হঠাৎ রাধা তার আসবাবপত্রের দিকে ছুটে গেল।
গযনী যোদ্ধারা তার কাণ্ড বেশ মজা করেই দেখতে লাগল। আসবাবপত্রের মধ্য থেকে সে একটি ছোট্ট কৌটা খুলল এবং সেটি থেকে হাতে কিছু একটা নিয়ে আরো দূরে চলে যাওয়ার জন্যে ছুটতে লাগলো।
এক কমান্ডার দৌড়ে তাকে ধরে ফেলল এবং তার হাতের কোটাটি ছিনিয়ে নিয়ে ডেপুটি সেনাপতির কাছে দিল। ডেপুটি সেনাপতি সেটিকে হাতে নিয়ে রাধাকে জিজ্ঞেস করলেন, এটি বিষ নয় কি? শোন তরুনী তোমার এই দৌড় ঝাঁপ পালানোর চেষ্টা অর্থহীন। তুমি এখন আমাদের হাতে বন্দী। তোমাকে আমাদের জিজ্ঞাসার জবাব দিতেই হবে। কি ভাবে তোমার কাছ থেকে জবাব বের করতে হয় তা আমরা জানি। তবে আশা করি নিজের স্বার্থেই তুমি আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেবে। কারণ, আমরা কখনো অসহায় কোন নারীর ক্ষতি করি না।
ডেপুটি সেনাপতির নির্দেশে এক কমান্ডার রাধাকে তার ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে লাগাম নিজের হাতে নিয়ে নিল। রাধাকে রাখল তার সামনে। যাতে ছুটন্ত ঘোড়া থেকে পালাতে গিয়ে সে আবার কোন দুর্ঘটনা ঘটনাননার অবকাশ না পায়।
এ দিকে নৌকার খোঁজ করতে গিয়ে অনেকক্ষণ নদীর তীর ধরে হেঁটেও লক্ষণপাল কোন নৌকার খোঁজ পেলো না। তার চোখে পড়লো না কোন মাঝি মাল্লা। অবশেষে হতাশ হয়ে ভগ্ন মনে সে তার সঙ্গীদের কাছে ফিরে আসতে লাগল।
লক্ষণ যখন ঝিলসদৃশ নদীর তীরের কাছে আসল তখন তার চোখে পড়ল একটি কুমির একটি আস্ত মানুষকে মুখের ভেতর থেকে উপড়ে ফেলছে। কুমিরের খাবারের রীতি হলো বড় কোন শিকার পেলে ওরা আগে সেটিকে বিশাল মুখ গহবরে আটকে মেরে ফেলে এবং মেরে সেটিকে আবার শুকনো জায়গায় উগড়ে ফেলে রাখে। কয়েকদিনে শিকারটি পচে গলে নরম হওয়ার পর ধীরে ধীরে সেটিকে সাবার করে।
শিলাকে মুখের ভেতরে আটকে মেরে ফেলার পর কুমির পানি থেকে ডাঙ্গায় উঠে তাকে উগড়ে দিচ্ছিল। লক্ষণ পাল দূরে থেকেই দেখতে পেল, যে জিনিসটি কুমির উগড়ে ফেলছে সেটি একটি নারী দেহ। যার পরনে নারীর পোষাক এবং মাথায় দীর্ঘ চুল…. নারীদেহ দেখে তার শরীর কেঁপে উঠলো। সে ভাবতেই পারছিল না, এটি শিলার দেহ হতে পারে। বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য লক্ষণ একটি উঁচু মাটির টিবিসম ছোট্ট টিলার উপরে উঠে এদিকে তাকাল। কুমির তখন শিলাকে সম্পূর্ণ উপরে ফেলেছে। বিশাল জন্তুটার দু’পাটি দাঁতের আঘাত ছাড়া শরীরে তেমন কোন জখম নেই। অনেকটাই অক্ষত শরীর। প্রায় অক্ষত চেহারা। সে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছে মরদেহের অবয়ব। হায় এ যে তার ই প্রেমাস্পদ শিলার মরদেহ।
