এরা যখন কথা বলছিল তখন বাইরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির শব্দে এদের কথার আওয়াজ বাইরে যাচ্ছিল না। বৃষ্টি থামতেই রাজা প্রাসাদে এলো এবং এদের ভিতরে নিয়ে বলল, আমি তোমাদের কাছ থেকে সুবক্তগীনের যুদ্ধ জয়ের রহস্য জানতে চাচ্ছি!
“আমরা পরাজয় চিনি না। আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নতি স্বীকার করি । আপনি ও আপনার জাতির লোকেরা মুসলমানদের ধোঁকা দেয়া ও প্রতারণা করাকে নেক কাজ মনে করেন। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে মনে করেন বুদ্ধিমত্তা। এই ধূর্তামি আমরা জানি না। শিকলে বাঁধা অবস্থায় যদি আমরা আপনাকে রহস্য বলে দেই তবে এর অর্থ দাঁড়ায় গ্রেফতারীর যন্ত্রণায় আমরা কওমের সাথে বেঈমানী করেছি। বন্দী অবস্থায় আমরা আপনার সাথে কোন কথা বলতে পারব না।”
রাজা শ্লেষ মাখা স্বরে বললো, “তাহলে কি আমি তোমাদের অতিথি করে রাখবো?”
যা ইচ্ছে তা করতে পারেন। শিকলে বন্দী থেকে আমরাই কি আপনাকে বন্ধু ভাবতে পারি? বলল এক বন্দী কাসেম বলখী। আপনি আমাদের উধ্বতন নেতৃস্থানীয় লোকদের কয়েদখানায় হত্যা করেছেন, আমাদের সুলতানের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। আমাদের মুখ থেকে রহস্য জেনে যাওয়ার পর আমাদের সাথেও এমন ব্যবহার করবেন না এর নিশ্চয়তা কি?
আমরা আপনাকে বলতে পারি, যতো বেশি সৈন্য নিয়েই আপনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুন না কেন পরাজয় আপনার হবেই। অবশ্য আমরাই কেবল আপনাকে বলতে পারি বিজয়ের রহস্য কি। কিভাবে আমাদের পরাজিত করা সম্ভব।
আমি তোমাদের ভাণ্ডাবেড়ি ও শিকল খুলে দিচ্ছি। তোমাদেরকে কয়েদখানার বাইরে রাখার ব্যবস্থা করছি।
“আমরা যদি রহস্যের কথা আপনাকে বলি আপনি কি আমাদের ছেড়ে দেবেন? গজনী পর্যন্ত যেতে আমাদের বাহনের ব্যবস্থা করবেন? প্রশ্ন করল নিজাম।
“তোমরা যা চাইবে তাই দেব, নিশ্চিন্ত থাক।”
আমরা এ ব্যাপারে কয়েক দিন চিন্তা করব। এরপর বলব। পরখ করে নেব, এই সময়ের মধ্যে আমাদের সাথে আপনি কেমন আচরণ করেন। কারাগারের বাইরে আর ভিতরে আপনি আমাদের যেখানেই রাখেন আমরা পালিয়ে আর কোথায় যাব! একটা ব্যাপারে আপনি খেয়াল রাখবেন, আমরা মুসলমানের রান্না করা খাবার ছাড়া আহার করব না, আজও এক মুসলমানের রান্না করা খাবার আমাদের দেয়া হয়েছে। আমাদের আবদারে এক মুসলমান কর্মচারী খাবার দিয়ে গেছে আমাদেরকে।
পরাজয়ের গ্লানিতে বিপর্যস্ত রাজা বন্দীদের শর্ত মেনে নিল। হুকুম করল, আজ যে মুসলমান কর্মচারী বন্দীদের খাবার নিয়ে এসেছিল একেই তাদের তদারকিতে নিযুক্ত করা হোক।
বন্দীদের ভিন্ন ভিন্ন দুটি ঘরে রাখা হল। তাদের থাকার ঘরে মেহমানদের মতোই আহার বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হল। তবে তারা জানতে পারেনি যে, তাদের ঘরের বাইরে সশস্ত্র পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
একাধারে কয়েক সপ্তাহ ধরে সকল মন্দির ও শহরে-বাজারে প্রচার করা হচ্ছে, মুসলমানরা এদেশে আক্রমণ করতে ধেয়ে আসছে। এরা কোন মন্দির ও পণ্ডিতকে জীবিত রাখবে না। কোন নারীর সতীত্বকেও অক্ষত রাখবে না। মুসলিম সেনাদের প্রতি হিন্দু প্রজাদের ঘৃণা বাড়ানোর জন্যে বোঝানো হল, বাপ-দাদার ধর্ম, নিজেদের মন্দির ও ধর্মগুরু বিশেষ করে মা-বোনদের ইজ্জত বাঁচানোর তাগিদে তাদের সরকারী কোষাগারে অকাতরে অর্থ-কড়ি দেয়া জরুরী। প্রতিটি মন্দির থেকে প্রচার করা হচ্ছে, মুসলিম আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে না পারলে হিন্দুদের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। অপপ্রচারে কাজ হলো। প্রজাসাধারণ তাদের সম্পদের সিংহভাগ অকাতরে রাজকোষে ঢেলে দিল।
লাহোরের সবচেয়ে বড় মন্দির থেকে ঘোষণা করা হল, এখন বেশি করে প্রজাদের উচিত, মন্দিরে হাজির হয়ে ভগবানের ভজনা করা। সেই সাথে প্রত্যেকের কুমারী কন্যা-বোনদের নিয়মিত মন্দিরে নিয়ে আসা। কুমারীদের ভজনায় দেবতা বেশি খুশি হয়ে থাকেন। . পণ্ডিতরা একথাও প্রচার করল যে, মহারাজা এখন সৈন্যবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত। তিনি দ্রুত মুসলমানদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করবেন, যাতে মুসলমানরা লাহোর আক্রমণের অবকাশই না পায়। তাই প্রজাদের উচিত এই কঠিন সময়ে বেশি করে মন্দিরের পূজা-অর্চনায় শরীক হওয়া এবং যথাসম্ভব রাজাকে সাহায্য করা। রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বার্থেই এখন ভজনা ও অর্থ সাহায্য উভয়টাই রাজার জরুরী।
মন্দিরের প্রচারণায় সুফল ফলল। হিন্দু প্রজারা কুমারী মেয়েদের মন্দিরে পাঠাতে শুরু করল। বড় পণ্ডিত কুমারীদের পূজা-অর্চনা পরিচালনা করতো। কিভাবে দেবতাদের সামনে হাতজোড় করে পূজো দেবে তা তদারকি করতো। আর কুমারীদের নিরীক্ষণ করতো। কারণ, তার একজন কুমারীকে দেবতার পদতলে বলিদানের জন্যে বাছাই করা জরুরী।
গজনীর দুই বন্দীর খোঁজ নেয়ার অবকাশ রাজার আর হল না। প্রতিবেশী রাজ্যের রাজারা সবাই লাহোর এসে হাজির হল। তারা প্রত্যেকে জয়পালের গজনী আক্রমণে সৈন্য ও রসদ দিয়ে সাহায্য করেছিল। এতে দিল্লী, কনৌজ, গোয়ালীয়রের রাজার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। টানা কয়েকদিন পরাজয় ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্ক হল। কিন্তু মুসলমানদের পুনরায় হামলা করে কিভাবে গজনী দখল করা যায় তর্ক-বিতর্ক এ পর্যায়ে আটকে রইল । পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে কিংবা পুনর্বার সহযোগিতা না করার কথা কেউই উচ্চারণ করল না।
