ওহ! তারালোচন! তুমি এখানে কেমন করে? অবশ্য তোমার এ সময়ে এখানেই থাকা উচিত।
কিন্তু তোমার এখানে থাকা মোটেও উচিত হয়নি। বললো তারালোচন।
কিছু দিন আগে আমি তোমার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে ছিলাম, তখন তোমার সাথে দেখা হয়েছিল। আর একবার তুমি যখন তোমার ভাইয়ের সাথে লাহোর গিয়ে ছিলে তখন তোমাকে দেখেছিলাম। ক’দিন আগে মুনাজে তোমাকে না দেখলে হয়তো এই পোশাকে আমার পক্ষ্যে তোমাকে চেনা সম্ভব হতো না। এই বিজন জঙ্গরে তোমাকে কেউ দেখলে মনে করবে, কোন রাজকুমারীর প্রেতাত্মা তুমি। কিংবা কেউ মনে করবে তুমি এই জঙ্গলের রাণী।
গতকাল থেকেই তোমাদের আমি লক্ষ করছি। তোমার হয়তো জানা আছে এখানে কি করছি আমি। আমি গযনী বাহিনীর গতিবিধি যাচাই করতে এখানে এসেছি। মহারাজা ভীমপাল এখান থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে অবস্থান করছেন। তোমাদের সাথে রাজকুমারী রাধাকেও দেখলাম। এই বন্যপোশাক পরেছো কেন তোমরা? তোমরা কি কোথাও পালিয়ে যাচ্ছো?
এই যুবক লাহোরের মহারাজা ভীমপালের ছোট ভাই তারালোচন পাল। শিলার সাথে তার বিয়ের কথা প্রায় পাকাপাকি হওয়ার পথেই ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠায় বিয়ের কাজ বিলম্বিত হয়ে গেল।
এদিকে সুলতান মাহমুদের কাছে ঠিকই সংবাদ পৌঁছে গেল লাহোরের মহারাজা ভীমপাল ও তার ছোট ভাই তারালোচন পাল লাহোর থেকে এসে এই এলাকার রাজা মহারাজাদেরকে সুলতানের মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে।
তারালোচন পাল ঐ কাজেই একবার মুনাজ ও কনৌজ ঘুরে এসেছে। ঘুরতে ঘুরতে একদিন তার চোখে পড়ে লক্ষণের এই ছোট কাফেলা। কাফেলাটি তার কাছে সন্দেহজনক মনে হওয়ায় এবং লোকগুলোও তার পরিচিত হওয়ায় সে এদের অভিপ্রায় বুঝার জন্য তাদের পিছু নিল। এক পর্যায়ে লক্ষণ শিলার কাছ থেকে চলে যাওয়ার সুবাদে সে শিলার মুখোমুখি হলো। তারালোচন পালের মুখোমুখি হওয়ায় শিলা মোটেও বিব্রতবোধ করলো না। বরং সে অকপটে বলে দিল কোন অভিপ্রায়ে ওরা লক্ষণের এই কাফেলায় শরীক হয়েছে এবং কেন লক্ষণকে তারা সঙ্গ দিচ্ছে।
তোমার ভাই রায়চন্দ্র কি এখন বোন আর কন্যাকেও যুদ্ধে জড়িয়ে ফেললেনঃ রাজপুতদের কি হয়ে গেলো। তাদের আত্মমর্যাদাবোধ কি গঙ্গার পানি ধুইয়ে নিয়ে গেছে। রাজপুতেরাও কি মুসলমানদের ভয়ে এতোটা ভড়কে গেছে উমামাখা কণ্ঠে বললো তারালোচন।…..
