আমাকে হত্যার চেষ্টা করাই তোমাদের সব তৎপরতায় সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল। তোমরা সেই চেষ্টা করেছে। অবশ্য একাজে তোমাদের সাফল্য ও ব্যর্থতা তোমাদের কৃষ্ণদেবী ও বসুদেবের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না। আমার জীবন মৃত্যু সম্পূর্ণ আমাদের আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আমরা সেই আল্লাহর ইবাদত করি যার পয়গাম পৌঁছাতেই আমরা এ দেশে এসেছি। আমরা এ দেশের মানুষের কাছে সেই মহান একক সত্তার পবিত্র পয়গাম পৌঁছে দিতে চাই। যিনি নিরাকার। যার সত্তা মাটি পাথর কাঠ বা ধাতবের তৈরী নিষ্প্রাণ সত্তা নয়। যিনি পানাহার করেন না। যিনি মানুষের দেয়া খাবার গ্রহণ করেন না। যার কোন স্ত্রী সন্তান নেই। যার কোন উত্তরাধিকার নেই। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। সব কিছুর স্রষ্টা তিনি। মানুষের জীবন মৃত্যু যার ইচ্ছদীন।
সুলতান মাহমূদ তার দুভাষীকে বললেন, এই তরুণীকে বলে দাও, সে যেন এই তরুণীর বাবাকে গিয়ে বলে, আমি মুনাজের রাজপুতদের বীরত্ব ও বাহাদুরীর অনেক গল্প শুনেছি। কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন কোন জাতির কোন তরুণীকে শত্রু ঘায়েল করার জন্যে অর্ধ উলঙ্গের পোষাক পরে শত্রুকে নারীর মায়াবী ফাঁদে ফেলার জন্যে চক্রান্তের খুঁটি বানাতে পারে না। এটা যেকোন মর্যাদাবোধ জাতির বীর পুরুষদের জন্যে চরম লজ্জাস্কর ….।
আর এই তরুণীকে বলল, সে যেনো তার বাবাকে গিয়ে বলে, আমরা অচিরেই কনৌজ আসছি। আমাকে হত্যা করার জন্যে সাহস থাকলে সে যেনো আমার মুখোমুখি হয়। এই তরুণীকে আরো বলে দাও, ইচ্ছা করলে তার বাবার কাছ থেকে আনুগত্য আদায় করতে আমরা তাকে বন্দী করে রাখতে পারতাম। কিন্তু আমরা অপহরণকারী নই। আমরা লড়াকু। প্রতিপক্ষের আনুগত্য আমরা সম্মুখ সমরে শত্রুকে পরাজিত করেই আদায় করে থাকি। কোন নিরীহ লোককে অপহরণ করে কাউকে বেকায়দা ফেলে কাপুরুষের মতো আমরা শত্রুর কাছ থেকে কিছু আদায় করি না।
দুভাষী সুলতানের কথাগুলো লক্ষণের ভাষায় লক্ষণকে বুঝিয়ে দিল। এরপর সুলতান বললেন, এই রাজকুমারকে আরো জানিয়ে দাও, এই বন্দীত্বকে পুঁজি করে আমরা তার কাছ থেকে কনৌজের কোন গোপন বা অজানা তথ্যও জানতে চাইবে না। কারণ, আমরা কনৌজের সব খবরই জানি। কনৌজের ভেতরে বাইরের সব খবরই আমাদের জানা।
লক্ষণপাল অপলক নেত্রে সুলতানের দিকে তাকিয়ে ছিল। আর মনে মনে আতংকগ্রস্ত ছিল, না জানি সুলতান তাদের ব্যাপারে কি ফয়লাসা দেন। রাধাও অবাক বিস্ময়ে সুলতানের চেহারার দিকেই তাকিয়ে ছিল।
সুলতান মাহমূদ দুভাষীর উদ্দেশ্যে বললেন, এদের বলে দাও, এরা যেনো তাদের বাবাকে গিয়ে বলে, যুদ্ধ ছাড়াই যাতে আমাদের হাতে দুর্গ তুলে দেয়। যুদ্ধ করে যদি আমাদের দুর্গ জয় করতে হয় তবে তাদের পরিণতি হবে শোচনীয়।
