হিন্দুস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে আবেগের প্রাবল্য বিদ্যমান ছিল। তখনকার হিন্দুস্তান ছিলো বহু রাজামহারাজাদের শাসনে বিভক্ত হিন্দুস্তানের প্রায় সকল শাসক শ্ৰেণীই ছিল হিন্দু। হিন্দু শাসকরা কখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলিম অধিবাসীদের বিশ্বাস করতো না।
গযনীর সুলতান মাহমূদ যখন ভারত অভিযান শুরু করেন, তখন থেকে ভারতে বসবাসকারী প্রত্যেক মুসলমানকেই হিন্দু শাসকরা গযনী সুলতানের গোয়েন্দা হিসেবে সন্দেহ করতে শুরু করে।
এমন সংশয় সন্দেহের মধ্য থেকেও ভারতে বসবাসকারী তৎকালীন মুসলমানদের কেউ কেউ সুলতান মাহমূদের পক্ষে গোয়েন্দা কাজে অংশ গ্রহণ করে এবং সুযোগ মতো মুসলমানদের সাহায্য সহযোগিতা করতে থাকে। অবশ্য তাদের মধ্য অনেকেই হিন্দুদের ষড়যন্ত্রের জালে আটকে যায় কিংবা আবেগ তাড়িত হয়ে অথবা লোভকে সংবরণ করতে না পেরে তথ্য ফাঁস করে দেয়।
তালাল মাহমূদ ও সালেহ নামের দুই হিন্দুস্তানী ছিলো সুলতান মাহমূদের নিয়মিত গোয়েন্দা দলের সক্রিয় সদস্য। সুলতান মাহমূদকে তার স্থানীয় গোয়েন্দারা জানিয়ে দিয়েছিলো, মথুরা যতো সহজে জয় করা সম্ভব হয়েছে এতোটা সহজে কনৌজ জয় করা সম্ভব হবে না। কারণ, যমুনা নদীর তীরবর্তী মুনাজ নামের রাজপুত অধ্যুষিত দুর্গে যখন আক্রমণ করা হবে, তখন পিছন দিক থেকে কনৌজের সৈন্যরা আঘাত হানতে পারে। তাই মুসলিম বাহিনীকে গঙ্গা ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী জায়গায় অবস্থান করে শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে। ফলে মুসলিম সৈন্যদের পরাজিত হওয়ার সমূহ আশংকা রয়েছে। অপর দিকে লাহোরের মহারাজা ভীমপাল এই অঞ্চলের ছোট বড় সকল রাজা মহারাজাকেই জোটবদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। এমনও হতে পারে ভীমপাল নিজেও তার সৈন্যদেরকে এখানে নিয়ে এসে লড়াইয়ে লিপ্ত হবেন।
সুলতান মাহমূদের সৈন্যরা অব্যহত লড়াইয়ে ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। বহু সৈন্য ছিল আহত এবং নিহিত হয়েছিল প্রচুর। তা ছাড়া এরা নিজ ভূমি গযনী থেকে প্রায় তিন মাস সফরের দূরত্বে অবস্থান করছিল। এ পর্যায়ে এসে গযনী বাহিনী মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। তাদের গোয়েন্দাদের প্রেরিত তথ্য মতে তারা গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী হিন্দু ঘনবসতিপূর্ণ চতুর্দিকে শত্রু বেষ্টিত একটি জায়গায় এসে পৌঁছে। যেখানে তাদেরকে উজ্জীবিত-অক্লান্ত বিপুল সংখ্যক শক্রসেনার বিরুদ্ধে বৈরী পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে লড়াই করতে হবে।
সুলতান যখন মথুরা থেকে কনৌজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন, তখন সালেহ ও তালালকে আগে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল তারা যেন কনৌজের সৈন্যদের তৎপরতা সম্পর্কে সময় মতো সুলতানকে অবহিত করে।
