আপনিও কি মহারাজের মতো আমাকে ধর্মের ব্যাপারে বিভ্রান্ত করতে এসেছেন?
না, আমি আপনাকে ধর্মের ব্যাপারে জ্ঞান দিতে আসিনি। আমি এসেছি আপনাকে মহারাজা বানাতে। আপনি শুধু আমাকে বলে দিন, রাজ্যের ধনভাণ্ডার আপনি কোথায় রেখেছেন? আপনি আমাকে সেখানে নিয়ে চলুন। আপনি আর আমি সমস্ত ধনভাণ্ডার নিয়ে কোথাও চলে যাবো। এমনও হতে পারে, আমি আপনাকে কনৌজের রাজ সিংহাসনে বসিয়ে দিতে পারি।
কিসের ধনভাণ্ডার? আমি কোন ধনভাণ্ডারের খবর জানি না।
হ্যাঁ, আমি জানি, আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চেষ্টা করবেন কিন্তু আমি জানি আপনি কি করেছেন, ধনভাণ্ডারের খবর আমাকে দিতেই হবে। আমাকে ধর্ম ও দেবদেবীদের অভিশাপের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। ধর্মকে আমি ধোকাবাজি ছাড়া আর কিছু মনে করি না। আমি শুধু ধনভাণ্ডার নিতে আসিনি। আপনাকেও সাথে করে নিয়ে যেতে এসেছি।
ধর্ম যাই হোক, ধর্মকে যারা ধোকা মনে করে তারা দুনিয়াতে সুখে থাকতে পারে না বললো পুরোহিত। জানেন, গযনীর সুলতান কেন একটির পর একটি বিজয় অর্জন করছে। এর কারণ শুধুই ধর্মের প্রতি ভালোবাসা। সে তো গোটা হিন্দুস্তানের সকল মানুষকেই ইসলামে দীক্ষা দিতে চায়। কিন্তু সে আমাদের ধর্মকে প্রচণ্ডভাবে ঘৃণা করে।
আমাদের ধর্ম ঘৃণা করার মতোই, বললো শুকুন্তলা। পণ্ডিত মহারাজ! আপনি আমার কথা বোঝার চেষ্টা করুন। আমি জানি বিগত বিশ পঁচিশ দিন যাবত আপনি রাজ্যের ধনভাণ্ডার কোন অজানা জায়গায় স্থানান্তরিত করেছেন। আপনি ভেবেছেন, আপনি আর মহারাজা ছাড়া এ ব্যাপারটি আর কেউ জানে না। আপনি হয়তো জানেন না, এই রাজ্যের কোন কিছুই আমার কাছে গোপন থাকে না। আপনি যদি এ ব্যাপারে আমাকে সহযোগিতা না করেন, তবে আপনাকে অনেক বেশী মূল্য দিতে হবে।
আপনি কি আপনার স্বামীকে ধোকা দিতে চাচ্ছেন?
কিসের স্বামী? মহারাজা শুধু আমার মতো এক জনের স্বামী নয়। গিয়ে দেখুন, আজ রাত তিনি আর কারো স্বামী। এজন্যই তো আমি আপনার কাছে আসার সুযোগ পেয়েছি। যতক্ষণ আমার রূপ সৌন্দর্য ঠিক আছে ততোক্ষণ পর্যন্ত মহারাজা আমার স্বামী। পণ্ডিত মহারাজ! আপনি জানেন, মানুষ যখন রাজসিংহাসনে বসে মাথায় রাজমুকুট ধারণ করে তখন আর তার মধ্যে মানবীয় আবেগ ভালোবাসা অবশিষ্ট থাকে না। এসব রাজা মহারাজা ধনসম্পদ ও ক্ষমতা ছাড়া আর কিছুকেই ভালোবাসে না। আমার মতো সুন্দরী কনৌজ কন্যা ও বধুদেরকে গযনীর সুলতান বাদী বানিয়ে নিয়ে যাবে এনিয়ে মহারাজের কোন মাথা ব্যাথা নেই। তিনি তার ক্ষমতা ও ধনভাণ্ডার রক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। আপনার আমার জীবন ও ধর্মের ব্যাপারে তার কোন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নেই।
ওসব কথা থাক। মহারাজা যা করার তিনি তা করেছেন। আপনি আমি আমাদের চিন্তা করি। আপনি নিজের প্রতি ও আমার প্রতি মনোযোগ দিন। আপনি যাই বলুন মহারাণী! আপনাকে আমি ধন ভাণ্ডারের খোঁজ দিতে পারবো না।