এরপর সুলতান নির্দেশ দিলেন, এদেরকে তাদের শহরের কাছাকাছি নিরাপদ জায়গায় রেখে এসো এবং তাদের ঘোড়া ও খচ্চর তাদের সাথেই ফিরিয়ে দাও।
আতংক ও ভীত বিহ্বল অবস্থায় লক্ষণপাল ও রাধা সুলতানের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। দুভাষী যখন তাদের মুক্তির কথা শোনালো তখন ঘটনার আকষ্মিকতায় মুক্তির উচ্ছ্বাসে লক্ষণ উঠে গিয়ে সুলতানের হাত ধরে চুমু খেল আর বিস্ফারিত নেত্রে রাধা সুলতানের সৌম্য কান্তিময় গাম্ভীর্যপূর্ণ চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলো। যেনো রাজ্যের বিস্ময় তার চোখের সামনে অভাবনীয় সব দৃশ দেখাচ্ছে।
ভারত অভিযান ও ৫৫
কিছুক্ষণ পরে লক্ষণ পাল ও রাধাকে দশ বারোজন সিপাহীর প্রহরাধীনে তাদের বাড়ীতে পৌঁছে দেয়ার জন্য পাঠানো হলো। এই দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়া হলো একজন সেনা কমান্ডারকে। দীর্ঘ সফরের পর এই সেনাদল মুনাজ দুর্গের অদূরে রাধাকে ছেড়ে দিল এবং লক্ষণকে কনৌজের কাছের একটি জায়গায় পৌঁছে দিয়ে মথুরার দিকে ফিরে আসতে লাগল।
ব্যর্থতার গ্লানি ও এক বুক হতাশার বোঝা কাঁধে নিয়ে মুসলিম যোদ্ধাদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে লক্ষণ গিয়ে তার বাবা কনৌজের রাজা রাজ্যপালের সম্মুখে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে সে জানাল তার সফরের ইতিবৃত্ত। সে আরো বললো–
বাবা আমি আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি, সুলতান মাহমুদের মোকাবেলায় বিজয়ী হওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি কোন অবস্থাতেই তাকে পরাজিত করতে পারবেন না।
মহারাজ! আমি গযনী সুলতানে চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেছি তার চোখে এক যাদুকরী আকর্ষণ ক্ষমতা রয়েছে। তার সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য এবং কর্মকর্তা কোন মাটির মানুষ নয়। মনে হয় এরা অন্য কোন ধাতুর তৈরী। তাদের অব্যাহত বিজয় ও সাফল্যের রহস্য শুধু যুদ্ধ পারদর্শিতা নয়। গোটা হিন্দস্তানের কোথাও এমনটি শুনিনি যে, রাধার মতো সুন্দরী শত্রুপক্ষের কোন তরুনীকে নিজের কজায় পেয়েও শত্রুপক্ষ এভাবে অক্ষত অবস্থায় সসম্মানে বাবা মার কোলে পৌঁছে দিতে পারে। সেই সাথে চরমতম শত্রু প্রতিপক্ষের রাজার ছেলেকে বাগে পেয়েও তাকে আটক করে স্বার্থোদ্ধার না করে সসম্মানে বাড়ী পৌঁছে দেয়ার চিন্তা করতে পারে।
লক্ষণপাল যখন তার বাবা রাজ্যপালকে গযনীবাহিনীর হাতে তার ধরা পরা এবং সুলতানের কাছে নীত হয়ে আবার ফিরে আসার গোটা কাহিনী শোনালো, তা শুনে রাজ্যপালের বিস্ময়ের অবধি রইলো না। এরপর থেকে রাজ্যপালের চিন্তা ভাবনা সম্পূর্ণ বদলে গেলো। তিনি কনৌজের গোটা সোনাদানা দুর্গের বাইরে স্থানান্তরিত করার চিন্তা করলেন।
