পুরোহিত রাজার কক্ষে প্রবেশ করলে রাজা পুরোহিতকে বললেন, কক্ষের দরজা বন্ধ করে দিয়ে আপনি আমার পাশে বসুন।
রাতেই ধন-সম্পদের শেষ বাক্সটিও সেই জায়গায় রেখে এসেছি মহারাজ!
যারা বাক্স বহন করেছিল এদের সবাইকে কি কারাগারে বন্দী করা হয়েছে।
এদেরকে কারাগারে বন্দী করার দরকার ছিল না মহারাজ! কারণ, তাদের সবার চোখ আমি কাপড় দিয়ে বেধে দিয়েছিলাম। তারপরও আপনার নির্দেশ পালনার্থে সবাইকেই বন্দী শালায় বন্দী করে রাখা হয়েছে। অবশ্য ‘আমি কারারক্ষীদের বলে দিয়েছি তাদেকে যাতে আরামে রাখা হয় এবং খাতির যত্ন করা হয়।
পণ্ডিত মশাই! এখন আপনি ছাড়া আর কেউ আমার এই বিশাল সম্পদের খবর জানে না। আপনাকে আমি কোথা থেকে কোন পর্যায়ে তুলে এনেছি এবং কতোটা সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছি এ ব্যাপারটি নিশ্চয়ই বুঝে! আমি আমার সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতিকে পর্যন্ত এ ব্যাপারে কিছুই জানাইনি। আমার ছোট বিবি শকুন্তলাকে আমি কতোটা ভালবাসি আপনি জানেন, কিন্তু তাকেও আমি বুঝতে দেইনি, রাজপ্রাসাদের সকল সোনাদানা আমি দুর্গের বাইরে সরিয়ে দিচ্ছি।
আমার ব্যাপারে মহারাজের পূর্ণ আস্থা রাখা উচিত।
আমি সেই দিন থেকেই আপনার সহায় সম্পদ দুর্গের বাইরে নিতে শুরু করেছি যখন শুনেছি, সুলতান মাহমূদ মথুরা দখল করে নিয়েছে এবং তার পরবর্তী লক্ষ হচ্ছে কনৌজ দুর্গ।
আমি যে জায়গায় আপনার সম্পদ লুকিয়েছি রাজ মহলের সবার চোখের আড়ালে এক রাতে আপনি আমার সাথে গিয়ে সেই জায়গা দেখে এসেছেন। গত রাতে আমি আপনার ধন-ভাণ্ডারের শেষ বাক্সও সেখানে রেখে এসেছি।
তার মানে কি আমার সোনাদানা সংরক্ষণের বিষয়টি নিরাপদে রয়েছে? পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলেন কনৌজের মহারাজা ।
হ্যাঁ, এমনই সুরক্ষিত হয়েছে যে, আপনি একাকী সেখানে গেলে জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারবেন না। কারণ, আমি সেখানে কোন মানুষকে নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখিনি, আমি ওখানকার নিরাপত্তায় রেখেছি সাপ।
আরেকটি কথা আপনাকে আমার বলতেই হচ্ছে, বললেন রাজা। যদি কোন কারণে এ বিষয়টা ফাঁস হয়ে যায় তবে সেই দিনটিই হবে আপনার জীবনের শেষ দিন। আর যদি আপনার আগে আমার মৃত্যু এসে যায়, তবে আমার সাথে আপনাকেও মরতে হবে।
রাজার এ কথায় পুরোহিতের ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠলো। তিনি স্মিত হেসে রাজার উদ্দেশে বললেন,
ধন-সম্পদের লোভ মানুষকে পাষাণ বানিয়ে ফেলে। সম্পদের লোভে অনেকেই স্ত্রী সন্তান এবং ধর্মীয় গুরুকেও শত্রু ভাবতে শুরু করে। মহারাজ! আমার কাছে যে সম্পদ আছে এর কাছে আপনার এ সব ধনসম্পদ খুবই তুচ্ছ। আমার ভজন, আমার পার্থনা, অহোরাত্রী শ্রীকৃষ্ণের চরণে আমার আত্ম নিবেদন এমন মুল্যবান সম্পদ যে, আপনাদের মতো রাজা মহারাজা, রাজ্যপাট, সেনাবাহিনীর দাপট আমার কাছে পিপিলিকার গড়ে তোলা আহার্যের স্তূপ মনে হয়।
