! খঞ্জর বের করবেন না। দয়া করে আমার একটি কথা শুনুন। হাত দরাজ করে প্রার্থনার সুরে বললো শকুন্তলা।
এ সময় গুহার ভেতর থেকে ধস্তাধস্তি ও অস্বাভাবিক কিছু আওয়াজ শোন গেলো। পুরোহিত শকুন্তলার উপর আক্রমণ করছিলো আর শকুন্তলা বাঁচার জন্যে চেষ্টা করছিলো এবং পুরোহিতের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যে শকুন্তলা গুহার ফাঁকা জায়গায় দৌড়াচ্ছিলো।
পলায়নপর শকুন্তলাকে ধরার জন্যে পুরোহিত ছুটাছুটি করছিলো। জ্বলন্ত মশালটি তখন এক জায়গায় মাটিতে গেড়ে দেয়া হয়েছিল। বড় একটি ঘরের মতো গুহাটি ছিল মশালের আলোয় আলোকিত।
পুরোহিত শকুন্তলাকে দৌড়াতে দৌড়াতে এক পর্যায়ে গুহায় প্রবেশ পথের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। এদিকে শকুন্তলাও পালানোর জন্যে গুহার প্রবেশ মুখের দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে থেমে গেল। তারা উভয়েই দেখতে পেল ভবঘুরে বেদুঈনের বেশে ময়লা ছেঁড়া পোশাকের দুটি লোক খোলা তরবারী নিয়ে গুহা দাঁড়ানো।
অবস্থা দেখে পুরোহিত ও শকুন্তলা উভয়েরই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। এদিকে তালাল সালেহ ও নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। কোন কথা বলছিল না।
নিজেকে সামলে নিয়ে খুবই দৃঢ়তা ও গম্ভীর কণ্ঠে পুরোহিত বললেন, কে তোমরা? এখানে কিসের জন্য দাঁড়িয়ে আছো? চলে যাও এখান থেকে। এখানে আমাদের অনেক লোক আছে। ওরা এলে তোমাদের টুকরোও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
হাতের খঞ্জর ফেলে দাও, দৃঢ় অথচ সহজ গলায় বললো তালাল। খঞ্জর ফেলে দিয়ে উভয়েই আমাদের সামনে এসো। এখানে তোমরা কি করছো, কি আছে এখানে?
পুরোহিত স্মিত হেসে বললেন, আমরা মুসাফির। আমরা কনৌজ যাবো। এই মহিলা আমার বিবি। বাইরে আমাদের ঘোড়া দাঁড়ানো রয়েছে। রাতটা কাটানোর জন্যে আমরা এখানে যাত্রা বিরতি করেছি।
সালেহ নীরবে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। তালাল কিছুটা অগ্রসর হয়ে এক ঝটকায় পুরোহিতের হাত থেকে খঞ্জরটা ছিনিয়ে নিয়ে তার তরবারীর আগা পুরোহিতের ঘাড়ে ঠেকিয়ে বললো
জীবন বাঁচাতে চাও তো সত্য বলো, এখানে কি আছে? ইচ্ছা করলে আমরাও তা খুঁজে দেখতে পারি, কিন্তু তখন আর তুমি বেঁচে থাকবে না এবং এই নারী থাকবে আমাদের দখলে। তালাল শকুন্তলার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি কি বলছি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো। অতএব পরিণতি কি হতে পারে একটু চিন্তা কর।
এখানে ধনভাণ্ডার আছে। তোমরা যা চাও, তাই আমি তোমাদের দিয়ে দেবো। তোমরা তা নিয়ে চলে যাবে। বললো শকুন্তলা।
