আরে বোকা ছেলে! আমরা যদি পুরস্কারের লোভী হতাম তাহলে এই সুন্দরী তরুণীই ছিল আমাদের জন্যে পুরস্কারের জন্যে যথেষ্ট। তাছাড়া তোমাদের আসবাবপত্র থেকে আমরা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা পেয়েছি। ইচ্ছা করলে এগুলোও আমরা চারজন ভাগ বাটোয়ারা করে নিতে পারতাম। তুমি আমাকে কনৌজ নিয়ে যেতে চাচ্ছে। আমরা তো কনৌজ থেকেই ফিরছি। আমাদেরকে তোমার কনৌজ নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই, আমরাই আমাদের ঘোড়াগুলোকে কনৌজের সোনা দানা দিয়ে বোঝাই করে নেবো। তোমার কোন পুরুস্কারের দরকার আমাদের নেই। আমরাই বরং তোমাকে পুরস্কৃত করতে চাচ্ছি। সত্যি সত্যি তোমার পরিচয় এবং এখানে আসার উদ্দেশ্য বলে দাও এবং পুরস্কারস্বরূপ তোমার জীবন ও এই তরুণীকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে যাও। বললো, ডেপুটি সেনাপতি।
ডেপুটি সেনাপতির তিন সঙ্গীসহ লক্ষণ ও রাধাকে নিয়ে ছোট্ট কাফেলাটি ঘোড়ায় সওয়ার হয়েই নদী পার হলো। পথিমধ্যে তারা অনেক জঙ্গল ময়দান পেরিয়ে এলো। দিন শেষে রাতের অন্ধকার নেমে আসার পরও তাদের পথচলা বন্ধ হলো না। পথিমধ্যে দীর্ঘ ভ্রমনের ক্লান্তি দূর করার জন্যে তারা এক জায়গায় একটু বিশ্রামের জন্যে যাত্রা বিরতি করল। কিন্তু এই দীর্ঘ পথে রাধার সাথে কেউই কোন কথা বললো না। মথুরার সীমানা পর্যন্ত পৌঁছতে এই কাফেলার প্রায় অর্ধেক রাত হয়ে গেল।
ডেপুটি সেনাপতি পথিমধ্যে লক্ষণপালের সাথে তেমন কোন কথা বলেননি। তিনি শুধু কয়েকবার বলেছিলেন, সে যেনো সত্যি ঘটনা আড়াল করার অপচেষ্টা না করে। প্রকৃত সত্য বলে দেয়। তাহলে তার ও তার সঙ্গীনীর জীবন ভিক্ষা দেয়া হবে এবং তাদের উপর কোন ধরনের অত্যাচার করা হবে না।
জবাবে লক্ষণপাল ছেড়ে দেয়ার জন্যে তাদেরকে পুরস্কারের লোভ দেখানো ছাড়া আর কিছু বলেনি। কিন্তু মধ্য রাতের দিকে কাফেলা যখন মথুরার সীমানায় পৌঁছাল তখন লক্ষণপাল এগিয়ে গিয়ে ডেপুটি সেনাপতির হাত ধরে বিনয়ের সাথে বললো,
আমি সত্যি কথা বলে দিচ্ছি ….. আপনি আগে আমার কথা শুনুন। আমি এই কাফেলা নিয়ে আপনাদের সুলতানকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। একথা বলার পর তার আদিঅন্ত প্রস্তুতি ও পরিকল্পনাসহ পুরো ঘটনা সে ডেপুটি সেনাপতিকে জানাল। অবশ্য শিলা কিভাবে কুমিরের শিকারে পরিণত হলো এবং তার দুই সঙ্গী কাদের তীরের আঘাতে নিহত হলো এ ব্যাপারে সে কিছুই জানাতে পারলো না। লক্ষণ আরো বললো, আপনারা মনে করবেন না, আপনাদের শাস্তির ভয়ে আমি সব কথা বলে দিচ্ছি। কিংবা আমার জীবন বাঁচানোর জন্য আমি আপনাদের সব জানিয়ে দিচ্ছি। আপনার উন্নত নৈতিকতা এবং আদর্শিকতায় বিমুগ্ধ হয়ে বিবেকের তাড়নায় আমি আপনাদের