মহারাজ! আপনার সকল ধণভাণ্ডার এখন সুরক্ষিত। এখন আপনি ধনরাজী হারানোর আশংকামুক্ত হয়ে দৃঢ়ভাবে মাহমূদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন। আর যদি তা না করেন তাহলে কনৌজের প্রধান মন্দিরও মসজিদে পরিণত হবে। আপনার ভুলে গেলে চলবে না, মুসলমানরা যাকে মূর্তি বলে সেগুলোই আমাদের দেবদেবী। এরই মধ্যে আমাদের দেবদেবীদের সাংঘাতিক অবমাননা করা হয়েছে। আপনাকে আমি সতর্ক করে দিচ্ছি, দেবদেবীদের অভিশাপ থেকে বাঁচার চেষ্টা আপনাকে করতেই হবে।
ভ্রুকুঞ্চিত করে মহারাজা রাজ্যপাল প্রধান পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে বললেন,
আপনি যাদেরকে দেবদেবী বলছেন, এগুলো আসলে মূর্তি। তারা যদি অভিশাপ দিয়ে কাউকে ধ্বংস করতে পারে, তবে অসংখ্য দেবদেবীর অপমান ও অমর্যাদার প্রতিশোধ নিতে মুসলিম সৈন্যদের ধ্বংস করে না কেন? মথুরার মন্দিরের মূর্তি ধ্বংস করে যারা আযান দিতে শুরু করেছে, তাদের উপর তারা বজ্রপাত হয়ে ভেঙ্গে পড়ে না কেন? এই মুসলমানরাই আসলে দেবদেবীদের অভিশাপ। এরাই অভিশাপ হয়ে হিন্দুস্তানের রাজা মহারাজাদের উপর হামলে পড়ছে।
যে রাজা মহারাজা ধর্মের অমর্যাদা হওয়ার পর কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না, তাদের উপর অভিশাপতো পড়বেই। দেখুননা, আপনার মতো শক্তিশালী মহারাজাও তো নিজের ধন ভাণ্ডার নিয়ে ব্যস্ত। বললো প্রধান পুরোহিত।
ধনভাণ্ডার আমি লুকিয়েছি সত্য। কারণ, সুলতান মাহমূদ ধনরত্ন লুট করে গযনী নিয়ে যাবে। আমি তাকে কনৌজের ধনভাণ্ডার গযনী নিয়ে যেতে দেবো না। সে এখানে এসে ধনরত্নও পাবে না, আমাকেও খুঁজে পাবে না। সে আমাকে বন্দী করবে তো দূরে থাক আমার টিকিটিও পাবে না। সে পাগলের মতো আমাকে এবং আমার ধনভাণ্ডার তালাশ করবে। কিন্তু সে কিছুই খুঁজে পাবে না। আমাকেও পাবে না, আমার ধনভাণ্ডার পাবে না। সে যখন কনৌজ পৌঁছাবে আমি তখন এমন জায়গায় থাকবো, যেখানে তার সকল সৈন্য মিলেও আমাকে খুঁজে পাবে না।
আপনাকে না পাক, কিন্তু মন্দিরতো তারা ঠিকই পাবে। তারা মন্দিরগুলো ধ্বংস করবে আর আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব ধ্বংসযজ্ঞ দেখবো।
মহারাজ! ধনসম্পদের ভালোবাসা আপনাকে কাপুরুষ বানিয়ে ফেলেছে। এজন্য আপনি গযনী সুলতানকে ধোকা দেয়ার চিন্তা করছেন। অথচ আপনি এটা ভাবছেন না, মাহমূদের ভয়ে যদি আপনি এখান থেকে লুকিয়ে পালিয়ে যান, কনৌজের সেনাবাহিনী ও লোকেরা আপনাকে ঘৃণা করবে। আপনার বিরুদ্ধে ক্ষেপে যাবে। মহারাজ! আমি আপনাকে ভগবানের দোহাই দিয়ে বলছি, আপনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করুন। কনৌজের আবাল-বৃদ্ধ প্রত্যেকেই লড়াই করে মরতে প্রস্তুত। গোটা দেশের মানুষকে আমি অগ্নিস্ফুলিঙে পরিণত করার দায়িত্ব নিচ্ছি। আমি কনৌজের লোকদেরকে জলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করবো।