হ্যাঁ, তাই ঠিক! এজন্যই তো আমি আপনাকে আমার এই গোপন রহস্যের ভেদ পুরুষ বানিয়েছি। বললেন রাজা রাজ্যপাল।
***
ঐতিহাসিক আল বিরুনী ও ফারিতা লিখেছেন, সুলতান মাহমূদকে তার গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, কনৌজে গযনী বাহিনীর সাথে হিন্দুরা ভয়ংকর মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। কনৌজ রাজার নানা কাহিনী শুনে সুলতান মাহমূদ খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ, ক্রমশ সদস্য সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকা সেনাবাহিনীকে আরো শক্তিশালী করার জন্যে গযনী থেকে তার জন্যে কোন রসদ ও জনবল সরবরাহের উপায় ছিলো না। তিনি গভীর ভাবে চিন্তা করছিলেন, কনৌজ রাজাকে পরাজিত করতে হলে তাকে খুবই সতর্ক ও সার্থক চাল চালতে হবে। অবশ্য মথুরা জয়ের পর তিনি তার সৈন্যদের কিছুদিন বিশ্রাম দিয়েছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন বিজিত এলাকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পথে পথে তার অনেক সৈন্যকে রেখে আসতে হয়েছে এবং অব্যাহত যুদ্ধে তার বহু সৈন্য নিহত ও আহত হয়েছে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় তার জনবল যথেষ্ঠ কম। এ অবস্থায় সৈন্যদের কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ দিলেও সেনাপতি ডেপুটি সেনাপতি ও কমান্ডারদের তিনি ক্ষণিকের জন্য বিশ্রামের সুযোগ দেননি। তাদের প্রতিনিয়ত নিচ্ছিদ্র পরিকল্পনা গ্রহণ এবং শত্রুপক্ষের অবস্থা জানার কাজে ব্যস্ত রেখেছেন। সেই সাথে সাধারণ সৈনিকদেরকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করার জন্য ইমাম ও খতীবদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একের পর এক দুর্গ জয় করার পর সৈন্যসংখ্যা অর্ধেকের চেয়ে নীচে নেমে এলেও তিনি আরো কঠিন যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা করলেন। আরো কঠিন যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা করলেন এটা ছিল সুলতান মাহমুদের এক প্রকার উন্মাদনা বিজয় এবং কৌশলী চালের সাফল্যের উপর অত্যধিক আস্থার কারণ।
মজার ব্যাপার হলো, যে কল্লৌজ নিয়ে সুলতান মাহমূদ এতটা চিন্তিত বাস্তবে সেই কনৌজের অবস্থা ছিল তার ধারণার সম্পূর্ণ উল্টো। যুদ্ধ না করার বাসনায় মহারাজা রাজ্যপাল তার রাজকোষের গোটা সম্পদ রাজধানীর বাইরে পাহাড়ী এক গোপন জায়গায় সরাতে শুরু করেন। সুলতান মাহমূদের অব্যহত বিজয় এবং তার একের পর এক দুর্গ জয়ের ঘটনায় রাজ্যপাল তাকে হারানোর আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কনৌজের প্রধান পুরোহিত রাজা রাজ্যপালকে লড়াইয়ের জন্য উৎসাহিত করছিলেন। কিন্তু ১০১৮ সালের সেই ভোর বেলায় কনৌজের মহারাজা রাজ্যপাল প্রধান পুরোহিতকে এর কারণও বলেদিলেন। প্রধান পুরোহিত যখন প্রত্যূষে রাজার শয়নকক্ষে গিয়ে জানালেন
