এবার তারা দুজনেই চোখ বাধা এই কাফেলার গমন পথ দেখল। কিন্তু তারা এর কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না কারা কোন উদ্দেশ্যে কোথায় কেন এভাবে যাচ্ছে।
সালেহ ও তালাল একটি সুবিধাজনক জায়গায় অবস্থান নিয়ে কাফেলাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। কয়েকশ গজ অগ্রসর হয়ে পুরোহিতের নেতৃত্বাধীন এই কাফেলা থেমে গেল। ওখানে একটি খাড়া দেয়ালের মতো পাহাড় সোজা উপরেরর দিকে উঠে গেছে। সালেহ ও তালাল পা টিপে টিপে পাহাড়ের উপর দিয়ে সোজা খাড়া টিলার উপরে গিয়ে দাঁড়াল। তারা যেখানে দাঁড়াল, কাফেলাটি তাদের ঠিক নীচে থেমেছে। তখন নীচের মশালের আলো আরো বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মশালের আলোয় তারা দেখতে পেলো, দেয়ালের মতো বাড়া টিলার বিপরীতে অপর একটি টিলার ভেতর অনেকটা গর্তের মতো ফাঁকা দেখা যাচ্ছে। ফাঁকা জায়গাটা এমন যে একটি ঘোড় অনায়াসে তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে।
পুরোহিত মশাল বাহকের কাছ থেকে মশাল নিয়ে বললো, তোমরা সবাই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে আমি এসে তোমাদের নিয়ে যাবো
পুরোহিত মশাল নিয়ে বিপরীত টিলার ভেতরের ফাঁকা জায়গায় প্রবেশ করে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর পুরোহিত আবার মশাল হাতে নিয়ে পাহাড়ের গর্তসম ফাঁকা জায়গার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।
কেউ পট্টির ফাঁক দিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করবে না। কেউ যদি চোখের পট্টি সরিয়ে কিছু দেখতে চেষ্টা করো তবে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। পুরোহিত চোখবাঁধা লোকগুলোকে হাত ধরে ঘোড়ার পিঠ থেকে কাঠের তৈরী কিছু বাক্স নামানোর কাজে লাগিয়ে দিল। পুরোহিত একটি মশাল জ্বালিয়ে নিজের হাতে নিলো এবং আরো দুটি মশাল জ্বালিয়ে সে সুবিধা মতো জায়গায় দুজনকে দাঁড় করিয়ে দিল। ঘোড়ার পিঠ থেকে চোখবাধা লোজন বাক্স উঠিয়ে পুরোহিতের নির্দেশ মতো পাহাড়ের মধ্যকার ফাঁকা জায়গায় ঢুকাতে লাগলো, তারা বাক্স রেখে আবার অন্য বাক্স নিতে ফিরে আসতো। তাদের কেউ কেউ চোখ বাধা থাকার কারণে বাক্স নিয়ে পড়ে যেতো আবার উঠে পুরোহিতের নির্দেশ মতো চলতো। এভাবে একে একে সবগুলো বোঝাই করা ঘোড়ার পিঠ থেকে বান্ত্রগুলো নামানো হলো এবং চোখ বাধা লোকগুলোর প্রায় সবাই গর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেল। অবস্থা দৃষ্টে তালাল ও সালেহর বুঝতে কষ্ট হলো না, এগুলো অবশ্যই কারো ধন-সম্পদ যা গোপনে লুকানো হচ্ছে। কিন্তু লোকগুলোর চোখ বেধে রাখার ব্যাপারটি তারা কিছুতেই বুঝতে পারছিল না।
তালাল বললো, পুরোহিত বেশধারী লোকটি কোন ডাকাতদলের সর্দার হবে। আর চোখবাঁধা এই লোকগুলো হয়তো এই ডাকাত ধরে আনার মজদুর। হতে পারে ডাকাত সর্দারের অন্য লোকেরা আরো কোথাও লুটতরাজ করার জন্য চলে গেছে।
তালাল সালেহকে বললো, সালেহ ভাই! এই ডাকাত সর্দার যদি এখানে পাহারা না বসায়, তাহল আমরা দু’জনে যে পরিমাণ উঠাতে পারি সেই পরিমাণ সম্পদ নিয়ে নিতে পারি, কি বলো তুমি?
তালাল ভাই মন ঠিক করে নাও, তালালকে বললো সালেহ। এ সব চোরাই ধনসম্পদ দিয়ে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই। যে কর্তব্য পালনে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে সেই কাজের প্রতি আমাদের মনোযোগ রাখা বেশী দরকার।
আরে তাতো আছেই। আমি কি কর্তব্যে অবহেলা করছি নাকি বললো তালাল। রাতে তো আর আমরা কোন কাজ করছি না। কোন না কোন ভাবে রাতটা তো আমাদের এখানে কাটাতেই হবে। কাজ যা করার তা তো আগামীকাল দিনের বেলায় করতে হবে। রাতের এই কর্মহীন সময়টা এ কাজে লাগাতে পারি। রাতেই যদি এই লোকগুলো এখান থেকে চলে যায় তবেই না আমরা কাজে হাত দেবো। আমার মনে হয় গুহার ভেতরে কেউ নেই। থাকলে নিশ্চয়ই তারা বা নেয়ার জন্যে গুহার বাইরে আসতো।
না, লুটের সম্পদ নেয়ার জন্যে আমরা কিছুতেই রাতের অন্ধাকারে অজানা হাতে প্রবেশ করবো না। বললো সালেহ। তালাল ভাই! সম্পদ আর নারীর লোভ বহু রাজার রাজত্ব ধ্বংস করে দিয়েছে। ধন-সম্পদের প্রতি লোভ করো ্না। ধুত্তরী! তুমি মানুষ না একটা পাথর। পাগলের মতো কথাবার্তা বলল। তিরস্কারের সুরে সালেহকে বললো তালাল।
সালেহ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় পুরোহিত বেশধারী লোকটি মশাল হাতে নিয়ে গুহার ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো।
পুরোহিত চোখ বাধা লোকগুলোকে হাত ধরে ধরে ঘোড়ার পাশে আনল এবং এক এক করে সবাইকে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করিয়ে দিল। ঘোড়া ছিল কম লোক ছিল বেশী। দুজন দু’জন করে এক একটি ঘোড়ার উপর বসিয়ে সবার আগের উটে সওয়ার হয়ে পুরোহিত বেশধারী ফিরতি পথ ধরলো।
লোকগুলো যখন অনেক দূরে চলে গেল তখ তালাল সালেহর উদ্দেশ্যে বললো, চলো, ব্যাপারটি কি দেখে আসি।
সালেহ তালালকে একাজে অগ্রসর হতে নিষেধ করলো। শুধু নিষেধই করলো না সে বলতে বাধ্য হলো, তুমি যদি ওখানে যেতে চাও তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করতে বাধ্য হবো।
সালেহর দৃঢ়তা ও কঠোর কথা শুনে তালাল হাসল এবং কথা না বাড়িয়ে উভয়েই শুয়ে পড়ল তখন রাত আর বেশী বাকী নেই।
ভোরের অন্ধকার থাকতেই পুরোহিত কনৌজের রাজা রাজ্যপালের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ল। এ সময়ে রাজার জেগে থাকার কথা নয়। রাজার শয়ন কক্ষের দরজায় একজন বাদী দাঁড়ানো ছিল। সে পুরোহিতকে দেখেই রাজার শয়নকক্ষের ভেতরে প্রবেশ করল এবং ফিরে এসে পুরোহিতকে বললো, আপনি ভেতরে আসুন।
