আমি কারো হবু বধূ নই। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো শিলা। যে সুলতান মাহমুদকে হত্যা করতে পারবে আমি হবো তার স্ত্রী। আর সে কাজ একমাত্র লক্ষণ পালের পক্ষেই করা সম্ভব। লক্ষণ যদি সেই কাজ করতে গিয়ে নিহত হয় তবে আমি নিজেই মাহমূদকে হত্যা করবো। নয়তো রাধা সেই কাজ সমাধা করবে। তুমি জেনে রাখো, এই লুটেরার জীবন মৃত্যু এখন আমার হাতের মুঠোয়।
হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত পিষে দৃঢ় কণ্ঠে শিলা বললো–
আমার হাত মেহেদীর রঙ্গে নয় মাহমূদের তাজা রক্তে রঙ্গিন হবে। মুনাজের কোন রাজপুত তরুনীকে কোন মুসলমান সেবাদাসীতে পরিণত করতে পারবে না। এটা তোমাদের পক্ষে সম্ভব। কারণ তোমার বাপ দাদারা মাহমূদের হাতে একের পর এক পরাজয় শিকার করে নিয়ে মাহমূদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করেছে। আর দাসত্ব চুক্তি করে দেশের সম্পদ তোমরা মুসলমানদের হাতে তুলে দিচ্ছে।
তোমার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছিলো আমার ভাই। কিন্তু আমার সিদ্ধান্তের কথা আজ শুনে রাখো তারালোচন! তোমার মতো কাপুরুষদের আমি ঘৃণা করি। নারী সে রাজপুত হোক আর মজদুরের বংশধর হোক, নারী বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠলে সাগরেও আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। আমার পথ ছেড়ে দাও তারালোচন! তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আমার সব স্বপ্নসাধ এখন লক্ষণকে ঘিরে। পৃথিবীতে সম্ভব না হলেও স্বর্গে আমাদের বিয়ে হবে। তুমি এই জঙ্গলেই ঘুরে ঘুরে সময় কাটাও।
তুমি কি ভাবছো আমার পক্ষে এখান থেকে তোমাকে তুলে নেয়া সম্ভব নয়? ক্ষুব্ধ ভঙিতে শিলার দিকে এগিয়ে গেল তারালোচনপাল।
তারালোচনকে এগুতে দেখে শিলা পিছনে ঘুরে দৌড়াতে লাগল। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়ে শিলা একটি টিলার আড়ালে চলে গেল।
তারালোচন দৌড়ে ওর পিছু পিছু গিয়ে ওকে দেখে ফেললো। তখন শিলা একটি গাছের আড়ালে দাঁড়ানো। জায়গাটি ঘন গাছ গাছালীতে ভরা। নদী এখানে জঙ্গলের ভেতরে চলে এসেছে। জায়গাটি অনেকটা ঝিলের মতো। এখানকার পানি শান্ত। কোন স্রোত বা ঢেউ নেই।
তারানোচন পাল শিলাকে বললো, শিলা তোমাকে শেষ বারের মতো বলছি, তুমি আমার কাছে এসে পড়ো। শিলা তারালোচনকে হুমকির স্বরে বললো, সাহস থাকে তো আমাকে ধরতে এসো। মাহমূদকে খুন করার আগে আমি তোমাকেই খুন করবো। আমি স্বেচ্ছায় কখনো তোমার কাছে ধরা দেবো না। হুমকি দিয়ে শিলা উল্টো পায়ে পেছনের দিকে সরতে শুরু করল। তারালোচনপাল ঠায় দাঁড়িয়েই শিলাকে আত্মসমর্পণের জন্যে আহবান করছিল এবং বলছিলো,
তোমার পক্ষে কাউকে হত্যা করা সম্ভব নয় শিলা! আমি কিছুতেই তোমাকে এখান থেকে পালাতে দেবো না।
