যেই চিন্তা সেই কাজ। সেই দিবাগত রাতেই তিনি কনৌজের গোটা সোনাদানা এমনভাবে দুর্গের বাইরে স্থানান্তরের নির্দেশ দিলেন, যাতে এ ব্যাপারটি ঘুণাক্ষরেও কেউ আন্দাজ করতে না পারে।
রাধা যখন তার ও লক্ষণপালের ধরাপড়া এবং সুলতানের কাছে নীত হয়ে মুক্তি পাওয়ার ঘটনা তার বাবার কাছে বর্ণনা করলো, তখন তার বাবা সেটিকে মোটেও বিশ্বাস করলেন না। রাধার বাবা বরং তার কথাকে পাত্তা না দিয়ে বললেন, রাজপুতেরা অবশ্যই ভগ্নি হত্যার প্রতিশোধ নেবে।
এদিকে সুলতান মাহমূদ সেনাবাহিনীর একটি অংশকে মথুরায় রেখে বাকী সৈন্যদের কনৌজের দিকে অভিযানের নির্দেশ দিলেন। তিনি মথুরার পাশেই একটি জায়গায় যমুনা নদী পার হলেন এবং নদীর পাড় ধরে মুনাজের দিকে অগ্রসর হলেন।
এদিকে রাজপুতেরা জীবনমরণ লড়াইয়ের জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সুলতানকে তার গোয়েন্দারা আগেই জানিয়ে দিয়েছিলো, মুনাজের রাজপুতদের সাথেই তাদেরকে সবচেয়ে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, মুনাজের প্রতিটি শিশু ও নারী গযনী যোদ্ধাদের মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত।
৪.২ হৃদয়ের আয়নায় তাওহীদের আলো
কনৌজের চারপাশে ছিল ঘন-বনজঙ্গল। এ জঙ্গল কোন কোন স্থানে বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। জায়জায় জায়গায় ছিল পাহাড়, টিলা ও সমতল ভূমি। যমুনা নদীর তীরেই ছিল কনৌজ শহরের অবস্থান। কনৌজ দুর্গকে এমনভাবে তৈরী করা হয়েছিলো যে দুর্গের এক প্রান্তের দেয়াল ঐতিহাসিকদের ভাষায় যমুনার পানি বিধৌত হতো। সেই যুগে কনৌজ দুর্গ ছিল একটি বিখ্যাত দুর্গ। দূর-দূরান্তের মানুষ কনৌজের দুর্গ শহরের নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতো।
১০১৮ সালে সুলতান মাহমূদ মথুরা থেকে রওয়ানা হয়ে মুনাজের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। মুনাজ থেকে কনৌজের দূরত্ব ছিল প্রায় সোয়াশো মাইল। কনৌজ থেকে চার পাঁচ মাইল দুরে ঘন জঙ্গলের পাশে জনমানবহীন এলাকার একটি পাহাড়ের ঢালে উপজাতীয় পোশাকে দু’জন লোক বসেছিল। এদের এক জনের নাম তালাল আর অপরজনের নাম সালেহ। তখন পশ্চিমাকাশে সূর্য শেষ আলো বিকিরণ করে অস্ত যেতে শুরু করেছে। এমন সময় দু’জনের একজন তার সঙ্গীকে বললো রাতটা আমরা এখানেই কাটিয়ে দেবো।
আমরা কনৌজ থেকে এলাম আজ তিন দিন হলো। কিন্তু কোথাও আমরা কনৌজ কিংবা কোন হিন্দু রাজা মহারাজার সৈন্যদের দেখা পেলাম না। তার মানে কি এটা যে, আমাদের সৈন্যদের আগমনের খবর পাওয়ার পর কনৌজের সৈন্যরা দুর্গের বাইরে আসবে? বললো তালাল।
আমাদের সৈন্যরা আসা পর্যন্ত আমাদেরকে এই অঞ্চলেই থাকা উচিত তালাল ভাই। বললো তালালের সঙ্গী সালেহ।