কাছে সত্যি কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি। আমি আপনাদেরকে আমাদের ছেড়ে দেয়ার বদলে বিপুল পরিমাণ উপঢৌকনের প্রস্তাব দিয়েছি। যে কোন পেশাদার সৈনিকের জন্যে এমন মোটা পুরস্কারেরর লোভ সংবরণ করা কঠিন। তাছাড়া সারা দিন কতো জঙ্গল কতত জনমানবহীন মরুময় এলাকা আমরা পেরিয়ে এসেছি। আমার আশংকা ছিলো এই তরুণীকে আপনার সৈন্যরা অক্ষত রাখবে না। কিন্তু দীর্ঘ সফরে আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, আপনি ও আপনার সঙ্গীদের কজায় এমন অনিন্দ সুন্দরী তরুণী রয়েছে ইচ্ছা করলেই যাকে আপনারা ভোগ করতে পারতেন। অথচ আপনাদের পথ চলায় মনে হয়েছে। আপনাদের সাথে যে এই তরুণী আছে এই বিষয়টি যেনো আপনারা ভুলেই গিয়েছিলেন। অথচ এমন সুন্দরী তরুণী হয়তো আপনারা গযনীতে জীবনেও দেখেননি। অপর দিকে গোটা পথ অতিক্রমের সময় আপনারা আমাদের প্রতি কোন বিরূপ আচরণ তো দূরে থাক একটি কথাও বলেননি। আমি এ থেকে বুঝে গেছি আপনাদের অব্যাহত বিজয়ের রহস্য। যাক, আমি আপনার প্রস্তাব মতো সত্য ঘটনা বলেদিলাম… এবার আপনি আপনার পুরস্কার দিন। আমি শুধু এতটুকু পুরস্কার আপনার কাছে প্রত্যাশা করছি, প্রয়োজনে আমাকে জল্লাদের হাতে তুলে দিন কিন্তু এই মেয়েটিকে নিরাপদে তার মা বাবার কাছে পাঠিয়ে দিন। …
আপনি এই তরুনীর সাহসিকতার দিকটি দেখুন। আপনারা যদি সত্যিকার অর্থেই বীরের জাতি হয়ে থাকেন, তাহলে এক জাত্যাভিমানী পিতার আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন কন্যার সাহসিকতাকে সম্মান করুন। কারণ, এই মেয়েটি এখনো কুমারী। আবেগ ও আত্মমর্যাদাবোধের আতিশয্যে আমাকে উৎসাহিত ও উজ্জীবিত রাখার জন্যে সে এই অভিযানের সঙ্গী হয়েছিল। মূলত এ জন্য এর কোন কসূর বা অন্যায় নেই। সব কসূর আমার।
আমি তোমাকে এই আশ্বাস দিতে পারি এই তরুণী যেমন আছে তেমনি থাকবে এবং তোমাকেও জল্লাদের তরবারীর নীচে দাঁড়াতে হবে না। বললেন ডেপুটি সেনাপতি। স্বেচ্ছায় সত্যি ঘটনা বলে দেয়ার জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। সেই সাথে অপরিণাম দর্শী আবেগ তাড়িত এই অভিযানের মতো বোকামীতে সম্মতি দেয়ার জন্যে তোমাদের অভিভাবকদের ধিক্কার দিচ্ছি।
রাত পোহালে সকালেই লক্ষণপাল ও রাধাকে সুলতান মাহমূদের সামনে পেশ করা হলো। সুলতান লক্ষণপালের মুখ থেকে তার অভিযানের কথা শুনে বললেন,
তুমি কোন অন্যায় করোনি রাজকুমার। আমরা তোমাকে জল্লাদের হাতে তুলে দেবো না। তোমার মতো সাহসী তরুণের আবেগ, স্বজাতির প্রতি মর্যাদাবোধকে আমরা সম্মান করি। মৃত্যুদণ্ড তো দূরের কথা এজন্য আমরা তোমাদের এতটুকু ভর্ৎসনাও করবো না। তোমাদের মতো আত্মর্যাদাবোধ সন্ন শক্রকে আমরা অসম্মান করি না। ….