তাহলে তো আপনাকে অপহরণ করা হবে, বললো শকুন্তলা। কিন্তু আমি আপনাকে হত্যা করতে চাই না। প্রয়োজনে আমি আপনার দু’চোখ উপড়ে শরীরের চামড়া খসিয়ে গহীন জঙ্গলে ফেলে দেবো। আপনি সেই করুন মৃত্যুর কথা একটু ভেবে দেখুন, কি ভয়ংকরভাবে ধুকে ধুকে আপনাকে এই সুখের দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে।
আপনাকে আমি সহজে মরতে দেব না। আপনার শরীরে বিষধর পিপড়া, পোকা ছেড়ে দেবো, আপনার জীবন্ত শরীরটাকে শিয়াল, কুকুর, কাক, শকুন ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে। আপনাকে ধুকে ধুকে মরতে হবে।
নীরব নির্বাক অবস্থায় পুরোহিত শকুন্তলার নির্মমতার পরিকল্পনা শুনছিল। এ সব কথা শুনে তার বাকরুদ্ধ হয়ে গেল, তার শরীরটা অবশ হয়ে এলো। যে শকুন্তলা ছিল কনৌজের কিংবদন্তিতুল্য সুন্দরী, সেই সুন্দরী শকুন্তলা সাক্ষাত পেত্নীর রূপ ধরে পুরোহিতের সম্মুখে হাজির হলো। ধীরে ধীরে সূক্ষ্ম কিন্তু কঠোর ভাষায় ধনভাণ্ডার কজা করার জন্য সে পুরোহিতকে গোপন রহস্য বলে দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে লাগল।
শকুন্তলা বললো–
হ্যাঁ, অবশ্য আমি যদি আপনার জীবন সংহার না করতেই চাই তবে অন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবো। আমি এখান থেকে সোজা মহারাজার কাছে গিয়ে বলবো, আপনি আমাকে মন্দিরে ডেকে এনে আমার অসম্মান করেছেন, আমার সম্ভ্রমহানির অপচেষ্টা করেছেন। এ জন্য আমি প্রমাণও জোগার করে নেবো। নিজের নখ দিয়েই সারা শরীরে আঁচড় কেটে বলবো, আমি ধস্তাধস্তি করে আমার শরীরে নখের আঘাতে ক্ষত সৃষ্টি করেছেন আপনি।
এমনটি হলে মহারাজা আপনার কোন কথাই শুনবে না। কারণ মহারাজা জানেন, আপনার মন্দিরে কি হয়। মহারাজা জানেন, মন্দিরের প্রত্যেক পণ্ডিত পুরোহিত একেকজন নারীখেকো ….। ধর্মের দোহাই দিয়ে এখানে কুমারী বালিকাদের ধরে এনে তাদেরকে ভোগ করা হয়। প্রতিটি পুরোহিতই একেকটি নারী খাদক। তাই আপনি আমার বিরুদ্ধে কোন যুক্তিই খাড়া করতে পারবেন না। মহারাজা তার প্রিয় নারীর গায়ে হাত দেয়ার অপরাধে সোজা আপনাকে জল্লাদের হাতে তুলে দেবেন। অবশ্য এই মৃত্যুটা হবে আপনার জন্যে খুব সহজ মৃত্যু।
না রাণী! আমার প্রতি আপনি এতো নিষ্ঠুর হবেন না। আমি আপনাকে অবশ্যই ধনভাণ্ডারের কাছে নিয়ে যাবো। কখন কোন দিন যাবেন আপনি?
এখনই যাবো। তবে আপনাকে মনে রাখতে হবে মহারাজার কাছে যদি আমার এখবর পৌঁছে তবুও কিন্তু আপনার পরিণতি তাই হবে যা আমি এততক্ষণ আপনাকে বলেছি। আমি দশজন পুরুষ ও দশজন নারীকে মহারাজার সামনে দাঁড় করিয়ে বলবো: আপনি আমাকে ধনভাণ্ডারের লোভ দেখিয়ে আপনার সাথে আমাকে পালানোর প্রস্তাব করেন, আমি আপনাকে হাতে নাতে পাকড়াও করার জন্যে আমার লোকজন নিয়ে ধনভাণ্ডার পর্যন্ত গিয়েছিলাম।