আমাকে ভাবতে দিন পুরোহিত মশাই! আমাকে ভাবতে দিন। অস্থির হয়ে গেলেন মহারাজা রাজ্যপাল। পুরোহিতের কথায় তার চিন্তায় ছেদ পড়লো। তার পরিকল্পনা পুরোহিতের প্ররোচনায় এলোমেলো হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। অবশেষে সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে মহারাজা রাজ্যপাল বললেন
শুনুন পণ্ডিত মহাশয়! আমি অনেক ভেবে চিন্তে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন আপনি চলে যান। আপনাকে সব কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া সব ব্যাপার আপনার পক্ষে বুঝে উঠাও মুশকিল।
পুরোহিত হতাশ ও হতোদ্যম হয়ে চলে গেল। পুরোহিত চলে যাওয়ার পর মহারাজা রাজ্যপাল তার সেনাবাহিনীর সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ডেকে বললেন,
“দৃশ্যত মনে হতে পারে আমি কাপুরুষের পরিচয় দিচ্ছি আমি সুলতান মাহমূদের মোকাবেলা না করে আত্মগোপনে চলে যাবো। এটা হবে মাহমূদের জন্যে সব চেয়ে বেশী আঘাত। সে আমার খুঁজে গোটা কনৌজ জুড়ে পাগলের মতো আমাকে খোঁজাখুজি করবে। না পেয়ে সে তাড়াতাড়ি কনৌজ ছাড়ার চিন্তা করবে না। কারণ এখন পর্যন্ত শক্তভাবে হিন্দুস্তানে তার কারো মোকাবেলার সম্মুখীন হতে হয়নি। সহজেই সব জায়গায় সে বিজয়ী হয়ে গেছে। আমি ভাবছি একের পর এক লড়াই করে এবং বিজয়ের পর বিজয় অর্জন করে সে যখন মনে করবে হিন্দুস্তানে তার মোকাবেলা করার কেউ নেই এবং তার জনবল বিভিন্ন জায়গায় ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে কমে যাবে তখণ অন্যান্য রাজাদের নিয়ে আমি একটি শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলবো এবং এই কনৌজকেই মাহমূদ ও তার সৈন্যদের জন্যে কবরস্থানে পরিণত করবো।
কনৌজ রাজা রাজ্যপাল সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে লড়াই না করার নানা যুক্তি উপস্থাপন করছিলেন; কিন্তু তার সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা নীরবে তার বক্তৃতা শোনা ছাড়া কেউ কোন মন্তব্য করছিলো না। তাদের চেহারার অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছিল, তারা মহারাজা রাজ্যপালের সিদ্ধান্তে মোটেও সুন্তুষ্ট হতে পারেনি। তবে তারা কেউ রাজার সিদ্ধান্তের বিপরীতে কিছুই বললো না।
এক পর্যায়ে রাজা রাজ্যপাল সকল সেনাকর্মকর্তার উদ্দেশ্যে বললেন, কি ব্যাপার? তোমরা কেউই কোন কথা বলছে না। আমর সিদ্ধান্ত তোমাদের মনপুত হয়েছে তোক।
আমাদের সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টির ব্যাপার নয়। আমাদের কাজ আপনার নির্দেশ পালন করা। আমরা আপনার নির্দেশ পালন করবো, বললো তার প্রধান সেনাপতি। কিন্তু আমাদের মধ্য থেকে কেউ লড়াই করতে অস্বীকৃতি জানাবে না।