সে তালালের উদ্দেশ্যে আরো বললো, হায় আমাদের এ অঞ্চলেই থাকতে হবে এবং কনৌজের সেনাবাহিনীর বাইরে আসা দেখে এখান থেকে যেতে হবে। সুলতানকে বলা হয়েছে, তিনি যদি মুনাজ আক্রমণ করেন, তাহলে কনৌজের সৈন্যরা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করতে পারে। সুলতানকে একথাও বলা হয়েছে, আমাদের মূল লড়াইটা হবে মুনাজ ও কনৌজের মাঝামাঝি স্থানে। তাই আমাদেরকে দেখতে হবে কনৌজের কোন সৈন্যরা আমাদের সৈন্যদের উপর পেছন দিক থেকে আঘাত হানে!….. আরে তালাল ভাই! মনে হচ্ছে তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
নারে সালেহ! এতো জলদী ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার লোক আমি না। আমার মনে হচ্ছে দুর্গের বাইরে এসে লড়াই করার মতো সাহস কনৌজ রাজার নেই।
এটাইতো আমাদের নিশ্চিত হতে হবে, আসলেই কি কনৌজ রাজার এই সাহস আছে কি না, বললো সালেহ। আমরা হলাম গযনী সুলতানের দুটি চোখ। আমাদেরকে দেখতে হবে এই জঙ্গল ঝুঁকিমুক্ত না এখানে কোন ঝুঁকি আছে।
তাহলে এসো এখানেই শুয়ে পড়ি। ঠান্ডাটা একটু বেশী। তবুও রাতটা কোনমতে কাটিয়ে দেয়া যাবে, বললো তালাল।
তালাল ও সালেহ ছিল হিন্দুস্তানী মুসলমান। সালেহ ছিলো সেইসব আরবদের বংশধর যারা মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সাথে হিন্দুস্তানে এসে আর আরব দেশে ফিরে যায়নি। আর তালালের পূর্ব পুরুষরা ছিল অমুসলিম। মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সময় তার পূর্ব পুরুষরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
সুলতান মাহমূদ যখন ভারত অভিযান শুরু করলেন, তখন ভারতের অভ্যন্তরীন অবস্থা জানার জন্যে তার স্থানীয় বিশ্বস্ত লোকের দরকার হলো। একাজে তিনি স্থানীয় মুসলমানদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তার বৈদেশিক গোয়েন্দা শাখায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিলেন।
দেশের ভেতরে থেকে বিদেশী শক্তির জন্যে গোয়েন্দাদের দায়িত্ব পালন করা সাধারণ সৈনিকের মতো সহজ ছিলো না। তরবারী ও অশ্বচালনায় পারদর্শিতা দেখাতে পারলেই সেনাবাহিনীতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যেতো। কিন্তু গোয়েন্দার কাজের জন্যে সৈনিকের মতো অশ্বচালনা ও তরবারীতে পারদর্শিতার পাশাপাশি অত্যন্ত মেধাবী ও দূরদর্শিতা থাকতে হতো। কারণ, গোয়েন্দাকে হতে হয় চলন-বলনে বিশেষ পারদর্শী, থাকতে হয় যে কোন অবস্থা ও পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা। সেই সাথে যে কোন প্রাকৃতিক ও সামাজিক বৈরী পরিবেশে ও পাহাড়, জঙ্গল, মরু, পানি, চরম শীত, প্রচণ্ড গরম তথা সকল প্রতিকুলতা উপেক্ষা করে কয়েক দিন পর্যন্ত টিকে থাকার মতো দৈহিক সামর্থও তার থাকতে হয়।
গোয়েন্দা কাজের জন্য সব চেয়ে বড় যোগ্যতার ব্যাপার ছিল, গোয়েন্দাকে হতে হতো লোভ লালসাহীন, আবেগ বিরাগ নিয়ন্ত্রণের অধিকারী। গোয়েন্দাদেরকে ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন এবং চিতা বাঘের মতো ক্ষিপ্রতার অধিকারী হতে হয়। সবচেয়ে বেশী থাকতে হতো নির্ভেজাল ঈমান।