শিলা উল্টো পায়ে পিছনেই সরে যাচ্ছিল। হঠাৎ আতংকিত কণ্ঠে তরলোচন বললো, শিলা! শিলা! আর পিছনে যেয়ো না! পড়ে যাবে। যেখানে আছো সেখানেই দাঁড়াও।
না, আমি কিছুতেই তোমার কাছে ধরা দেবো না। শিলা বুঝতে পারেনি; তারালোচন কী ভয়ংকর বিপদ থেকে তাকে সাবধান করছিল। তারালোচন চিৎকার করে বললো, শিলা! শিলা! তোমার পেছনে রাক্ষুসে কুমির।
তখন একটি কুমির মুখ হা করে একেবারে শিলার পেছনেই দাঁড়ানো। এটি হয়তো কোন ঝুপের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। ধীরে ধীরে কুমিরটি এগুতে লাগল। কিন্তু শিলা নির্বোধের মতো তখনো পায়ে পায়ে পিছু সরে যাচ্ছিল। আর দু’ পা পিছু হঠতেই মুখ হা করা কুমিরটি শিলাকে এক ঝটকায় মুখের ভেতরে আটকে ফেললো।
আক্রান্ত শিলাকে কুমির ধরার সাথে সাথে শিলা এমন বিকট আর্তচিৎকার করে উঠলো যে, দূরে ঘুমিয়ে থাকা রাধা ঘুম থেকে জেগে উঠল। রাধা ঘুম থেকে জেগে দেখলো তার পাশে শিলা ও লক্ষণ কেউ নেই। অদূরে দু’জন প্রহরী তখনো বেঘুরে ঘুমাচ্ছে। রাধা তাদের জাগাল এবং তাদের নিয়ে যে দিকে চিৎকার শোনা গেলো সে দিকে দৌড়াতে লাগল।
হঠাৎ কয়েকজনের দৌড়ানোর শব্দ শুনে তারালোচন পাল একটি ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল এবং মুখে আঙুল দিয়ে বিশেষ ধরনের সাংকেতিক আওয়াজ করল।
রাধা তার দুই সৈনিক সঙ্গীকে নিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখতে পেল, শিলা একটি কুমিরের মুখের ভেতরে তখনো গোংগাচ্ছে। তার দেহের শুধু মাথা আর একটি হাত বাইরে আছে আর বাকীটা কুমিরের মুখের ভেতরে। শিলার রেশমী চুলগুলো কুমিরের মুখের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ অজ্ঞাত স্থান থেকে দুটি তীর এসে রাধার সঙ্গী দুই সৈনিকের চোখে বিদ্ধ হলো। উভয়েই আর্তচিৎকার করে দু’হাতে চোখ ধরে মাটিতে বসে পড়ল এবং তাদের চোখে অন্ধকার নেমে এলো। তারালোচন পালের দুই সঙ্গী তার বিশেষ ইঙ্গিতে লক্ষণের সফর সঙ্গী দু’জনের চোখে তীর ছুঁড়ে তাদেরকে অন্ধ করে দিল।
রাধা ছিলো দুই সৈনিকের আগে আগে। তাই কোন দিক থেকে তীর এসেছে তা সে দেখতে পেলো না। সে শিলার আর্তচিৎকার শুনে উকষ্ঠিত হয়ে সামনের দিকে দৌড়াচ্ছিল। কুমিরের মুখে নারীদেহের অবশিষ্টাংশ দেখে দূরেই থমকে গেল রাধা। অবস্থা দেখে তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো, তার চিৎকার করার ভাষাও যেন লোপ পেয়ে গেলো। ঠিক এমন সময় তার পেছনে পেছনে আসা দুই সৈনিকের আর্তচিৎকার শুনে পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেলো তারা উভয়েই তীর বিদ্ধ হয়ে মাটিতে বসে পড়েছে। তখন আর নিজেকে সামলাতে পারলো না রাধা। দাঁড়ানো থেকে জ্ঞান হারিয়ে ঠায় লুটিয়ে পড়ল।
