রাধাকে লুটিয়ে পড়তে দেখে তারালোচন পাল রাধাকে ধরার জন্যে এগুতে চাচ্ছিল তখন তার দুই সঙ্গী এই বলে তাকে সতর্ক করলো; সাবধান রাজকুমার! মুসলমান যোদ্ধারা আসছে! আপনি ঝোঁপের আড়াল থেকে বের হবেন না। সাথে সাথে তারালোচন পাল জায়গা ছেড়ে আরো ঘন ঝোঁপ ঝাড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর গমনী বাহিনীর চার যোদ্ধা ঠিক সেই জায়গাটিতে এসে থমকে দাঁড়াল যে জায়গাটি থেকে তারালোচন পাল পালিয়ে ছিল।
তরলোচন পালকে যদি তার দুই সঙ্গী সতর্ক না করতো তাহলে তারালোচনকে মুসলিম যোরা পাকড়াও করতে পারতো। তা করতে পারলে বিরাট কাজ হতো তাদের। তারালোচনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা ভীমপালের অবস্থান জেনে নিতে পারতো। অল্পের জন্য বিরাট একটি শিকার হাত ছাড়া হয়ে গেল গযনী যোদ্ধাদের।
এরই মধ্যে গযনী যোদ্ধাদের কানে ভেসে এলো ঘোড়া হাঁকানোর শব্দ। নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে মুসলিম যোদ্ধাদের কবল থেকে প্রাণ বাঁচাতে উধশ্বাসে ঘোড়া ছুটিয়ে পালালি তালোচন পাল ও তার দুই সঙ্গী।
গযনীর চার যোদ্ধার মধ্যে একজন ছিলো ডেপুটি সেনাপতি। আর বাকী তিনজন তার অধীনস্থ তিন কমান্ডার।
এরা ছিলো গোয়েন্দা কাজে লিপ্ত। মথুরা থেকে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়েই তারা নদী পার হয়েছে। কনৌজ অভিযানের আগে নদী ও আশপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য তারা এদিকে এসেছিল। তা ছাড়া মথুরার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে সম্ভাব্য কয়েকটি চৌকি স্থাপনের সুবিধাজনক জায়গা নির্বাচন করার বিষয়টিও তাদের উদ্দেশ্য ছিল।
তারা যখন নদী পেরিয়ে জঙ্গলের ভেতরের ঝিল সদৃশ নদীর অংশে পৌঁছলো, তখন তাদের নজরে পড়ল একটি অচেতন নারীদেহ। সেখান থেকে খানিকটা দূরে তাদের নজরে পড়ল একটি কুমির। কুমিরটি কিছুটা পানিতে নেমে আছে। কুমিরের মুখে একটি মানুষের হাত ঝুলছে এবং নারীর চুল সদৃশ একটি অবয়ব দেখা যাচ্ছে।
ডেপুটি সেনাপতি কুমিরের দিকে ঘোড়া হাকাল, কিন্তু অশ্বরোহীদের দেখে জলহস্তি পানিতে ডুবে গেল। একটু দূরে পড়ে থাকা অচেতন রাধাকে দেখে সঙ্গীদেরকে ডেপুটি সেনাপতি বললো, মনে হয় অচেতন এই মহিলা কোন জঙ্গলী পরি হবে। একে ঘোড়ায় তুলে নিয়ে চলো।
রাধাকে ঘোড়ায় তুলে নিয়ে তারা এদিক ওদিক দেখতে লাগলো, নিশ্চয় এই নারীর সাথে আরো কেউ থাকতে পারে। আশপাশে চোখ বুলালে তাদের নজরে পড়লো, দুটি মৃত দেহ। উভয়ের চোখে একটি করে তীর বিদ্ধ। একটু এগিয়ে তারা দেখতে পেলো একটি জায়গায় পাঁচটি ঘোড়া দুটি খচ্চর এবং দুটি হরিণ বাঁধা রয়েছে। