মহারাজ! আসলে কনৌজে আপনার সশরীরে উপস্থিত থাকা না থাকার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে প্রধান নয়। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে, দুটি ধর্মের লড়াই। হিন্দু রাজারা যদি একের পর এক ময়দান ছেড়ে পালাতে থাকেন, তাহলে একদিন গোটা হিন্দুস্তানই মুসলমানদের দখলে চলে যাবে এবং এখানকার সকল মানুষই মুসলমান হয়ে যাবে।
সেনাপতির কথা শোনার পর মহারাজা রাজ্যপাল সেনাপতির দিকে একটি কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এটি সবাইকে পড়ে শোনাও।
কাগজটি ছিল লাহোরের মহারাজা ভীমপালের লেখা একটি চিঠি। যে চিঠিটি তিনি মুনাজের রাজা রায়চন্দ্রের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন। সেই চিঠি মুনাজের রাজা কনৌজ রাজার কাছে পাঠিয়ে দেন।
রাজা ভীমপাল রাজা রায়চন্দ্রের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, সুলতান মাহমুদ হিন্দুস্তানের রাজা মহারাজাদের মতো নয়। সে কোন শ্যামলা বাদামী মানুষের নেতা নয়। কিংবা কিছু সংখ্যক মেরুদণ্ডহীন অনুগত মানুষের শাসক নয়। তার কথা শুনলেই বহু তেজস্বী যোদ্ধাও তরবারী ফেলে পালিয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তার ঘোড়ার জীন আপনার ঘোড়ার জীনের চেয়ে অবশ্যই মজবুত। সে কখনো এক আঘাতে তৃপ্ত হয়ে যায় না এবং একটি টিলা দখল করেই সে বিজয়ের উল্লাসে ফেটে পড়ে না। আপনি যদি তার আক্রমণ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে চান, তবে আমি আপনাকে সতর্ক অনুরোধ করবো, আপনি লুকিয়ে পড়ুন।
রাজা রায়চন্দ্র এই চিঠি কনৌজ রাজার কাছে এই পয়গাম দিয়ে পাঠালেন যে, আমি লড়াই করে মৃত্যুবরণ করাকেই প্রাধান্য দেবো। এ ব্যাপারে আপনার করণীয় কি হবে সেটি আপনি ভেবে চিন্তে ঠিক করুন।
আমি জানি, সুলতান মাহমূদ কনৌজকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে। কিন্তু এই ধ্বংসপ তার জন্যেই কবরস্থানে পরিণত হবে এবং এই ধ্বংসস্তূপের উপর আবার নতুন কনৌজের জন্ম হবে। সেই কনৌজই হবে গোটা হিন্দুস্তানের নিরাপত্তার প্রহরী।
আমি তোমাদের বলা জরুরী মনে করছি, আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ বিষয়টি যাতে সাধারণ সৈনিক ও লোকেরা জানতে না পারে।
রাজার সিদ্ধান্তের কথা শুনে সকল সেনা কর্মকর্তা মাথা নীচু করে রাজার দরবার থেকে বেরিয়ে এলো।
এ ঘটনার পরের রাতের ঘটনা। কনৌজের প্রধান পুরোহিত মন্দিরের মূর্তির সামনে পুজা অর্চনায় মগ্ন। তখন রাত প্রায় অর্ধেক পেরিয়ে গেছে। সাধারণত মধ্য রাতে পুরোহিত পূজা অর্চনায় লিপ্ত থাকে না। কিন্তু কনৌজ রাজার সিদ্ধান্ত পুরোহিতকে পেরেশান করে তুলে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠে, সুলতান মাহমূদ আসছে। এসেই প্রথমে মন্দিরের মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করছে। এই আশংকায় শংকিত পুরোহিত তার পূজনীয় দেবদেবীদের পায়ে পড়ে আবেদন নিবেদন করছিল, দেবী ঐশ্বরিক শক্তি প্রয়োগ করে যেনো সুলতান মাহমূদকে কনৌজে পৌঁছার আগেই খতম করে দেয়। বিপর্যস্ত মনে দীর্ঘ সময় ধরে পুরোহিত মূর্তির সামনে কান্নাকাটি করে আবেদন নিবেদন করল এবং চিৎকার করে ভজন আওড়িয়ে নানা তন্ত্রমন্ত্র উচ্চারণ করল।