ঠিক এ সময় আরেকটি কুমির দৌড়ে এসে মরদেহটিতে হামলে পড়ল। প্রথম কুমিরটি তার শিকারে ভাগ বসানোকে সহ্য না করে প্রতিপক্ষের উপর হামলে পড়ল। আক্রান্ত কুমির শিলার একটি পা দাঁতে চেপে টানতে লাগল। তখন শিকারী কুমির তার শিকার কজায় রাখতে অপর পা ধরে ফেলল। দুই প্রতিপক্ষের টানাটানিতে মরদেহটি শূন্য সোজা হয়ে গেল এবং এক পর্যায়ে উভয় জন্তুর শক্তি প্রয়োগে তা ছিঁড়ে দুভাগ হয়ে গেল।
অবস্থা দেখে লক্ষণের মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। সে হাতে মাথা চেপে ধরে টিলার অপর দিকে নীচে নামাতেই তার দুই সৈনিক সাথীকে পড়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পেলো। নিশ্চল নিথর তাদের দেহ। উভয়ের চোখে বিদ্ধ তীর।
হতবিহ্বল অবস্থায় লক্ষণ দুই সঙ্গীর লাশের দিকে তাকিয়ে রইল। সে দৃশ্যমান ঘটনার পেছনে কি ঘটেছে কিছুই ঠিক বুঝতে পারছিল না। এ সময় তার কানে ভেসে এলো রাধার আর্তচিৎকার। লক্ষণ পাল!
চিৎকার শুনে ভেসে আসা আওয়াজের দিকে তাকিয়ে লক্ষণ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। রাধা কয়েকজন গযনী সেনার কজায় বন্দী। কোন কিছু চিন্তা না করে নিজের জীবন বাঁচানোর জন্যে যেই লক্ষণ দৌড় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল তার কানে ভেসে এলো গযনী বাহিনীর ডেপুটি সেনাপতির হুমকি–
পালানোর চেষ্টা করো না ছেলে! তুমি ঘোড়ার চেয়ে বেশী দৌড়াতে পারবে না। বাঁচতে চাও যদি পালানোর চেষ্টা না করে এ দিকে এসো।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা আন্দাজ করে লক্ষণ পালানোর চেষ্টা থেকে বিরত রইলো। গযনীর তিন কমান্ডার তাকেও বন্দী করে ফেললো এবং ডেপুটি সেনাপতি লক্ষণকে একটি ঘোড়ায় সওয়ার করিয়ে সবাইকে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলো। তারা লক্ষণের জিনিসপত্রসহ তাদের ঘোড়া খচ্চর ও হরিণ দুটিও সাথে নিল।
লক্ষণপালকে সবার পেছনে রাখা হলো। লক্ষণের পেছনে তার পাশাপাশি চলতে লাগল দলপতি ডেপুটি সেনাপতি।
ডেপুটি সেনাপতি যেতে যেতে লক্ষণকে বললো, এই তরুণী আমাকে সবই বলে দিয়েছে। তাই তাকে আমরা সসম্মানে মথুরা নিয়ে যাচ্ছি। তুমি তার প্রতি লক্ষ রাখবে কেউ তার গায়ে হাত দেয় কিনা? কিন্তু এই তরুণীর মান সম্মান এখন তোমার হাতে। আমরা চাই তুমি যা বলবে সত্য বলবে। তুমি যদি মিথ্যা বলো, তাহলে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না ওর সাথে কি আচরণ করা হবে। দেখো, যদি আমি এ মুহূর্তে এখানে না থাকতাম, তাহলে এই তিন যোদ্ধা ওকে এতো সম্মানে রাখতো না। নিশ্চয়ই রহস্য উদঘাটনে মারধর করতো। বলল রাজকুমার! কনৌজের রাজকুমার উপজাতীয় পোষাকে এখানে কি উদ্দেশ্যে এসেছে?
আপনি আমাদের ছেড়ে দিলে আপনি যা চাইবেন আমরা আপনাকে সেই পরিমাণই উপঢৌকন দেবো, বললো লক্ষণপাল। আপনারা সবাই আমাদের সাথে কনৌজ চলুন। আপনাদের সবার ঘোড়াকেই আমি স্বর্ণ দিয়ে বোঝাই করে দেবো।