আমরা তো রায়চন্দ্রকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, মাহমূদ যদি তাকে পরাজিত করে ফেলে তবে আমরা নিশ্চয়ই এর প্রতিশোধ নেবো। এজন্য আমরা সৈন্যদের প্রস্তুত করে রেখেছি। আমরা এ মুহূর্তে সুলতানের মুখোমুখি হচ্ছি না এজন্য যে, যখন একের পর এক যুদ্ধ করে সে ক্লান্ত হয়ে যাবে, তার সৈন্যনা অবসন্ন হয়ে যাবে, আর লোকবল কমে যাবে তখন আমরা এক আঘাতেই তাদেরকে জব্দ করবো। অবশ্য আমরা সুলতানের সাথে চুক্তিবদ্ধ। কিন্তু এই চুক্তি ভাঙ্গার জন্যে আমরা সুযোগের অপেক্ষা করছি। তাকে হত্যা করার কোন দরকার নেই। যদি হত্যা করতেই হয়, তবে লক্ষণপাল ও তার সঙ্গী দুই সৈনিক যাবে, তোমরা এখান থেকেই বাড়ীতে ফিরে যাও।
শিলা তারালোচনকে জানালো, তাদেকে কেউ জোর করে আনেনি। তারাই বরং লক্ষণকে উজ্জীবিত করেছে। রাধা এবং সে কি ভাবে সুলতানকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে কি ভাবে তারা মুসলিম সৈন্যদের ধোকা দেবে সব বিস্তারিত তারালোচনকে জানাল শিলা।
তোমাদের পরিকল্পনা বাস্তব সম্মত নয়। তোমরা যাদের ধোকা দেয়ার চিন্তা করছে তাদেরকে ধোকা দেয়া সহজ নয়। তোমরাই বরং ধোকায় পড়ে গযনী চলে যাবে এবং তোমাদেরকে নর্তকীতে পরিণত করা হবে কিংবা কোন সেনা কর্মকর্তার রক্ষিতা হয়ে থাকতে হবে।
শিলা তারালোচনকে রাজপুত নারীদের আত্মমর্যাদাবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললো, তারা কতোটা কঠোর মনোভাব নিয়ে এই অভিযানে বেরিয়েছে। কিন্তু শিলার কথায় আশ্বস্ত হতে পারলোনা তারালোচন। সে তার হবু স্ত্রীর এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানকে কিছুতেই সমর্থন করতে পারলো না।
এমন কাক্ষিত এক অভিযানের মধ্য পথে অনাকাক্ষিত বাধা হয়ে দাঁড়ানোতে তারালোচনের উপর ক্ষেপে গেল শিলা। সে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তারালোচনকে বললো, আমার যাওয়া যদি সমর্থন করতে নাই পারো, তাহলে তুমি যাও আমার স্থানে। সেই সাহস তো তোমার নেই। চোরের মতো বেশ বদল করে গহীন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তোমরা গযনীর সাথে মৈত্রী চুক্তি করেছে। এটাও তো তোমাদের এক ধরনের কাপুরুষতা। তোমরা যদি কাপুরুষ না হও তাহলে সেনাবাহিনীকে সামনে এনে প্রকাশ্যে মাহমূদকে হুমকি দাও না কেন? বলো না কেন, আমরা আর তোমার অধীনতামূলক চুক্তি পালনে রাজী নই।…
এদিকে মথুরার হাজার বছরের পুরনো মন্দির ধ্বংস হয়ে গেছে, ওদিকে তোমরা তোমাদের শহরে মুসলমানদের আচ্ছা করে আযান দেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তোমরা আযানের আওয়াজে বেশ সাচ্ছন্দেই আছে। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি। তোমাদের নিষ্ক্রিয়তা আমার আত্মমর্যাদাবোধ একটা কিছু করার জন্যে আমাকে ঘর ছাড়া করেছে।
শিলার কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো তারালোচন। সে বললো, আমি তোমার কথায় সায় দিতে পারছি না শিলা! যাই বলল, তুমি আমার হবু স্ত্রী। তোমার সাথে আমার বিয়ের বিষয়টি পাকাপাকি হয়ে আছে। আমি কিছুতেই তোমাকে এখান থেকে আর সামনে যেতে দেবো না।
