ধনভাণ্ডার নিয়ে যাওয়ার জন্যে তো বহু লোকের দরকার। এই বিশাল কাজ কি এতোটা কম সময়ে এমন গোপনে করা সম্ভব?
আজ আমি শুধু ধনভাণ্ডার দেখে আসবো, এর পর বাকী কাজ গোপনেই করবো আমি। তা কিভাবে করবো, সে চিন্তা আমার। সেই কাজে আপনাকে আমি সঙ্গেই রাখবো। আপনার সাথে আমি প্রতারণা করবো না।
পুরোহিত উঠে দাঁড়াল।
* * *
তালাল ইবরাহীম সেই রাতটি পাহাড়ের ঢালেই কাটাল। সকাল বেলা তালাল সালেহকে বললো, সে পাহাড়ের সেই গুহাটা দেখতে চায়। কিন্তু সালেহ বললো, সবার আগে সে সেই কাজ করতে চায়, যে জন্যে তাদেরকে এখানে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তালাল গুহায় যাওয়ার জন্যে জিদ ধরল। শেষ পর্যন্ত তালালের জেদই বিজয়ী হলো। পুরোহিত যে পাহাড়ী গুহায় চোখ বাধা লোকদের নিয়ে গিয়েছিল। দিনের আলোয় সেই জায়গাটি ভূতুড়ে দেখাচ্ছিল। গুহার কাছের পাহাড়ী ঢালটি ছিল অবাক করার মতো। ঢালের উপরের অংশটি ছিল খাড়া দেয়ালের মতো। চতুর্দিকে যেন পরিকল্পিত খাড়া দেয়াল। দেয়ালের উপরে নানা গাছ গাছালী ও ঝোঁপ ঝাড়। ঝোঁপ ঝাড়ের লতাপাতাগুলো খাড়া হয়ে উপড়ের দিকে না উঠে গর্তের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। ফলে গুহার দিকে ছায়া পড়ে জায়গাটি একটি পরিত্যাক্ত কুয়ার মতো দেখাচ্ছে।
তালাল ও সালেহ গুহার ভেতরে চলে গেল। বাস্তবেও যেন এটি একটি কুয়া। যা প্রাকৃতিক ভাবে পাহাড়ের ভেতরে তৈরী হয়ে রয়েছে। কুয়ার মতো জায়গাটিতে কিছু পানি ছিল কিন্তু সেখানে পানির চেয়ে কাদাই বেশী। কূয়ার পাড় দিয়ে চলাচলের জন্যে কিছুটা শুকনো মাটির তৈরী পথের মতো ছিল। তালাল ও সালেহ সেই পথ দিয়ে আরো অগ্রসর হলো। কিছুটা অগ্রসর হয়ে তারা দেখতে পেল এটি মাটির তৈরী টিলার মতো। পুরোহিতের লোকেরা এই টিলার আড়ালেই হারিয়ে গিয়েছিল।
উভয়েই মাটির টিলার উপর উঠে দেখল, টিলার ঢালুতে একটি দরজার মতো। দরজাটি ঝুলন্ত লতাপাতা ও গাছ গাছালীতে প্রায় ঢাকা রয়েছে। তারা সেই দরজার মতো জায়গা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখতে পেল কক্ষের মতো একটি জায়গা। তাতে যে কোন মানুষ খাড়া হয়ে প্রবেশ করতে পারবে। ঘর সদৃশ জায়গাটি ছিল অন্ধকার। অন্ধকার ঘরের মতো জায়গাটিতে উভয়েই হাতড়ে হাতড়ে গুপ্তধন তালশ করল কিন্তু মাটি পাথরের অস্তিত্ব ছাড়া তাদের হাতে আর কোন জিনিসের অস্তিত্ব ধরা পড়ল না।
এই ঘরের মধ্যেই একটি গুহার মতো সুড়ং দেখতে পেল তারা। সুড়ং পথটি এতোটাই অন্ধকার যে সেখানে কি রয়েছে তা আন্দাজ করা অসম্ভব। অনেক্ষণ এখানে কাটানোর পর সালেহ বিরক্ত হয়ে তালালকে বললো, তুমি যদি এখানে থাকতে চাও তো থাকো, আমি চললাম।