সালেহ ও তালাল তিন দিন ধরে ছন্নছাড়া উপজাতীয় ছদ্মবেশে কনৌজের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করেছে। তারা লোক চক্ষুর অন্তরালে উঁচু গাছ ও পাহাড়ের টিলার উপরে উঠেও কনৌজের সৈন্যদের তৎপরতা প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোথাও কনৌজের কোন সৈন্যের তৎপরতা তাদের নজরে পড়েনি। গঙ্গা নদীর তীরে গিয়ে নদীতে চলাচলকারী নৌকাগুলোকেও তারা পর্যবেক্ষণ করেছে কিন্তু কিছুই তাদের চোখে ধরা পড়েনি।
দু’জনের মধ্যে তালাল কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সালেহ অন্যদিনের মতোই ছিল উজ্জীবিত চনমনে। সালেহ তার কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে সামান্যতম ক্রুটিও করতে প্রস্তুত নয়।
সময়টা ছিল ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। প্রচণ্ড ঠান্ডা। ঠাণ্ডার প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্যে তারা একটি টিলার আড়ালে যেখানে বাতাস নেই এমন জায়গায় রাত কাটানোর জন্যে শুয়ে পড়ল।
রাতের এক প্রহরের পর সালেহর ঘুম ভেঙ্গে গেল। কোন কিছুর আওয়াজেই মূলত ঘুম ভেঙ্গে গেল তার। ঘুম ভেঙ্গে যেতেই উল্কর্ণ হয়ে কানে ভেসে আসা শব্দের উৎস বোঝার চেষ্টা করল সালেহ। তারা যে পাহাড়ের ঢালুতে শুয়েছিল সেই পাহাড়ের নীচ দিয়ে কিছু সংখ্যক মানুষের চলাফেরার আওয়াজ শুনতে পেল সে। সে স্পষ্ট বুঝতে পেল ঘোড়ার খুড়ের শব্দ। মাথা উঁচু করে সে দেখতে পেলো। কিছু সংখ্যক লোক ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে। অবস্থা বুঝার জন্য সে হামাগুড়ি দিয়ে কয়েকগজ এগিয়ে এমন জায়গায় ঘাপটি মেরে থাকল যেখান থেকে অশ্বরোহীদের পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। কাফেলার আগে আগে এক লোক মশাল হাতে যাচ্ছে। অনেকগুলো লোক অশ্বরোহী। তাদের সাথে কয়েকটি উটের উপর কি যেন বোঝাই করা হয়েছে।
সালেহ দেখতে পেল কাফেলার মাঝামাঝি একজন দীর্ঘ দেহী স্বাস্থ্যবান লোক। লোকটির পোশাক পরিচ্ছদ দেখতে পুরোহিতের মতো। পুরোহিতের পিছনে পাঁচটি ঘোড়া বোঝাই করা। একটি অপরটির সাথে রশি দিয়ে বাধা। প্রথম ঘোড়াটির লাগাম পুরোহিতে হাতে। সবার পেছনের ঘোড়াটির সাথে দীর্ঘ রশি বাধা এবং সেই রশির সাথেই বাধা আরো আটদশজন লোক। তাদের প্রত্যেকের দু’হাত সামনের লোকের কাঁধে এবং সবার চোখেই পট্টি বাধা। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল পুরোহিত ছাড়া কারো চোখ খোলা ছিলো না। সবাই খুব ধীরে ধীরে সামনে অগ্রসর হচ্ছিল।
পুরোহিত ক্ষীণ আওয়াজে বলেছিল, চলো চলো, আমি দেখতে পাচ্ছি। চলতে থাকো, পথ পরিস্কার আছে কোন অসুবিধা নেই।
চোখ বাধা এই কাফেলা ধীরে ধীরে সামনে অগ্রসন হচ্ছিল। সালেহ এ ঘটনা দেখে ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়ে সঙ্গী তালালের কাছে এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিল এবং কানে কানে বললো, কোন শব্দ না করে হামাগুড়ি দিয়ে আমার সাথে এসো।