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পেলো, তিন জায়গায় তিনটি বিছানা বিছানো। সেখানে পড়ে থাকা আসবাবপত্র তল্লাশী করার পর তারা ঝোলাটির ভেতরে তরবারী, খঞ্জর এবং অসংখ্য স্বর্ণমুদ্রা পেল। ঝোলার ভেতরে তারা এমন কিছু জিনিসপত্রও পেলো যেগুলো তাদের মনে ব্যাপক জিজ্ঞাসা ও সন্দেহের জন্ম দিলো। ডেপুটি সেনাপতি ছিলেন বয়স্ক ও অভিজ্ঞ সৈনিক। তিনি অচেতন রাধাকে গভীরভাবে দেখে বললেন, এই তরুণী কোনভাবেই জঙ্গলবাসী কোন উপজাতি নয়। তিনি রাধাকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে চোখে মুখে পানির ঝাঁপটা দিলেন এবং মাথায় কিছুটা পানি ঢেলে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে রাধা চোখ মেলল। চোখ মেলেই সে উঠে বসে তার পাশে কে বা কারা অবস্থান করছে এ সবের দিকে না তাকিয়েই চিৎকার জুড়ে দিল শিলা! লক্ষণপাল! রাজকুমার! ডাকতে ডাকতে হঠাৎ দৌড় দিল রাধা।
দেরি না করে ডেপুটি সেনাপতি দৌড়ে থাবা দিয়ে তাকে ধরে বললেন, তুমি কোন রাজকুমারকে ডাকছে:
রাধা কোন কিছু চিন্তা না করেই বলে ফেললো, কনৌজের রাজকুমার লক্ষণপাল, তোমরা কি তাকে দেখেছো? এটুকু বলেই সে নীরব হয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তার কথাবার্তা ও সার্বিক অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেল। রাধা বলতে লাগল, আমি কনৌজের কাছের একটি উপজাতীয় গোত্রের মেয়ে। আমরা মুসলমান হওয়ার জন্য গযনী সুলতানের কাছে যাবো।
তোমাদের গোত্রের নাম কি? জিজ্ঞেস করলেন ডেপুটি সেনাপতি। তোমাদের গ্রামটি কনৌজ থেকে কত দূর?
এ প্রশ্নে রাধা হতবাক হয়ে গেল। এমন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হলো না। কারণ, তাদের প্রশিক্ষকদের কেউ একথাটি বলেনি, প্রতিটি উপজাতীয় গোত্রেরই একেকটি নাম পরিচয় থাকে। রাধা যখন নিজেকে উপজাতীয় বলে পরিচয় দিলো, তখন ডেপুটি সেনাপতি রাধার উদ্দেশ্যে বললেন,
শোন তরুনী! আমি গযনীর বাসিন্দা। কিন্তু আমি তোমার ভাষায় কথা বলছি। তা থেকে তুমি বুঝে নিতে পারো আমি তোমাদের এলাকার নাড়ি নক্ষত্র জানি। আমি এখনই কনৌজ ও আশপাশের সমস্ত এলাকা দেখে এসেছি। আমি কনৌজের ধারে কাছে এমন কোন উপজাতি এলাকা দেখিনি যেখানে তোমার মতো সুন্দরী তরুণী থাকতে পারে।
হঠাৎ করে রাধার মধ্যকার রাজপুতের রক্ত জেগে উঠলো। সে ডেপুটি ও সহযোদ্ধাদের হুমকি দিয়ে বললো, সাবধান! তোমরা কেউ আমাকে স্পর্শ না, আমি তোমাদের হাতে ধরা দেবো না। জীবন্ত থাকা অবস্থায় তোমাদের কেউ আমার গায়ে হাত দিতে পারবে না।
আচমকা ডেপুটি সেনাপতি রাধার বাজু ধরে বললেন, তোমার সৌভাগ্য যে তুমি আমার হাতে ধরা পড়েছে। তুমি এতো সুন্দরী! তার উপর এমন অর্ধনগ্ন উপজাতীয় পোশাক পরেছে যাতে রূপ সৌন্দর্য আরো বেশী ফুটে উঠেছে। এ অবস্থায় এই বিজন জঙ্গলে কোন নারী লোভী পুরুষ তোমাকে পেলে তোমাকে মা-বোনের দৃষ্টিতে দেখবে না। আমি তোমাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি, আমার দ্বারা তোমার কোন ক্ষতি হবে না। তুমি যদি আমাকে যাচাই করতে চাও, তাহলে আমি তোমাকে এই তিনজনের হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যাণে, এদেরকে তুমি ভালোভাবে চিনে নাও। আর যদি তুমি নিজের মঙ্গল চাও, তাহলে বলো: কে তুমি? কোত্থেকে এসেছে? রাজকুমার লক্ষণপাল এখন কোথায় আছে? কে এবং কোন উদ্দেশ্য তোমরা এখানে এসেছো?