ক্ষুব্ধ সালেহকে আর বিরক্ত না করে তালালও একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও সালেহর অনুগামী হলো। কিন্তু বার বার সে পিছনে ফিরে ফিরে গুহাটি দেখছিল। তালালের অবস্থা দেখে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছিল, কর্তব্য পালনের কথা বেমালুম ভুলে গেছে। বনের এই কোনটি ছিল অনেকটা ভূতুড়ে এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। সালেহ তালালকে নিয়ে প্রায় চারপাঁচ মাইল দূরে চলে এলো এবং সেখানে একটি পাহাড়ের উপড়ে উঠে দাঁড়ালো। এখান থেকে তারা কন্নৌজ দুর্গের ভেতরকার অবস্থা পরিস্কার দেখতে পাওয়া যায়। দীর্ঘক্ষণ তারা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে কনৌজ দুর্গ ও শহরে সৈন্যদের তৎপরতা দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু তারা সৈন্যদের কোন তৎপরতা দেখতে পেল না।
সুলতান হয়তো তখন মুনাজের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। কিন্তু এখনো আমরা জন্নৌজের কিছুই দেখতে পেলাম না। সালেহ তার সঙ্গী তালালের উদ্দেশ্যে বলল।
দু’জন মানুষ আমরা। আমাদের পক্ষে পায়ে হেঁটে আর কতটুকু এলাকা দেখা সম্ভব, বললো তালাল। এমনও হতে পারে, কনৌজের সৈন্যরা রাতের অন্ধকারে অন্য কোন পথে মুনাজ চলে গেছে।
সব জায়গায়ই আমাদের লোক আছে’ বললো সালেহ। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, কনৌজ থেকে কোন সেনাবাহিনী দুর্গের বাইরে বের হয়নি।
সারা দিন এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে রাতের বেলায় তালাল ও সালেহ পুনরায় আগের জায়গায় রাত কাটানোর জন্যে চলে এলো। সালেহ তালালকে বললো, সে রাত সেখানে কাটাবে সত্য? তবে অর্ধেক রাত ঘুমাবে এবং বাকী অর্ধেক রাতে সে কনৌজের আরো কাছে চলে যাবে। কারণ, রাতের বেলায় কনৌজের সৈন্যরা তৎপরতা চালাতে পারে। তারা উভয়েই আগের রাতের জায়গায় শুয়ে পড়ল। সারা দিনের ঘোরাঘুরিতে উভয়েই ছিল ক্লান্ত। ফলে শোয়র সাথে সাথে উভয়েই ঘুমিয়ে পড়ল।
অর্ধরাতের কিছুটা আগে ঘোড়ার খুড়ের আওয়াজে সালেহের ঘুম ভেঙ্গে গেল। পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্কতার প্রয়োজনে সে তালালকে জাগিয়ে দিল। এদিকে তাদের কানে আরো জোরালো হয়ে উঠলো ঘোড়ার খুড়ের আওয়াজ। একটু পরেই এক অশ্বারোহী নজরে পড়ল। সেই সাথে আলোর মশাল।
মনে হচ্ছে আমাদের কাজ শুরু হয়ে গেছে। দুই তিনটি ঘোড়ার খুড়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এদের পেছনে হয়তো সেনাবাহিনী আসছে।
তারা উভয়েই হামাগুড়ি দিয়ে এমন একটা জায়গা চলে এলো, যেখানে তাদেরকে কারো পক্ষে দেখা সম্ভব নয় কিন্তু তারা পাহাড়ের ঢালের পাহাড়ের নীচ দিয়ে যাতায়াতকারী সবাইকে পরিস্কার দেখতে পাবে।
কিছুক্ষণ পর তারা দু’জন অশ্বরোহীকে দেখতে পেল। একজনের হাতে একটি মশাল। অশ্বরোহী লোক দু’জন যখন তাদের আরো কাছে এলো, তখন তালাল বললো, মনে হচ্ছে এই লোকটি গত রাতের সেই লোক এবং তার সাথে আসা লোকটি কোন নারী।