ঠিক এমন সময় মন্দিরের একেবারে গোপন প্রকোষ্ঠে পৌঁছার দরজা সশব্দে খুলে গেল। কিন্তু একান্ত মনে মূর্তির সামনে আত্মনিবেদনকারী পুরোহিতের কানে দরজা খোলার শব্দ পৌঁছাল না।
দরজা খোলে একজন নারী পুরোহিতের পেছনে এসে বসল। কিন্তু তখনও পুরোহিত কিছুই টের পেলো না। নারীটি যখন পুরোহিতের কাঁধে হাত রাখল তখন গা ঝাড়া দিয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে পুরোহিত দেখতে পেল তার পেছনে রাজার ছোট রাণী শকুন্তলা দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রেখেছে।
অবাক বিস্ময়াভিভূত পুরোহিত মধ্যরাতে শুকুন্তলাকে মন্দিরে দেখে অবাক কণ্ঠে বললো; আরে! ছোট রাণী! আপনি….. এই গভীর রাতে! অবশ্য পরক্ষণেই বিস্ময় কাটিয়ে পুরোহিত নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,… ঠিক আছে আগে দেবীর চরণে মাথা রেখে পদধুলি নিন।
পুরোহিত কি বললো না বললো সে দিকে শকুন্তলা মোটেও ভ্রুক্ষেপ করলো না। মনে হলো তার কানে পুরোহিতের কথা ধ্বনিতই হয়নি। সে গভীর দৃষ্টিতে পুরোহিতের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইল। শকুন্তলার তীব্র দৃষ্টিতে পুরোহিতের শরীরে একটা মৃদু কম্পন বয়ে গেল। কারণ পুরোহিত জানতো, শকুন্তলা খুবই দাপটে রাণী এবং রাজার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রিয় রাণী।
তাছাড়া অনিন্দ সুন্দরী শকুন্তলা। শকুন্তলার সৌন্দর্যে যাদুমাখা। পুরোহিতের বুঝতে বাকী রইলো না, এই গভীর রাতে রাণী মন্দিরে পূজা অর্চনা করতে আসেনি। এতোটা ধার্মিক মেয়ে শকুন্তলা নয়। তার আসার ধরন এবং চাহনীর ভাব দেখেই পুরোহিত বুঝে ফেলেছিলেন। শকুন্তলা নিশ্চয়ই কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে এই গভীররাতে মন্দিরে এসেছে।
কী ব্যাপার? আপনি আমাকে দেখে এমন ঘাবড়ে গেলেন কেন পণ্ডিত মশাই? এমন সুন্দরী নারী কি আপনি আর দেখেন নি? আপনি যে সব কুমারী মেয়েদের মন্দিরে এনে নিজে ভোগ করেন এবং মানুষদের বলেন, এই কুমারী এখন পবিত্র হয়ে গেছে, ওদের রূপ সৌন্দর্য ও আকর্ষণের চেয়ে আমি মোটেও বেশী আকর্ষণীয় নই।
এসব কথা রেখে আপনি কি উদ্দেশ্যে এসেছেন সে কথা বললেই বেশী ভালো হয় মহারাণী। আপনি দেখছেন না আমি পূজায় ভজনে লিপ্ত?
পণ্ডিত মহারাজ? যদি আমরা পরস্পর পরস্পরকে ধোকা দিতে চেষ্টা না করি, তাহলে উভয়ের জন্যই তা মঙ্গল হবে। দৃঢ় কণ্ঠে বললো শকুন্তলা। আপনি এসব কিসের পূজা করছেন? এসব দেবদেবীর। যারা দুদিনের মেহমান মাত্র। আপনার হরেকৃষ্ণ আর বাসুদেব মুসলমানদের তো কিছুই করতে পারলো না। কোথায় গেলো আপনার সেই কুমারী বলিদানের ফলাফল? কি লাভ হলো নিরপরাধ এই কুমারীগুলোর জীবন সংহার করে?
